বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬
২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দিল্লির বিমানবন্দরে হেনস্তার শিকার সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দীপকে

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:৫৩ পিএম

দিল্লির বিমানবন্দরে হেনস্তার শিকার সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দীপকে
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত হেনস্তার শিকার হয়েছেন উদীয়মান রাজনৈতিক দল ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা ও শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দীপকে।

 

বুধবার ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য মহারাষ্ট্র থেকে একটি নিয়মিত ফ্লাইটে রাজধানী দিল্লিতে অবতরণ করার পর টার্মিনাল ভবন থেকে বের হওয়ার সময় এই অস্বস্তিকর ঘটনার সূত্রপাত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচনী অনিয়ম এবং গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব হওয়ার অভিযোগ তুলে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে, এই ঘটনাটি যেন তারই একটি নতুন সংযোজন।

 

বিরোধী দলীয় নেতাদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ এবং সাধারণ জনপরিসরে তাদের হেনস্তা হওয়ার বিষয়টি বর্তমানে ভারতের রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সহনশীলতার প্রশ্নে এক বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

 

বিমানবন্দরের এই হেনস্তার ঘটনার একটি ছোট্ট ভিডিও ক্লিপ ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিও ফুটেজে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, অভিজিৎ দীপকে যখন নিজের লাগেজ নিয়ে বিমানবন্দর থেকে বের হচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ করেই এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি তাকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে চিৎকার করতে শুরু করেন।

 

ওই ব্যক্তি সিজেপি প্রধানকে উদ্দেশ্য করে ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, "আপনি কেন এই দেশটাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছেন?" তবে এমন উসকানিমূলক এবং আক্রমণাত্মক আচরণের মুখেও অভিজিৎ দীপকে অত্যন্ত শান্ত ও পরিপক্ব মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।

 

তিনি কোনো ধরনের তর্কে বা বাদানুবাদে না জড়িয়ে ওই ক্রুদ্ধ ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসেন এবং নিজের হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচিয়ে ইতিবাচক বা সম্মতিসূচক একটি ভঙ্গি প্রদর্শন করে নীরবে সেখান থেকে নিজের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যান।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের ধারণা, দীপকের ওপর চড়াও হওয়া ওই ব্যক্তি ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) একজন কট্টর সমর্থক হতে পারেন। যদিও এর কোনো আনুষ্ঠানিক সত্যতা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।

 

অভিজিৎ দীপকের এই দিল্লি সফর এবং তার পেছনের ঘটনাপ্রবাহ বেশ ঘটনাবহুল। জানা যায়, গত দশই অক্টোবর তিনি তার দাদির মৃত্যুর অত্যন্ত শোকাবহ সংবাদ পেয়ে জরুরি ভিত্তিতে মহারাষ্ট্রে নিজের জন্মস্থানে ছুটে গিয়েছিলেন।

 

পরিবারের এক প্রবীণ সদস্যকে হারানোর শোক কাটিয়ে বুধবার তিনি পুনরায় দিল্লিতে ফেরেন তার অসমাপ্ত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার জন্য। উল্লেখ্য, মহারাষ্ট্রে যাওয়ার আগেও দিল্লিতে তাকে পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল।

 

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার অভিযোগ এনে সিজেপি একটি বৃহৎ বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছিল। সেই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি যখন দিল্লিতে পৌঁছান, তখন বিমান থেকে নামার পরপরই দিল্লি পুলিশ তাকে আকস্মিকভাবে আটক করেছিল।

 

সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার সরাসরি বিমানবন্দরে সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে রাজনৈতিক হেনস্তার শিকার হতে হলো এই তরুণ নেতাকে। দিল্লিতে ফিরে এসে অভিজিৎ দীপকে তার দলের দুই সহযোদ্ধা এবং শীর্ষস্থানীয় নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসের গ্রেপ্তারের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেন।

 

সিজেপির এই দুই নেতাকে সম্প্রতি পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে বা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এই বিচার বিভাগীয় আদেশের তীব্র বিরোধিতা করে সিজেপি প্রধান প্রশ্ন তুলেছেন যে, স্বাধীন ভারতের মাটিতে দেশের নিজস্ব জাতীয় পতাকা ওড়ানো কি কোনো রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা আইনি অপরাধ?

 

অত্যন্ত আবেগপূর্ণ এবং তীক্ষ্ণ ভাষায় তিনি বলেন, "আমার দলের দুই নিবেদিতপ্রাণ কর্মী আশুতোষ এবং সৌরভকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে পাঁচ দিনের জন্য অন্ধকার কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। তাদের অপরাধ কী? তাদের একমাত্র অপরাধ হলো, তারা দিল্লির যন্তর মন্তরে গিয়ে বুক ফুলিয়ে ভারতের জাতীয় পতাকা উড়িয়েছিলেন।"

 

সরকারের এই দমনপীড়নমূলক আচরণের তুলনা করতে গিয়ে অভিজিৎ দীপকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের পাতা থেকে উদাহরণ টেনে আনেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন যে, বর্তমান সরকারের এই আচরণ সরাসরি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনকে মনে করিয়ে দেয়।

 

তার ভাষ্যমতে, "ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, সর্বশেষ ব্রিটিশ শাসনামলেই এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছিল। তখন প্রকাশ্যে স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর মতো দেশপ্রেমমূলক কাজের কারণে মহান স্বাধীনতাসংগ্রামীদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হতো।

 

আজ স্বাধীন ভারতেও আমরা ঠিক একই রকম একনায়কতন্ত্র ও পুলিশি রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি।" তার এই বক্তব্য বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরগুলোতে ব্যাপক সমর্থন লাভ করেছে। যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা ঘটেছিল গত মঙ্গলবার সকালে দিল্লির ঐতিহাসিক প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে।

 

সিজেপির কয়েকজন সদস্য সেখানে একটি আকস্মিক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পুলিশি বাধা এবং কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনী থাকা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা একটি লোহার ফটক টপকে প্রতিবাদস্থলের ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হন।

 

এরপর তারা সেখানে দৃপ্ত ভঙ্গিতে ভারতের জাতীয় পতাকা ওড়ান এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে বিভিন্ন গগনবিদারী স্লোগান দিতে থাকেন। এই শান্তিপূর্ণ কিন্তু নিয়মবহির্ভূত জমায়েতের অভিযোগে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে।

 

এই ঘটনার ঠিক এক দিন আগে, অর্থাৎ সোমবার, ভারতের কেন্দ্রীয় প্রশাসন এক আকস্মিক নির্দেশনার মাধ্যমে যন্তর মন্তরকে আনুষ্ঠানিকভাবে যেকোনো ধরনের বিক্ষোভ বা সমাবেশের স্থান হিসেবে ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং পূর্বের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেয়।

 

মূলত সরকারের এই আকস্মিক নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদেই পরদিন সিজেপি কর্মীরা সেখানে জড়ো হয়েছিলেন। দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছে যে, সিজেপি নেতারা যন্তর মন্তরে বেআইনিভাবে অনধিকার প্রবেশ করেছেন।

 

এর পাশাপাশি, পুলিশ দাবি করেছে যে এই নেতারা আগের দিন অর্থাৎ সোমবার আদালত থেকে জামিন পাওয়ার সময় যেসব আইনি শর্ত দেওয়া হয়েছিল, তা তারা সম্পূর্ণভাবে ভঙ্গ করেছেন। উল্লেখ্য, সোমবার আদালত থেকে জামিন পাওয়ার সময় অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা এবং সৌরভ দাসকে আগামী এক বছরের জন্য সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা বিঘ্নিত না করার একটি কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছিল।

 

পুলিশ মনে করছে, যন্তর মন্তরে তাদের এই আকস্মিক বিক্ষোভ সেই শর্তের সরাসরি লঙ্ঘন। সিজেপি নেতাদের ওপর পুলিশের এই অতিসক্রিয়তা এবং গ্রেপ্তারের ঘটনায় ভারতের অন্যান্য বিরোধী দলগুলোও তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।

 

ভারতের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধী এই গ্রেপ্তারের ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে একে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করার একটি সুপরিকল্পিত সরকারি অপচেষ্টা বলে আখ্যায়িত করেছেন।

 

অন্যান্য বিরোধী নেতারাও একমত পোষণ করেছেন যে, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে সাধারণ প্রতিবাদকারীদের ওপর এহেন কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করছে।

 

এদিকে, ভারতে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে ভোট জালিয়াতি এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজপথে যে বিক্ষোভের আগুন জ্বলছে, তার উত্তাপ এখন পৌঁছে গেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত।

 

গত সোমবার ভারতের বিভিন্ন বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে পুলিশের স্থাপন করা কঠোর ব্যারিকেড ও নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেদ করে গণতন্ত্রের জন্য পদযাত্রা নামক একটি বিশাল প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন।

 

এই পদযাত্রার মূল লক্ষ্য ছিল দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। শুধু রাজপথেই নয়, আইনি লড়াইয়ের অংশ হিসেবে বিরোধী দলগুলো সুপ্রিম কোর্টে একটি যৌথ আবেদনও জমা দিয়েছেন।

 

তাদের এই আবেদনে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় সংঘটিত কথিত অনিয়ম এবং দেশজুড়ে বিরাজমান নির্বাচনী দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও নিরপেক্ষ তদন্তের জোর দাবি জানানো হয়েছে।

 

সামগ্রিকভাবে, অভিজিৎ দীপকের মতো বিরোধী নেতার ওপর বিমানবন্দরে হেনস্তা, যন্তর মন্তরে রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেপ্তার এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধী জোটের সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া-এই সবকিছু মিলিয়ে ভারতের রাজনীতিতে বর্তমানে এক চরম অস্থিতিশীল ও উত্তেজনাপূর্ণ অধ্যায় চলছে।

 

সরকার এবং বিরোধীদের এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত আগামী দিনে ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের প্রধান আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

- এনডিটিভি