তাঁর এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম কীভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোর তরুণ প্রজন্মকে ঐক্যবদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করতে পারে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত ও তীব্র আন্দোলন কেবল দেশের অভ্যন্তরেই নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় এক নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভারতের তরুণ সমাজও এখন সেই একই পথে হেঁটে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে বলে মনে করেন এই ছাত্রনেত্রী।
মঙ্গলবার বাংলাদেশের অন্যতম প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় নেহা বোরা এই সংহতি ও অনুপ্রেরণার কথা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ষষ্ঠ কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ও সাধারণ সম্মেলন উপলক্ষে পাঠানো ওই বিশেষ ভিডিও বার্তায় তিনি বাংলাদেশের বিপ্লবী ছাত্র-জনতার প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও সমর্থন জ্ঞাপন করেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, যখন কোনো একটি দেশে তরুণরা সফলভাবে তাদের অধিকার আদায়ে সক্ষম হয়, তখন তার ঢেউ খুব সহজেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে আছড়ে পড়ে।
ভারতের বর্তমান প্রেক্ষাপটেও ঠিক এমনটাই ঘটছে। নেহা বোরা তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যেভাবে ভয়ভীতি উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার ছিনিয়ে এনেছেন, তা ভারতের বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক বিশাল শিক্ষণীয় অধ্যায়।
ভিডিও বার্তায় ভারতের চলমান বিক্ষোভের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে এআইএসএ-এর সর্বভারতীয় সভাপতি বলেন, ভারতজুড়ে বর্তমানে নতুন প্রজন্মের যে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন চলছে, তা মূলত শুরু হয়েছে বাংলাদেশকে দেখেই। অর্থাৎ, ভারতের তরুণরা বাংলাদেশের আন্দোলনকারীদের সাহসিকতা এবং তাদের সফল রূপরেখাকে একটি আদর্শ মডেল হিসেবে গ্রহণ করেছে।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা, বেকারত্ব, বৈষম্য এবং গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব হওয়ার যে ক্ষোভ ভারতের তরুণদের মধ্যে পুঞ্জীভূত হয়েছিল, তা এখন রাজপথে প্রকাশ পাচ্ছে। আর এই প্রতিবাদের ভাষা ও সাহস তারা ধার করেছে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান থেকে।
নেহা বোরার মতে, বাংলাদেশের আন্দোলন ভারতের তরুণদের সামনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, সংঘবদ্ধ ছাত্রসমাজের শক্তির কাছে যেকোনো অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক অপশক্তি মাথা নত করতে বাধ্য।
বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নেহা বোরা তাঁর বার্তায় বলেন, ভারতের তরুণদের পথ দেখানোর জন্য এবং তাদের এই গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে পরোক্ষভাবে সমর্থন জুগিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি বাংলাদেশের ছাত্রসমাজকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছেন।
তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশে যে তীব্র গণআন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্যই ছিল দেশের লুণ্ঠিত গণতন্ত্র ও সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা। বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত যে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে, তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যও সম্পূর্ণ অভিন্ন।
ভারতের তরুণরাও এখন একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক পরিবেশের দাবি তুলছে, যেখানে সাধারণ নাগরিকের মতামতের প্রকৃত মূল্যায়ন করা হবে এবং ভোটাধিকারের পূর্ণ নিশ্চয়তা থাকবে।
নেহা বোরার এই বক্তব্য থেকে এটি অত্যন্ত পরিষ্কার যে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে এক ধরনের আদর্শিক সংযোগ তৈরি হচ্ছে। এক দেশের আন্দোলনকারীদের সফলতা অন্য দেশের অধিকার বঞ্চিত মানুষের মনে আশার আলো জ্বালাচ্ছে।
এআইএসএর এই নেত্রী তাঁর বক্তব্যের শেষাংশে অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক আন্দোলন থেকে তাঁরা কেবল অনুপ্রেরণাই পাননি, বরং সেই আন্দোলনের প্রতিটি ধাপ এবং অভিজ্ঞতা থেকে তাঁরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কৌশলগত শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
কীভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অহিংস আন্দোলন ধীরে ধীরে সমগ্র আপামর জনতার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিতে পারে, তা বাংলাদেশের কাছ থেকে শেখার মতো একটি বিষয়। সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের এই কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে নেহা বোরা দুই দেশের প্রগতিশীল ও অধিকারকামী তরুণদের মধ্যে একটি অবিচ্ছেদ্য সংহতি প্রকাশের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, তাঁরা ভারতের ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার এই বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করছেন। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণা এবং শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে ভারতের তরুণরাও নিজেদের অধিকার আদায়ের লড়াইকে চূড়ান্ত রূপ দিতে বদ্ধপরিকর।
সবশেষে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, দুই দেশের এই সচেতন এবং লড়াকু তরুণ সমাজ যদি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে পারে, তবে ভবিষ্যতে তারা মিলেমিশে একটি অত্যন্ত সুন্দর, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন নতুন দক্ষিণ এশিয়া গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
তাঁর এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ছাত্র রাজনীতির শক্তি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি তরুণদের অবিচল আস্থার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে, যা আগামী দিনের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয় হতে পারে।