একদিকে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে ভারতের উল্কাবেগে উত্থান, অন্যদিকে কাঠামোগত নানা সমস্যা ও জনসংখ্যাগত সংকটে জর্জরিত জাপানের ধারাবাহিক পতন বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপানকে পেছনে ফেলে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ-এর প্রকাশিত সর্বশেষ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
এই পূর্বাভাস মূলত এশিয়ার এই দুই গুরুত্বপূর্ণ দেশের সম্পূর্ণ ভিন্নমুখী অর্থনৈতিক যাত্রার এক সুস্পষ্ট চিত্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে উন্মোচন করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির নিরিখে ২০২৬ সাল পর্যন্ত জাপান বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান কোনোক্রমে ধরে রাখতে সক্ষম হবে।
তবে এর ঠিক পরের বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতির এই মানচিত্রে এক বিরাট রদবদল ঘটবে। সেই বছর জাপানকে সরিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির শীর্ষ চারে নিজেদের শক্ত অবস্থান চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করবে ভারত।
আইএমএফ-এর সামষ্টিক অর্থনৈতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির আকার পৌঁছাবে ৪ দশমিক ৫২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এই বিপুল পরিমাণ জিডিপির আকার নিয়ে ভারত শুধু জাপানকেই নয়, বরং যুক্তরাজ্যের মতো ঐতিহ্যবাহী পশ্চিমা পরাশক্তিকেও পেছনে ফেলে দেবে।
পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে যে, ওই নির্দিষ্ট বছরটিতে জাপান বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্রমতালিকায় ভারত এবং যুক্তরাজ্যের ঠিক পেছনে অর্থাৎ ষষ্ঠ স্থানে নেমে যাবে। বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে শীর্ষস্থানটি শক্তভাবে ধরে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এরপর আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে এশিয়ার আরেক পরাশক্তি চীন এবং ইউরোপের অর্থনৈতিক ইঞ্জিন হিসেবে পরিচিত জার্মানি।
বর্তমান বিশ্বে করোনা মহামারি পরবর্তী প্রভাব, ইউরোপে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং সর্বোপরি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে একটি চরম অস্থিতিশীল ও প্রতিকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে এমন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং নানামুখী চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে ভারত এক অভাবনীয় ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ বিশাল বাজার, প্রযুক্তি খাতের বিস্ময়কর অগ্রগতি, ধারাবাহিক কাঠামোগত সংস্কার এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের নানামুখী দূরদর্শী উদ্যোগ ভারতের এই অগ্রযাত্রায় মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
এর স্বীকৃতিস্বরূপ চলতি সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ২০২৬ সালের জন্য ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে ৭ দশমিক শূন্য শতাংশে উন্নীত করেছে। বৈশ্বিক গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় এই হার অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক এবং এটি ভারতের সামষ্টিক অর্থনীতির সুদৃঢ় ভিত্তির এক অকাট্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বৃহস্পতিবার আইএমএফ-এর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রকাশের সময় সংস্থাটির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগীয় পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন ভারতের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনের কারণগুলো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন।
তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নানামুখী সামরিক ও কূটনৈতিক ভূমিকার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যে যে মারাত্মক অস্থিতিশীলতা ও ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে, তা বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতিতেই চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
কিন্তু ভারত তার অত্যন্ত শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থানের কারণে এই আকস্মিক জ্বালানি মূল্যের ধাক্কা অত্যন্ত সফলভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। শ্রীনিবাসন তার বিশ্লেষণে জোর দিয়ে বলেন, এই বৈশ্বিক সংকটের সূচনালগ্নেই ভারত অত্যন্ত শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।
দেশটির প্রবৃদ্ধির হার যেমন শক্তিশালী, তেমনি তাদের রাজস্ব শৃঙ্খলাও প্রায় সুপ্রতিষ্ঠিত ও স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিত তহবিল বা রিজার্ভ রয়েছে এবং নীতি নির্ধারণী পরিকাঠামো অত্যন্ত কার্যকর।
তাই এমন এক মজবুত প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের এই অর্থনৈতিক ধাক্কা অত্যন্ত ভালোভাবেই সামাল দিয়েছে এশিয়ার এই বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশটি। ভারতের এই উজ্জ্বল অর্থনৈতিক চিত্রের ঠিক বিপরীতে অবস্থান করছে একসময়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও শিল্পোন্নত অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপান।
দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত কাঠামোগত দুর্বলতা এবং জনসংখ্যাগত এক ভয়াবহ সংকটের কারণে দেশটির অর্থনীতি আজ এক গভীর খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। আইএমএফ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জাপানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক মাত্রায় মূল্যস্ফীতি জাপানের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অর্থনৈতিক মন্দা আর কাঙ্ক্ষিত মুদ্রাস্ফীতির অভাবে ভোগা এই দেশটিতে ২০২২ সালের বসন্তকাল থেকে হঠাৎ করেই ভোক্তা পর্যায়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আর সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আমদানি নির্ভর জাপানের এই চলমান অর্থনৈতিক সংকটকে আরও বহুগুণে ভয়াবহ করে তুলেছে।
জাপানের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য আরেকটি বড় অশনিসংকেত হলো তাদের জাতীয় মুদ্রার মানের চরম পতন। বিগত গ্রীষ্মকালে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান নিয়ন্ত্রক মার্কিন ডলারের বিপরীতে জাপানি মুদ্রা ইয়েনের মান গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে এসে পৌঁছেছিল।
ইয়েনের এই ঐতিহাসিক অবমূল্যায়নের ফলে জ্বালানি ও কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে জাপানের ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই অসহনীয় পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাংক অব জাপান বাধ্য হয়ে তাদের নীতিগত সুদের হার বিগত তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সুদের হার বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও শিল্প খাতের ঋণপ্রবাহের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা প্রবৃদ্ধির চাকাকে আরও মন্থর করে দিচ্ছে।
এছাড়া জাপানের বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি তাদের সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর এক স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। কর্মক্ষম ও দক্ষ তরুণের চরম অভাবে দেশটির শিল্প কারখানায় উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
একইসঙ্গে, বিশাল সংখ্যক বয়স্ক নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার পেছনে রাষ্ট্রকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত প্রবৃদ্ধির পথে এক বিশাল অন্তরায় হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
আইএমএফ কর্মকর্তা কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন এই চ্যালেঞ্জিং প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের ক্রমবর্ধমান প্রসার এবং এই খাতে প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ থেকে জাপানের অর্থনীতি বর্তমানে কিছুটা সুবিধা পাচ্ছে ঠিকই; তবে এশিয়ার অন্যান্য গতিশীল প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় সেই প্রযুক্তিনির্ভর সুবিধার মাত্রা ততটা ইতিবাচক বা প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়।
সামগ্রিকভাবে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সত্ত্বেও কাঠামোগত দুর্বলতা এবং জনসংখ্যাগত সংকটের কারণে জাপান তার হৃত অর্থনৈতিক গৌরব পুনরুদ্ধারে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে, আর ঠিক সেই শূন্যস্থান পূরণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রবল পরাক্রমে আবির্ভূত হচ্ছে ভারত।