বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬
২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুরো প্রজন্মকে ভয় দেখিয়ে স্তব্ধ করার চেষ্টা করছে মোদি সরকার: মমতা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম

পুরো প্রজন্মকে ভয় দেখিয়ে স্তব্ধ করার চেষ্টা করছে মোদি সরকার: মমতা
ছবি : Collected

ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরোধী দলগুলোর ওপর সরকারি নিপীড়ন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) দুই শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তারের ঘটনা সেই বিতর্ককে পুনরায় উসকে দিয়েছে।

 

এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কড়া ভাষায় আক্রমণ শানিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি পুরো প্রজন্মকে ভয় দেখিয়ে তাদের কণ্ঠস্বর চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।

 

বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক সুদীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তায় তিনি এই আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেন। একইসঙ্গে দেশের চলমান গণতান্ত্রিক সংকট মোকাবিলায় এবং সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার্থে সব স্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিক।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ভারতের এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তাপকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ এটি বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে তৃণমূল নেত্রী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বর্তমানে সুপরিকল্পিতভাবে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হচ্ছে। বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং ভিন্নমতের মানুষদের ওপর শাসকদলের এই আগ্রাসী মনোভাব দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর জন্য এক অশনিসংকেত বলে তিনি মনে করেন।

 

নিজের রাজ্যের প্রসঙ্গ টেনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি গুরুতর পরিসংখ্যান তুলে ধরে দাবি করেন যে, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ১৪ হাজার মানুষ বর্তমানে পুলিশি ও রাজনৈতিক হয়রানি বা অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর অতিসক্রিয়তা এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর অব্যাহত চাপের বিষয়টিই তৃণমূল নেত্রীর এই বক্তব্যের মূল লক্ষ্য। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, গণতন্ত্র রক্ষার এই সুদীর্ঘ ও কঠিন লড়াইয়ে তিনি সর্বদা দেশের মুক্তমনা তরুণ প্রজন্মের পাশে অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে আছেন।

 

তরুণরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ এবং তাদের কণ্ঠরোধ করার যেকোনো অপচেষ্টা রুখে দিতে তিনি বদ্ধপরিকর। শুধু তৃণমূল কংগ্রেসই নয়, ভারতের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসও এই ইস্যুতে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

 

কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে সরাসরি কর্তৃত্ববাদী এবং স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব পোষণের অভিযোগ এনেছেন। বিশেষ করে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ এবং দেশের রাজধানী নয়াদিল্লির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ঐতিহাসিক প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত বিরোধীদের ওপর আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধের তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি।

 

খাড়গের মতে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকার নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের অংশ। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই অধিকারকেও নগ্নভাবে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

যন্তর মন্তরে ঘটা সাম্প্রতিক ঘটনাটি বিরোধী শিবিরের এই ক্ষোভের আগুনে রীতিমতো ঘি ঢেলেছে। মঙ্গলবার যন্তর মন্তর এলাকায় একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি চলাকালে ‘অবৈধ’ অনুপ্রবেশ এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর মতো গুরুতর অভিযোগ তুলে তিন সিজেপি নেতাকে আটক করে দিল্লি পুলিশ।

 

আটককৃতদের মধ্যে ছিলেন আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাস এবং অজিঙ্ক শিণ্ডে। এই আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে আশুতোষ রাঙ্কা এবং সৌরভ দাসকে পাঁচ দিনের জন্য বিচার বিভাগীয় হেফাজতে বা জেল হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আদালত।

 

অন্যদিকে, অপর এক কর্মী অজিঙ্ক শিণ্ডেকে শর্তসাপেক্ষে ব্যক্তিগত বন্ডে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। আদালত তাঁকে আগামী ছয় মাস সমাজে পূর্ণ শান্তি ও সদাচরণ বজায় রাখার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। বিরোধী দলগুলো এই আইনি পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিরোধীদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার একটি সুকৌশলী হাতিয়ার হিসেবেই দেখছে।

 

গ্রেপ্তার এবং আইনি প্রক্রিয়ার এই পুরো বিষয়টিতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আইন বিভাগ। দলটির আইন বিভাগের প্রধান রত্না সিং পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট অভিযোগ এনেছেন।

 

তাঁর দাবি, আটকের পর ওই তিন কর্মীকে দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা তাদের নিযুক্ত আইনজীবীদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি, যা দেশের প্রচলিত আইন ও বন্দিদের মৌলিক অধিকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

 

এমনকি আটকের প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের ঠিক কী কারণে বা কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আটক করা হচ্ছে, সে বিষয়েও পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। আইনি অধিকার থেকে এই বঞ্চনার ঘটনাটি দেশের মানবাধিকার কর্মী এবং নাগরিক সমাজের মধ্যেও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

 

পুরো ঘটনাটির সূত্রপাত মূলত ভারতের নির্বাচন কমিশনের একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতিত্ব এবং ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে দীর্ঘদিন ধরেই রাজপথে সরব রয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।

 

বিরোধীদের আশঙ্কা, এই এসআইআর প্রক্রিয়ার আড়ালে সুকৌশলে ভোটার তালিকায় বড় ধরনের রদবদল ঘটানোর চেষ্টা চলছে, যা আগামী নির্বাচনগুলোর স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

 

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই লাগাতার প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল। আর সেই চলমান গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাঝেই বিরোধীদের ওপর পুলিশের এই কঠোর ধরপাকড় এবং আটকের ঘটনা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও বেশি উত্তপ্ত করে তুলেছে।

 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, আগামী দিনগুলোতে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে সরকার এবং বিরোধী শিবিরের মধ্যকার এই সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে, যা ভারতের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।

 

- এএনআই