মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আটক নারী বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতনের অভিযোগ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:৩২ পিএম

আটক নারী বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতনের অভিযোগ
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে চলমান রাজনৈতিক ও গণআন্দোলনের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং পাশবিক আচরণের এক অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে।

 

ভারতের নির্বাচন কমিশনের সর্বোচ্চ পদ অর্থাৎ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে গত কয়েকদিন ধরে রাজধানী দিল্লিতে যে তীব্র ছাত্র ও নাগরিক বিক্ষোভ চলছে, সেই আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করার কৌশল হিসেবে আটক নারী বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশি হেফাজতে নির্মম শারীরিক নির্যাতন ও চরম যৌন নিপীড়ন চালানো হয়েছে বলে জোরালো দাবি করা হয়েছে।

 

বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ভারতের খোদ রাজধানীতে, যেখানে নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষিত থাকার কথা, সেখানে পুলিশের গাড়ির ভেতরে নারী পুলিশ সদস্যদের দ্বারা নারী আন্দোলনকারীদের ওপর এহেন অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কাজ করা গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

 

একটি গণতান্ত্রিক দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার কীভাবে পুলিশি বর্বরতার মাধ্যমে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, এই ঘটনা তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে সমালোচিত হচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় ভারতীয় গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া ভুক্তভোগী নারী এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের লোমহর্ষক বিবরণ অনুযায়ী, এই ন্যক্কারজনক ও অভাবনীয় ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত রোববার।

 

ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তার অবিলম্বে অপসারণের দাবিতে সপ্তাহান্তে অর্থাৎ গত শনিবার ও রোববার রাজধানী নয়াদিল্লিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’সহ ভারতের বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন, অধিকারকর্মী ও প্রতিবাদী নাগরিক সমাজ এক সুবিশাল ও টানা বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেয়।

 

তাদের এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল দিল্লির ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে সমবেত হয়ে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও অহিংস উপায়ে নিজেদের যৌক্তিক দাবিদাওয়া রাষ্ট্রযন্ত্র ও সরকারের সর্বোচ্চ মহলের কাছে তুলে ধরা।

 

কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের এই গণতান্ত্রিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুরো নয়াদিল্লি জুড়ে প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর তরফ থেকে এক নজিরবিহীন, কঠোর ও ভীতিপ্রদ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়।

 

রাজধানীর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে এবং রাজপথে কয়েক স্তরের পুলিশের ব্যারিকেড ও কাঁটাতারের বেড়া বসানো হয়, যাতে কোনোভাবেই আন্দোলনকারীরা সংগঠিত হতে না পারেন। পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে আন্দোলনকারীদের একটি বিশাল মিছিল যখন ঐক্যবদ্ধভাবে যন্তর মন্তরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে, ঠিক তখনই বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য তাদের পথরোধ করে দাঁড়ায়।

 

কোনো ধরনের উসকানি, বিশৃঙ্খলা বা পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই পুলিশ অত্যন্ত মারমুখী ও আগ্রাসী ভঙ্গিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হয় এবং শক্তি প্রয়োগ করে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারীকে ঘটনাস্থল থেকেই আটক করে জোরপূর্বক পুলিশের অপেক্ষমাণ ভ্যানে তুলে নেয়।

 

আটক করার এই প্রক্রিয়ায় পুলিশের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে, যা স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকারকে সরাসরি খর্ব করার শামিল। গত মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘স্ক্রল ডট ইন’-এর কাছে দেওয়া এক বিশেষ, বিস্তৃত ও চাঞ্চল্যকর সাক্ষাৎকারে নওরিন নামের এক নারী বিক্ষোভকারী পুলিশের এই অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।

 

তিনি ভারতের একটি পরিচিত রাজনৈতিক সংগঠন ‘ওয়ার্কার্স পার্টি অব ইন্ডিয়া’-এর একজন সক্রিয় ও নিবেদিতপ্রাণ সদস্য। নওরিন তার সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত স্পষ্ট ও দৃঢ় ভাষায় অভিযোগ করেন যে, গত রোববার মধ্য দিল্লিতে তাদের আয়োজিত কর্মসূচিটি প্রথম থেকেই সম্পূর্ণ অহিংস, সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ ছিল।

 

আন্দোলনকারীরা কোনো ধরনের ভাঙচুর বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর মতো কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেননি। তা সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত আগ্রাসী ও দমনমূলক মনোভাব নিয়ে তাদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায় এবং সর্বমোট ১৬ জন আন্দোলনকারীকে ঘটনাস্থল থেকে জোরপূর্বক আটক করে একটি পুলিশ ভ্যানে তোলে।

 

এই ১৬ জন আটকের মধ্যে ১৫ জনই ছিলেন নারী আন্দোলনকারী, যা পুলিশের এই নির্বিচার আটকের ঘটনাকে আরও বেশি সংবেদনশীল ও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। নওরিনের দেওয়া মর্মান্তিক ও শিউরে ওঠার মতো অভিযোগ অনুযায়ী, নারী আন্দোলনকারীদের জোর করে পুলিশের ভ্যানে তোলার পরপরই শুরু হয় এক অবর্ণনীয়, অমানবিক ও মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন।

 

আশ্চর্যজনক ও চরম হতাশার বিষয় হলো, এই বর্বরোচিত নির্যাতনের মূল হোতা ছিলেন খোদ ইউনিফর্ম পরিহিত নারী পুলিশ সদস্যরা। ভ্যানের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কর্তব্যরত নারী পুলিশেরা একে একে আটক ও সম্পূর্ণ অসহায় নারী বিক্ষোভকারীদের ওপর পাশবিক কায়দায় শারীরিক হামলা চালাতে শুরু করেন।

 

এই নির্যাতনের ধরন ও মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, তা যেকোনো আধুনিক ও সভ্য সমাজের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণবিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থি। নওরিন তার সাক্ষাৎকারে সুনির্দিষ্টভাবে ‘দিশা স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন’-এর সদস্য শারন্যা নামের এক তরুণী নারী আন্দোলনকারীর ওপর হওয়া পাশবিক ও প্রাণঘাতী নির্যাতনের কথা অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে উল্লেখ করেন।

 

তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, পুলিশের ওই আবদ্ধ ভ্যানের ভেতরে শারন্যাকে নির্মমভাবে মেঝেতে ফেলে দেওয়া হয় এবং একজন নারী পুলিশ সদস্য অত্যন্ত হিংস্রভাবে তার গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করেন।

 

শ্বাসরুদ্ধ করার এই প্রাণঘাতী চেষ্টার পাশাপাশি অপর একজন পুলিশ সদস্য নিজের কনুই দিয়ে শারন্যার শরীরে, বুকে ও পিঠে উপর্যুপরি ও মারাত্মকভাবে আঘাত করতে থাকেন। পরবর্তীতে এই অমানবিক নির্যাতনের ফলে শারন্যার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটলে এবং তিনি জ্ঞান হারানোর উপক্রম হলে বাধ্য হয়ে এক পুলিশ সদস্য তাকে তড়িঘড়ি করে চিকিৎসার জন্য অন্যত্র নিয়ে যান বলে নওরিন সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।

 

পুলিশের এই বর্বরোচিত ও অমানবিক হামলার সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক, জঘন্য ও নিন্দনীয় দিকটি ছিল আটক নারীদের ওপর চরম যৌন নিপীড়নের অভিযোগ। নওরিন অত্যন্ত ক্ষোভ, অপমান ও হতাশার সঙ্গে দাবি করেন যে, ভ্যানের ভেতরে আবদ্ধ থাকা অন্যান্য নারী বিক্ষোভকারীদের ওপর সাধারণ শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি চরম মাত্রায় যৌন নিপীড়ন ও বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়েছে।

 

নারী পুলিশ সদস্যরা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এবং আন্দোলনকারীদের মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে নারী আন্দোলনকারীদের সংবেদনশীল অঙ্গ, বিশেষ করে বুক ও যৌনাঙ্গে সজোরে লাথি এবং মারাত্মক আঘাত করেছেন বলে তিনি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন।

 

রাষ্ট্রের আইন রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত একজন নারীর প্রতি আরেকজন নারী পুলিশ সদস্যের এমন অমানবিক, নিষ্ঠুর ও চরম অবমাননাকর আচরণ আন্দোলনকারীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও হতবাক করে দিয়েছে।

 

পুলিশের এই নজিরবিহীন নিষ্ঠুরতা, নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো প্রমাণ, অডিও বা ভিডিও চিত্র যেন কোনোভাবেই ভ্যানের বাইরে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেতে না পারে, ঠিক সেই হীন উদ্দেশ্যে নির্যাতনের শিকার নারীদের কাছ থেকে তাদের ব্যক্তিগত ব্যবহৃত মুঠোফোনগুলো জোরপূর্বক ও তাৎক্ষণিকভাবে কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাদের বাইরের দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়।

 

এত মারাত্মক, গুরুতর ও স্পর্শকাতর অভিযোগ জনসমক্ষে আসার পরও এখন পর্যন্ত দিল্লি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, ব্যাখ্যা বা আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক কোনো বিবৃতি প্রদান করা হয়নি।

 

পুলিশের এই রহস্যজনক ও নিশ্চুপ অবস্থান সাধারণ জনমনে আরও বেশি সন্দেহ, আতঙ্ক ও ক্ষোভের সঞ্চার করছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এই লোমহর্ষক অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো পর্যন্ত স্বাধীন বা নিরপেক্ষ কোনো তদন্তকারী সংস্থা, মানবাধিকার কমিশন বা আদালতের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

তবে ভুক্তভোগীদের এমন সরাসরি ও প্রত্যক্ষ বিবরণ এবং তার বিপরীতে পুলিশের সম্পূর্ণ নীরবতা এই ঘটনার ভয়াবহতা ও গুরুত্বকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন কমিশনের মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্তার অপসারণের দাবিতে শুরু হওয়া এই যৌক্তিক আন্দোলনটি এখন পুলিশের নির্মম বর্বরতা, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে এক নতুন, বৃহত্তর ও সর্বাত্মক মাত্রার প্রতিবাদে রূপ নিতে যাচ্ছে।

 

সচেতন নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এখন এই নজিরবিহীন পুলিশি নির্যাতনের একটি বিচার বিভাগীয় ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষী পুলিশ সদস্যদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনার জন্য সরকারের ওপর তীব্র চাপ প্রয়োগ করছে।