বহু হিন্দু ধর্মাবলম্বীর কাছে এটি ভগবান রামের জন্মভূমি হিসেবে পরম শ্রদ্ধার জায়গা। কিন্তু সেই আবেগ ও বিশ্বাসের প্রতীক এই মন্দিরটি এখন বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে চরম বিতর্কের মুখে পড়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মন্দির নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ভক্তদের দেওয়া বিপুল পরিমাণ অনুদান এবং মূল্যবান উপহার আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসায় সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
মন্দিরটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ‘শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট’ নামক একটি স্বাধীন সংস্থা। যদিও ট্রাস্টটি সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে নয়, তবে এর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) আদর্শিক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ম সেবক সংঘের (আরএসএস) ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভক্তদের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, ধর্মীয় বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে ট্রাস্টের কিছু অসাধু ব্যক্তি তাদের দেওয়া অনুদান ও স্বর্ণালঙ্কারসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী আত্মসাৎ করেছেন। ভুক্তভোগী ভক্তদের একজন, ব্রজেশ কুমার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ধর্মের নামে মানুষের যে আস্থা ও বিশ্বাস ছিল, তাকে পুঁজি করেই একটি গোষ্ঠী নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করেছে।
এটি কেবল আর্থিক দুর্নীতি নয়, বরং কোটি কোটি ভক্তের বিশ্বাসের সঙ্গে জঘন্য প্রতারণা। ঘটনার সূত্রপাত হয় চলতি মাসে ট্রাস্টের হিসাব বিভাগের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক মহিপাল সিং কর্তৃক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আনার পর। এরপর থেকেই বিষয়টি ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টির নেতা ও উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, মন্দিরের নামে সংগৃহীত কোটি কোটি রুপি পরিকল্পিতভাবে লোপাট করা হয়েছে। এই গুরুতর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে উত্তর প্রদেশ সরকার চাপের মুখে পড়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়।
তবে সেই কমিটি ইতোমধ্যে প্রতিবেদন জমা দিলেও রহস্যজনক কারণে সরকার তা এখনও জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে সন্দেহের দানা বাঁধছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে অনুদান হিসেবে প্রাপ্ত নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী গণনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
ভক্তদের একাংশের দাবি, তারা যে রুপার ইট, স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য বহুমূল্য উপহার ট্রাস্টের কাছে জমা দিয়েছিলেন, তার কোনো হিসাব বা খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এই অস্থির পরিস্থিতির মুখে গত শুক্রবার ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায়সহ প্রভাবশালী কয়েকজন ট্রাস্টি পদত্যাগ করেছেন।
চম্পত রায় দীর্ঘকাল ধরে রাম মন্দির আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাই তার এই আকস্মিক পদত্যাগ দুর্নীতির অভিযোগগুলোকে আরও জোরালো ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।
এই ঘটনা কেবল মন্দির ট্রাস্টের ভেতরেই নয়, বরং ক্ষমতাসীন বিজেপির অন্দরেও অস্বস্তি তৈরি করেছে। বিজেপির সমর্থক ও সাধারণ ভক্তদের একটি বড় অংশ নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন এবং ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার ও জবাবদিহির দাবি জানাচ্ছেন।
উত্তর প্রদেশে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এই দুর্নীতি কেলেঙ্কারি রাজনৈতিক সমীকরণেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, যে বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে কয়েক দশক ধরে আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে, সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষায় ট্রাস্ট কেন চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিল।
এখন সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ এবং প্রকৃত দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করাই মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোটি কোটি মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসের জায়গাটি রক্ষা করতে রাষ্ট্র ও ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত কতটা স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পারে, তা এখন দেখার বিষয়।