এই ঘটনা সমাজব্যবস্থার একটি রূঢ় বাস্তবতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতোমধ্যে নদী থেকে পরিবারের গৃহকর্তা, তার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্ত্রী এবং দুই বছর বয়সী এক ফুটফুটে শিশুকন্যার প্রাণহীন দেহ উদ্ধার করেছে।
তবে পরিবারের বড় মেয়ের সন্ধান এখনও মেলেনি। নিখোঁজ ওই কন্যা সন্তানের সন্ধানে নদীতে উদ্ধারকারী দলের নিরলস তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ভারতের কোচি এলাকার স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকর্মীদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, গত শুক্রবার দুপুরের দিকে পিরাভম অঞ্চলের নিকটবর্তী মুভাত্তুপুঝা নদীর পানিতে প্রথম দুটি ভাসমান মরদেহ স্থানীয়দের নজরে আসে।
নদীতে ভাসমান মরদেহ দেখে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে আসে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা নদী থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারী ভিজি এবং তার দুই বছর বয়সী অবুঝ শিশুপুত্রের নিথর দেহ উদ্ধার করে।
এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক ঘটনার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন ওই নারীর স্বামী নারায়ণের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে যোগাযোগের আপ্রাণ চেষ্টা চালায়, কিন্তু সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। পরবর্তীকালে, পরিস্থিতি বিবেচনা করে শনিবার অগ্নিনির্বাপণ ও অসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর সুদক্ষ ডুবুরি দলের সহায়তায় নদীতে ব্যাপক ও চিরুনি তল্লাশি অভিযান চালানো হয়।
দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর অবশেষে স্বামী নারায়ণের মৃতদেহও ওই নদী থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয় উদ্ধারকারী দল। প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংগৃহীত নথিপত্র থেকে এই হতভাগ্য পরিবারটির চরম অসহায়ত্বের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। জানা গেছে, মৃত নারায়ণ মূলত কেরালার পালক্কাড় এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন।
তবে জীবিকার সন্ধানে এবং উন্নত জীবনের আশায় তিনি তার পরিবার নিয়ে কোঠামঙ্গলম অঞ্চলের একটি বাড়িতে ভাড়ায় বসবাস করতেন। চরম দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বের মধ্যে দিনাতিপাত করা এই দম্পতির সংসারে দুটি ফুটফুটে সন্তান ছিল। অভাবের তাড়নায় তারা দীর্ঘকাল ধরে জর্জরিত ছিলেন।
ঘটনার কয়েক দিন আগে পুরো পরিবারটিকে পিরাভম এলাকার বিভিন্ন স্থানে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছিলেন স্থানীয়রা। প্রথম দিন যখন মা ও শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়, তখন স্থানীয় প্রশাসন তাদের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
কিন্তু তারা নারায়ণ এবং তার বড় মেয়ের অবস্থান সম্পর্কে প্রশাসনকে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি, যা উদ্ধারকর্মীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তদন্তের গভীরে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী একটি তথ্য উদঘাটন করেছে।
জানা যায়, চরম আর্থিক সংকটে পতিত হয়ে নারায়ণ ও তার পরিবার সম্প্রতি তাদের বসবাসরত বাড়ির ভাড়া পরিশোধ করতে চরমভাবে ব্যর্থ হন। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানোর আশঙ্কায় তারা কোঠামঙ্গলম থানা প্রশাসনের কাছে আর্থিক সহায়তা এবং আশ্রয়ের জন্য আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন।
পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্থানীয় প্রশাসন তাদের জন্য একটি বিকল্প এবং তুলনামূলক কম খরচের বাসস্থানের ব্যবস্থাও করে দিয়েছিল। প্রশাসনের এই সহানুভূতিশীল পদক্ষেপ সত্ত্বেও কেন তারা এমন ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিলেন, তা নিয়ে তদন্তকারীদের মনে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী রবিবার তাদের ওই নতুন ঠিকানায় স্থানান্তরিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, নতুন ঠিকানায় যাওয়ার আগেই তারা জীবনের শেষ ঠিকানায় পাড়ি জমান।
অন্যদিকে, তদন্তে আরও জানা গেছে যে, পিরাভম এলাকার একটি স্থানীয় ভোজনালয়ের নিরাপত্তা ক্যামেরার দৃশ্যে গত বৃহস্পতিবার রাতে পুরো পরিবারটিকে একসঙ্গে বসে রাতের খাবার খেতে দেখা গিয়েছিল। সম্ভবত সেটিই ছিল এই হতভাগ্য পরিবারের একসঙ্গে কাটানো শেষ মুহূর্ত।
এই অত্যন্ত মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পিরাভম থানা প্রশাসন একটি নিয়মিত অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছে এবং ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তাদের আইনি তদন্ত প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছে।
ইতোমধ্যে নদী থেকে উদ্ধার হওয়া স্বামী, স্ত্রী ও এক সন্তানের মৃতদেহ স্থানীয় সরকারি চিকিৎসালয়ে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে যথাযথ নিয়ম মেনে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার পর, শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের জন্য মৃতদেহগুলো তাদের আত্মীয়স্বজনদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এদিকে, পরিবারের নিখোঁজ থাকা বড় মেয়ের সন্ধানে উদ্ধারকর্মীরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। শনিবার রাতে আলোর স্বল্পতা এবং বৈরী পরিস্থিতির কারণে নদীতে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছিল প্রশাসন।
তবে আজ রবিবার সকালের প্রথম আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই নিখোঁজ ওই কন্যার সন্ধানে পুনরায় নদীতে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু হয়েছে। পুরো ভারতজুড়ে এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি সাধারণ মানুষের মনে গভীর শোক ও বেদনার ছায়া ফেলেছে।