মঙ্গলবার, জুন ৩০, ২০২৬
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের জন্য ভারতের তৈরি প্রথম চালানের ২০টি আধুনিক রেলকোচ হস্তান্তরের অপেক্ষায়

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ জুন, ২০২৬, ০৩:০৫ পিএম

বাংলাদেশের জন্য ভারতের তৈরি প্রথম চালানের ২০টি আধুনিক রেলকোচ হস্তান্তরের অপেক্ষায়
ছবি: Collected

বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, গতিশীল ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত থেকে আমদানি করা আধুনিক রেলকোচের প্রথম চালানটি এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে।

 

ভারতের রেলওয়ে বিভাগের সংশ্লিষ্ট পদস্থ কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন যে, বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ২০টি অত্যাধুনিক ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ বর্তমানে হস্তান্তরের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।

 

সবকিছু নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে চলতি জুলাই মাসেই এই আধুনিক কোচগুলো বাংলাদেশে এসে পৌঁছাবে। এর মধ্য দিয়ে দেশের পরিবহন খাতে নতুন একটি সম্ভাবনাময় অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে, যা সাধারণ যাত্রীদের সেবার মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

 

এই উল্লেখযোগ্য রেলকোচ আমদানির পেছনে রয়েছে একটি বৃহৎ ও দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক চুক্তি। প্রাপ্ত দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৪ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ভারতের কেন্দ্রীয় রেলওয়ে বিভাগের অধীনস্থ স্বনামধন্য রপ্তানি সংস্থা ‘রাইটস’-এর সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

 

সেই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির মূল শর্তই ছিল যে, ভারতের পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে মোট ২০০টি রেলকোচ ও ইঞ্জিন বাংলাদেশে রপ্তানি করা হবে। এই বৃহৎ চুক্তির আওতায় যে সরঞ্জামগুলো সরবরাহ করার কথা রয়েছে, তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ১২০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ, ৩৬টি শক্তিশালী ব্রডগেজ লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন এবং ১০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ।

 

বাংলাদেশের রেলওয়ের ক্রমবর্ধমান যাত্রীচাপ সামলাতে এবং সেবার মান বৈশ্বিক পর্যায়ে উন্নীত করতে এই চুক্তিটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও কার্যকর বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক মানের এই মেগা প্রকল্পের আর্থিক দিকটিও দেশের অর্থনীতির জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

 

চুক্তির শর্ত ও চূড়ান্ত রূপরেখা অনুযায়ী, এই ২০০টি আধুনিক রেলকোচ এবং আনুষঙ্গিক ইঞ্জিনের সামগ্রিক মূল্য হিসেবে বাংলাদেশ সরকার ভারতকে মোট ৯১৫ কোটি রুপি প্রদান করবে। উন্নয়নশীল দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে এ ধরনের বৃহৎ বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

এই বিশাল অঙ্কের প্রকল্পে বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’। একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ মূলত এটিই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের যোগাযোগ খাতের উন্নয়ন এখন বৈশ্বিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং বিদেশিরা এখানে বিনিয়োগে যথেষ্ট আস্থা রাখছেন।

 

কোচগুলোর নির্মাণপ্রক্রিয়া ও গুণগত মানের বিষয়েও সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও কারিগরি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। প্রথম চালানের এই ২০টি আধুনিক ব্রডগেজ কোচ ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের কাপুরথালা এলাকায় অবস্থিত অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য ‘রেল কোচ কারখানা’-এ অত্যন্ত নিপুণভাবে তৈরি করা হয়েছে।

 

আগামী দিনে চুক্তির আওতায় থাকা পরবর্তী কোচ ও ইঞ্জিনগুলোও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই একই কারখানায় প্রস্তুত করা হবে বলে জানা গেছে। কোচগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব ও কারিগরি নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে চুক্তিতে বিশেষ শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।

 

ভারতের কেন্দ্রীয় রেল দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরবরাহকৃত প্রতিটি কোচের জন্য দীর্ঘ ১৪ বছরের গুণগত নিশ্চয়তা বা ওয়ারেন্টির মেয়াদ থাকবে। এর ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অনেকাংশে কমে আসবে এবং রাষ্ট্র আর্থিকভাবে লাভবান হবে।

 

কোচ হস্তান্তরের সার্বিক প্রস্তুতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ভারতের কেন্দ্রীয় রেল দপ্তরের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইকোনমিক টাইমস’-কে বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছেন।

 

তিনি গণমাধ্যমটিকে সুস্পষ্টভাবে বলেন যে, প্রথম চালান হিসেবে জুলাই মাসে ২০টি ব্রডগেজ কোচ বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য তাদের যাবতীয় কারিগরি ও আনুষঙ্গিক প্রস্তুতির কাজ এরই মধ্যে সম্পূর্ণভাবে সফলতার সঙ্গে শেষ হয়েছে।

 

চলতি জুলাই মাসের যেকোনো দিন এই চালানটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হবে। তিনি গণমাধ্যমটির মাধ্যমে আরও নিশ্চিত করেন যে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বাকি কোচ ও ইঞ্জিনগুলোর নির্মাণকাজও নির্ধারিত গতিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে চলছে এবং পরবর্তী চালানগুলো আগামী ৩৬ মাসের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশে পাঠানো হবে।

 

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, নতুন এই আধুনিক কোচগুলো বাংলাদেশ রেলওয়ের মূল বহরে যুক্ত হলে দেশের সামগ্রিক পরিবহন খাতে একটি ইতিবাচক ও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে ব্রডগেজ লাইনগুলোতে যাত্রীদের তীব্র আসন সংকট দূর করার পাশাপাশি আরামদায়ক, নিরাপদ ও বিলাসবহুল ভ্রমণ নিশ্চিত করতে এই কোচগুলো অভাবনীয় ভূমিকা রাখবে।

 

ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সহজলভ্য অর্থায়নে এবং ভারতের উন্নত কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়িত এই প্রকল্প বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নিঃসন্দেহে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। এখন কেবল অপেক্ষার পালা, কবে নাগাদ এই অত্যাধুনিক কোচগুলো দেশের মাটিতে পৌঁছায় এবং সাধারণ যাত্রীরা এর প্রকৃত সুফল ভোগ করতে শুরু করেন।

 

- ইকোনমিক টাইমস