রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০২৬
২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধ্রুব রাঠীর চাঞ্চল্যকর 'অপহরণ' অভিযোগ, মোদিকে স্মরণ করালেন স্বৈরশাসকদের পরিণতি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:১২ পিএম

ধ্রুব রাঠীর চাঞ্চল্যকর 'অপহরণ' অভিযোগ, মোদিকে স্মরণ করালেন স্বৈরশাসকদের পরিণতি
ছবি : Collected

ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অন্যতম আলোচিত ও জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠী নিজের আকস্মিক আটককে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে এক গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। শনিবার সকালে তার গুরুগ্রামের বাসভবন থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং দীর্ঘ সময় পর গভীর রাতে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

 

মুক্তি পাওয়ার পর এক বিস্তারিত ভিডিওবার্তায় তিনি দাবি করেছেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই পদক্ষেপ কোনো বৈধ আইনি প্রক্রিয়ায় আটক বা গ্রেপ্তার ছিল না, বরং এটি ছিল সম্পূর্ণভাবে একটি সুপরিকল্পিত 'অপহরণ'।

 

এই নজিরবিহীন ঘটনার পর তিনি ভারতের বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিস্থিতিকে উত্তর কোরিয়ার মতো রুদ্ধ ও একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ্য করে অ্যাডলফ হিটলার ও বেনিতো মুসোলিনির মতো ইতিহাসের কুখ্যাত স্বৈরশাসকদের চূড়ান্ত পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এক কড়া ও সুস্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে।

 

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিতে গিয়ে ধ্রুব রাঠী তার ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চরম লঙ্ঘনের চিত্র হিসেবেই প্রতীয়মান হয়।

 

তিনি জানান, শনিবার সকাল আনুমানিক সাতটার দিকে তিনি যখন তার নিজ বাসভবনে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন, তখন আকস্মিকভাবে এই রোমহর্ষক ঘটনা ঘটে। তার বাড়ির বাইরে বেশ কিছু অপরিচিত লোক সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করছে দেখে তার মা বাধ্য হয়ে দরজা খোলেন।

 

দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই সাধারণ পোশাকে থাকা ওই অজ্ঞাত ব্যক্তিরা কোনো ধরনের পূর্বানুমতি, পরিচয়পত্র প্রদর্শন বা আইনি পরোয়ানা ছাড়াই তার মাকে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে ধাক্কা দিয়ে জোরপূর্বক বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন।

 

এরপর তারা কালক্ষেপণ না করে সরাসরি ধ্রুব রাঠীর ব্যক্তিগত শয়নকক্ষে বা বেডরুমে ঢুকে পড়েন। ধ্রুব জানান, ঘুম থেকে ওঠার পর পরিস্থিতি বোঝার বা কোনো যৌক্তিক প্রশ্ন করার ন্যূনতম আইনি সুযোগটুকুও তাকে দেওয়া হয়নি।

 

এমনকি তাকে তার জুতো পরার সামান্য সময়ও দেওয়া হয়নি। তাকে আক্ষরিক অর্থেই টেনেহিঁচড়ে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। এই আকস্মিক, অতর্কিত ও বলপ্রয়োগের সময় তিনি হাতে ও পায়ে বেশ কিছু আঘাতও পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।

 

ধ্রুব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, যারা তাকে নিতে এসেছিলেন তাদের কারও পরনেই পুলিশের কোনো নির্ধারিত পোশাক ছিল না, যা এই ঘটনাকে আইনি আটকের পরিবর্তে একটি সংঘবদ্ধ অপহরণের রূপই প্রদান করে।

 

ধ্রুব রাঠীর এই আকস্মিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত আটকের নেপথ্যে রয়েছে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতিবাদ কর্মসূচি। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) রাজধানী দিল্লির প্রাণকেন্দ্র যন্তর মন্তরে এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছিল।

 

ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ওঠা সাম্প্রতিক নানা বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে এই আন্দোলন বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করছিল। মূলত সিজেপির এই গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সশরীরে অংশগ্রহণ করার উদ্দেশ্যেই ধ্রুব রাঠী সুদূর জার্মানি থেকে ভারতে এসেছিলেন।

 

কিন্তু তিনি যেন কোনোভাবেই ওই বিক্ষোভস্থলে পৌঁছাতে না পারেন এবং তার উপস্থিতিতে এই সরকারবিরোধী আন্দোলন যেন আরও বেশি জনসমর্থন বা জোরালো রূপ নিতে না পারে, সেই উদ্দেশ্যেই অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে শনিবার সকালে তাকে তার গুরুগ্রামের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পাশাপাশি ধ্রুব রাঠীর নাগরিকত্ব নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে এক নতুন বিতর্কের অবতারণা করা হয়েছিল। তিনি যেহেতু ব্যক্তিগত ও পেশাগত কারণে দীর্ঘ সময় ধরে জার্মানিতে বসবাস করছেন, তাই সরকারের সমর্থক ও একটি নির্দিষ্ট মহল থেকে ক্রমাগত এই প্রশ্ন তোলা হচ্ছিল যে, তিনি আদৌ ভারতের নাগরিক কি না এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ কোনো রাজনৈতিক প্রতিবাদ বা অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার আইনি ও সাংবিধানিক অধিকার তার রয়েছে কি না।

 

এই সমস্ত ভিত্তিহীন বিতর্ক ও পরিকল্পিত অপপ্রচারের মোক্ষম জবাব দিতে রবিবার প্রকাশিত নিজের ভিডিওবার্তায় ধ্রুব একটি পাসপোর্ট প্রদর্শন করেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে প্রমাণ করেন যে, সেটি তার নিজস্ব ও বৈধ ভারতীয় পাসপোর্ট এবং তিনি জন্মসূত্রে ও আইনত ভারতেরই একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক।

 

একজন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে দেশের যেকোনো গণতান্ত্রিক, অহিংস প্রতিবাদ ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সম্পূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার তার রয়েছে বলে তিনি স্পষ্টভাবে দাবি করেন এবং এই অধিকার খর্ব করার যেকোনো অপচেষ্টার তীব্র নিন্দা জানান।

 

তাকে তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘ চব্বিশ ঘণ্টার কাছাকাছি সময় তার সঙ্গে ঠিক কী ধরনের অমানবিক আচরণ করা হয়েছিল, সেই লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথাও ধ্রুব তার বার্তায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেছেন।

 

পুলিশ বা প্রশাসন শনিবার তাকে সরকারিভাবে কোথায় বা কোন হেফাজতে আটকে রেখেছিল, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি বা তথ্য প্রকাশ করেনি। ধ্রুব রাঠী অভিযোগ করেছেন যে, তাকে আটকের পর কোনো নির্দিষ্ট স্থানে না রেখে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এক থানা থেকে আরেক থানায় ক্রমাগত ঘোরানো হয়েছে।

 

তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদ্দেশ্যহীনভাবে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। আটকের পর একজন নাগরিকের যে মৌলিক আইনি ও মানবাধিকার থাকে, তার সবকটি থেকেই তাকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।

 

তাকে তার পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি, এমনকি তার আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার সাংবিধানিক অধিকারও জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটি সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে জব্দ করে রাখা হয়েছিল, যাতে তিনি বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ স্থাপন করতে না পারেন।

 

ধ্রুব অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন, টানা বাইশ থেকে তেইশ ঘণ্টা কোনো আইনি প্রক্রিয়া বা গ্রেপ্তার মেমো ছাড়া এভাবে আটকে রাখাকে রাষ্ট্রীয় অপহরণ ছাড়া আর কী নামে আখ্যায়িত করা যায়?

 

গভীর রাতে তাকে পুলিশি হেফাজত থেকে মুক্তি দেওয়া হলেও, ধ্রুব রাঠীর দাবি অনুযায়ী তার বিপদ বা প্রশাসনিক হয়রানি এখনো বিন্দুমাত্র শেষ হয়নি। বর্তমানে তাকে অঘোষিতভাবে নিজের বাসভবনে গৃহবন্দি বা নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে বলে তিনি অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।

 

তার বাড়ির চারপাশে অন্তত পনেরো জন সন্দেহভাজন ব্যক্তি সবসময় কড়া নজরদারি চালাচ্ছেন, যাতে তিনি কোনোভাবেই বাড়ি থেকে স্বাধীনভাবে বের হতে না পারেন বা অন্য কোনো রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে না পারেন।

 

একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিককে বিনা অপরাধে এভাবে নজরবন্দি করে রাখার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন।

 

তিনি ক্ষমতাসীন সরকারের উদ্দেশ্যে বলেছেন, সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে এত বেশি ভয় দেখানোর চেষ্টা করা উচিত নয় যে একপর্যায়ে তাদের মন থেকে ভয়ের অস্তিত্বই চিরতরে মুছে যায় এবং তারা স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।

 

ইতিহাসের পাতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যাওয়া হিটলার ও মুসোলিনির মতো একনায়কদেরও চূড়ান্ত পতন অত্যন্ত করুণ ও ভয়াবহভাবে হয়েছিল।

 

কোনো সরকারই চিরস্থায়ী নয় এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করলে তার পরিণতি কখনো সুখকর হয় না বলে তিনি সতর্ক করেন। পরিশেষে, তাকে এবং সিজেপির অন্যান্য আটক নেতাদের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া না হলে আমরণ অনশনে বসার যে সাহসী ও ঐতিহাসিক হুঁশিয়ারি প্রখ্যাত পরিবেশকর্মী, শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক সোনম ওয়াংচুক দিয়েছিলেন, তার জন্য ধ্রুব তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন।

 

এই ঘটনা ভারতের বাকস্বাধীনতা, ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।