২০১১ সালে রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণের পর গত পনেরো বছরের দীর্ঘ শাসনকালে কিম জং উন কখনোই প্রকাশ্যে বা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে একবারের জন্যও নিজের মা কো ইয়ং হুইয়ের নাম উচ্চারণ করেননি।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন পরিবারের বংশানুক্রমিক একনায়কতন্ত্র এবং বহুল প্রচারিত 'বিশুদ্ধ রক্তধারা' বা পবিত্র মতাদর্শের বিশ্বাসযোগ্যতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও কঠোরভাবে এই পরিচয়টি বিশ্ববাসী এবং নিজ দেশের জনগণের কাছ থেকে আড়ালে রাখা হয়েছে।
পিয়ংইয়ংয়ের রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ এবং দীর্ঘদিনের প্রচারণা অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার শাসক পরিবারের 'মাউন্ট প্যাকতু' রক্তধারাকে অত্যন্ত পবিত্র, ঐশ্বরিক এবং বিশুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই পবিত্রতার কাল্পনিক মিথ বা পৌরাণিক কাহিনীর ওপর ভিত্তি করেই মূলত কিম পরিবারের কয়েক দশকের নিরঙ্কুশ শাসনব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু কিম জং উনের মা কো ইয়ং হুইয়ের বাস্তব জন্মবৃত্তান্ত এই রাষ্ট্রীয় প্রচারণার সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। প্রাপ্ত ঐতিহাসিক তথ্যমতে, ১৯৫২ সালে জাপানের ওসাকা শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা-মা মূলত দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপের আদি বাসিন্দা ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে জাপানে পাড়ি জমান।
সেখানে বসবাসকারী প্রবাসী কোরীয় সম্প্রদায়ের সাধারণ সদস্য হিসেবেই তারা পরিচিতি লাভ করেন। জন্মস্থান জাপান এবং আদি নিবাস দক্ষিণ কোরিয়া-এই দ্বৈত পরিচয়ের কারণেই কো ইয়ং হুইয়ের বিষয়টি উত্তর কোরিয়ার বর্তমান শাসকদের জন্য চরম অস্বস্তিকর ও রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর একটি অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পরবর্তী সময়ে একটি বিশেষ রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় কো ইয়ং হুইয়ের পরিবার জাপান ত্যাগ করে উত্তর কোরিয়ায় ফিরে আসে। কিন্তু বিদেশফেরত হওয়ার কারণে দেশটির অত্যন্ত কঠোর, রক্ষণশীল এবং জন্মভিত্তিক সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসে তাদেরকে সমাজের একেবারে নিচু মর্যাদার নাগরিক বা 'জ্যায়েপো' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মায়ের এই প্রান্তিক ও নিচু সামাজিক মর্যাদার ঐতিহাসিক পটভূমি উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে একেবারেই বেমানান। সমাজের নিচু স্তরের হিসেবে চিহ্নিত এমন একজন নারীর সন্তান দেশের সর্বোচ্চ ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নেতা হিসেবে আসীন হবেন, তা উত্তর কোরিয়ার দীর্ঘদিনের প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামো এবং বিশুদ্ধ বংশমর্যাদার ধারণার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
আর ঠিক এই কাঠামোগত দুর্বলতা লুকাতেই রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ইতিহাসকে চিরতরে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতার পরিবারের এই অজানা ইতিহাস আরও জটিল রূপ ধারণ করে কো ইয়ং হুইয়ের পেশাগত জীবনের কারণে। তিনি পেশায় একজন সাধারণ নৃত্যশিল্পী হিসেবে কাজ করতেন।
এই পেশায় যুক্ত থাকা অবস্থাতেই তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা ও কিম জং উনের বাবা কিম জং ইলের সঙ্গে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই জুটির তিন সন্তানের মধ্যে অন্যতম হলেন বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন। জানা যায়, এটি ছিল একটি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক।
রাষ্ট্রীয় প্রথা, সামাজিক মর্যাদা এবং রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে কো ইয়ং হুই এবং তার সন্তানদের সাধারণের দৃষ্টিসীমা থেকে সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল। এমনকি উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম সর্বোচ্চ নেতা কিম ইল সুং যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন এই সম্পর্ককে রাজপরিবারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করা হয়নি।
২০০৪ সালে দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কো ইয়ং হুই মৃত্যুবরণ করেন। তার এই অকাল মৃত্যুর পর উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতার উত্তরাধিকার প্রশ্নে ব্যাপক নাটকীয় পরিবর্তন আসতে শুরু করে।
তৎকালীন নেতা কিম জং ইলের অন্যান্য সন্তানদের নানা রাজনৈতিক, আচরণগত এবং ব্যক্তিগত কারণে উত্তরাধিকারের তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে বাদ দেওয়া হয়। অবশেষে ২০১১ সালে কিম জং ইলের মৃত্যুর পর ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে বসেন কিম জং উন।
কিন্তু ক্ষমতার মসনদে বসলেও তিনি তার মায়ের সামাজিক ও পারিবারিক পরিচয় নিয়ে তৈরি হতে পারা যেকোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ বিতর্ক এড়াতে সবসময় সর্বোচ্চ সতর্ক থেকেছেন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মায়ের পরিচয় নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সামান্যতম আলোচনা হলেও তা শাসকগোষ্ঠীর পবিত্র রক্তধারার দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যায় পরিণত করবে।
বিষয়টির সংবেদনশীলতা এতটাই গভীর যে, কিম জং উন নিজের ব্যক্তিগত জীবনকেও অনেকটা রহস্যের চাদরে ঢেকে রেখেছেন। এমনকি আশ্চর্যের বিষয় হলো, কিম জং উনের নিজের জন্মদিনটিও এখন পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ায় কোনো আনুষ্ঠানিক বা জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালন করা হয় না, যা তার পূর্বসূরিদের ক্ষেত্রে নিয়মিত পালিত হতো।
বিশেষজ্ঞদের দৃঢ় ধারণা, শাসক পরিবারের এই প্রকৃত ও অপ্রিয় তথ্যগুলো যদি কোনোভাবে দেশটির সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে প্রকাশ পায়, তবে উত্তর কোরিয়ার বংশানুক্রমিক শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ও নেতাদের প্রতি জনগণের অন্ধ আনুগত্য এক ভয়াবহ প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
তাই নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা এবং ক্ষমতার মসনদ নিষ্কণ্টক রাখতেই এক পরম গোপনীয়তার আড়ালে চিরতরে চাপা পড়ে গেছে একজন জন্মদাত্রী মায়ের আসল পরিচয়।