সোমবার, জুন ২৯, ২০২৬
১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিস্তা প্রকল্পে ভারতের উদ্বেগ নাকচ করল চীন

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬, ০৬:১৯ পিএম

তিস্তা প্রকল্পে ভারতের উদ্বেগ নাকচ করল চীন
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত আলোচিত ও সংবেদনশীল বিষয় হয়ে ওঠা তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প নিয়ে নিজেদের সুস্পষ্ট ও জোরালো অবস্থান ব্যক্ত করেছে এশিয়া মহাদেশের অন্যতম পরাশক্তি চীন।

 

প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের প্রকাশ্য উদ্বেগ ও অস্বস্তি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের এই বহুল প্রতীক্ষিত মেগা প্রকল্পে নিজেদের পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনরায় নিশ্চিত করেছে বেইজিং। একই সঙ্গে দেশটির পক্ষ থেকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যকার এই দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং এটি যেকোনো তৃতীয় পক্ষের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব বা ভূ-রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা উচিত।

 

চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে আয়োজিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র গুও জিয়াকুন। সোমবার ভারতীয় শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।

 

রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা নদীর অববাহিকা ভারতের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর একেবারে কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় ওই অঞ্চলে চীনের যেকোনো ধরনের ভৌত উপস্থিতি নিয়ে নয়াদিল্লির গভীর উদ্বেগ রয়েছে।

 

মূলত এই ভৌগোলিক নৈকট্যই ঢাকা ও বেইজিংয়ের এই যৌথ পানি ব্যবস্থাপনা উদ্যোগের বিষয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের অস্বস্তির প্রধান ভিত্তি বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ভারতের এই অলিখিত আপত্তির জবাবে বেইজিংয়ের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট ও আপসহীন।

 

সংবাদ ব্রিফিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ভাষায় বলেন, "আমি এই মঞ্চ থেকে অত্যন্ত জোর দিয়ে বলতে চাই যে, চীন এবং বাংলাদেশের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান বহুমুখী সহযোগিতা কখনোই কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে না।

 

এটি দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যকার একটি স্বাভাবিক উন্নয়নমূলক সম্পর্ক, যা যেকোনো তৃতীয় পক্ষের নেতিবাচক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থাকা উচিত।" তাঁর এই বক্তব্যটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে একটি শক্তিশালী ও সময়োপযোগী বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

 

চীন এই পুরো উদ্যোগটিকে কেবলই একটি ভূ-রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে না দেখে, এটিকে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও একটি অত্যন্ত জরুরি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প হিসেবেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেছে।

 

মুখপাত্র জিয়াকুন তাঁর নীতিনির্ধারণী বক্তব্যে বারবার উল্লেখ করেন যে, তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প মূলত একটি বিশাল জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ; যার প্রতি বাংলাদেশ সরকার ও দেশের সাধারণ জনগণ অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করে থাকে।

 

জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন ও শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র অভাবের কারণে উত্তরাঞ্চলের মানুষের যে অবর্ণনীয় কষ্ট হয়, তা স্থায়ীভাবে লাঘব করতে এই প্রকল্প বিশাল ভূমিকা রাখবে। তাই এই জনগুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে নিজেদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা অনুযায়ী সম্ভাব্য সব ধরনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করতে চীন সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে।

 

তিনি আরও যোগ করেন যে, ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে আরও বৃহত্তর ও গভীর সমন্বয় সাধনে চীন আন্তরিক। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য, শক্তিশালী অর্থনীতি, টেকসই পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সাধারণ মানুষের সার্বিক কল্যাণের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব বহুগুণে বাড়াতে বেইজিং বিশেষভাবে ইচ্ছুক।

 

অন্যদিকে, এই বৃহৎ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও বাস্তবায়নের রোডম্যাপ নিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সম্প্রতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, এই বহুমাত্রিক প্রকল্পের কারিগরি ও পরিবেশগত দিকগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে খতিয়ে দেখতে দুই দেশের শীর্ষ ও অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা খুব শিগগিরই প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

 

তিনি একটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরে বলেন, উভয় দেশের সরকার ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা বর্তমানে এই কারিগরি যাচাইয়ের বিষয়ে একটি চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন, যা বিগত দিনগুলোতে এই পর্যায়ে ছিল না।

 

চীন সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে যে, এই সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনের যৌক্তিকতা এবং বৈজ্ঞানিক ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই তারা এই প্রকল্পে সম্ভাব্য সব ধরনের উন্নয়নমূলক সহায়তা নিশ্চিত করবে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে কেবল তিস্তাই নয়, বরং বাংলাদেশের জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদীর বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে বাংলাদেশ ও চীন একটি বৃহত্তর ও সুদূরপ্রসারী চুক্তিতে উপনীত হয়েছে।

 

চলতি বছরের একেবারে শুরুতে, অর্থাৎ জানুয়ারিতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং চীনের স্বনামধন্য রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পাওয়ারচায়না তিস্তা প্রকল্পকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে পূর্বে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে বৃদ্ধি করে।

 

সংশ্লিষ্ট মহল গভীরভাবে প্রত্যাশা করছে যে, এই চুক্তির ফলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ আগের চেয়ে অনেক বেশি সুগম হবে। তবে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা এবং এই মহাপরিকল্পনা সংক্রান্ত ঢাকা ও বেইজিংয়ের যেকোনো নতুন ঘোষণার দিকে প্রতিবেশী ভারত অত্যন্ত নিবিড় ও সতর্ক দৃষ্টি রাখবে, যা আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

 

- এনডিটিভি