করাচিতে পাকিস্তান নৌবাহিনী একাডেমিতে অনুষ্ঠিত ১২৫তম মিডশিপম্যান এবং ৩৩তম শর্ট সার্ভিস কমিশন কোর্সের সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন।
তার এই বক্তব্যে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েনের বিষয়টি নতুন করে সামনে এলো। শনিবার ২৭ জুন আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেন, পাকিস্তান বর্তমানে নানামুখী আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন যে, গত বছরের মে মাসের সংঘাতে পরাজয়ের পর থেকে আমাদের পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশী দেশ অর্থাৎ ভারত পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করার জন্য নতুন করে গোপন কৌশল এবং প্রক্সি যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছে।
শরিফ মনে করেন, সরাসরি সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে এখন রাষ্ট্রবিদ্বেষী গোষ্ঠীদের ব্যবহার করে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা চলছে, যা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে ভারতের পাশাপাশি পশ্চিম সীমান্তের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।
তিনি জানান, দেশের পশ্চিম সীমান্তে বিদেশি মদদপুষ্ট সন্ত্রাসবাদের যে হুমকি বিদ্যমান, তা মোকাবিলার জন্য পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। শরিফ দেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সন্ত্রাস দমনে সেনাবাহিনী যে লড়াই করছে, তাতে দেশের মানুষের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।
তবে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি পাকিস্তান সরকার শান্তি, সংলাপ এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে সব অমীমাংসিত বিরোধ নিষ্পত্তির নীতিতে এখনো অটল রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
কাশ্মীর ইস্যু এবং বৈশ্বিক নানা সংকট নিয়ে পাকিস্তানের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাশ্মীরি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের প্রতি পাকিস্তানের সমর্থন সবসময় অটুট ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
একই সঙ্গে তিনি গাজা উপত্যকাসহ ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান দমন-পীড়নের তীব্র নিন্দা জানান এবং ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সংগত দাবির পক্ষে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে পূর্ণ সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্বকে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে এবং পাকিস্তান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী একটি দায়িত্বশীল দেশ হিসেবে ভূমিকা পালন করতে বদ্ধপরিকর।
শান্তি স্থাপনের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সাফল্যের কথা উল্লেখ করে শেহবাজ শরিফ বলেন, বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সহায়তায় ও পাকিস্তানের সক্রিয় মধ্যস্থতায় সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা বিশ্বশান্তির পথে এক বড় মাইলফলক।
এই চুক্তিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে স্বাক্ষর করতে পারাটা তার জন্য অত্যন্ত গর্বের ও সম্মানের বিষয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। পাকিস্তানের এই উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টার প্রতিফলন বলে তিনি দাবি করেন।
নৌবাহিনী একাডেমির সমাপনী অনুষ্ঠানে পাসিং আউট হওয়া ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই একাডেমিতে প্রশিক্ষণ পাওয়া শুধু পাকিস্তানের তরুণরাই নয়, বরং বাংলাদেশ, তুরস্ক, বাহরাইন, ইরাক, শ্রীলঙ্কা ও জিবুতির তরুণ কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ তাকে বিশেষভাবে আনন্দিত করেছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই একাডেমিতে অর্জিত উন্নত প্রশিক্ষণ ও পেশাদার অভিজ্ঞতা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিজ নিজ দেশের নৌবাহিনীর কার্যক্রমে এবং আন্তঃদেশীয় নৌ-সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ও অতিথিদের উপস্থিতিতে শেহবাজ শরিফ পাকিস্তানের নৌ-শক্তির সক্ষমতা ও দেশপ্রেমের ওপর বিশেষ আলোকপাত করেন এবং নবীন কর্মকর্তাদের দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হওয়ার আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেশী ভারতের বিরুদ্ধে শেহবাজ শরিফের এই সরাসরি অভিযোগ সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ। যদিও ভারত বরাবরই পাকিস্তানের এই ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে, তবে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ধরনের বক্তব্যের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পাকিস্তান সরকার ও সশস্ত্র বাহিনী দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের ভাবমূর্তি বাড়াতে যে কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশল অবলম্বন করছে, করাচির এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সেই কৌশলেরই একটি অংশ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।