শনিবার, অক্টোবর ১০, ২০২৬
২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দিল্লিতে আটক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:৩১ পিএম

দিল্লিতে আটক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
ছবি: Collected

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে রাজনৈতিক উত্তাপ ও উত্তেজনা এক নতুন এবং নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছেছে। দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে পূর্বঘোষিত একটি বিশাল বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে ব্যাপক ধরপাকড় এবং কঠোর পুলিশি পদক্ষেপ শুরু হয়েছে।

 

এই গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে নয়াদিল্লির পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। শনিবার সকালে নয়াদিল্লিতে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনের বাইরে থেকে তাকে আকস্মিকভাবে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ এবং ভারতের কেন্দ্রীয় আধা-সামরিক বাহিনী (সিআরপিএফ)।

 

দেশের অন্যতম প্রবীণ ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে এভাবে আটক করার ঘটনা ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ভারতের স্বনামধন্য জাতীয় দৈনিক ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’-এর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার সকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনের বাইরে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য অবস্থান নেন এবং পরবর্তীতে তাকেসহ আরও পাঁচজন রাজনৈতিক কর্মীকে সেখান থেকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়।

 

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আটকের পরপরই তার রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ এবং তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব এবং মুখপাত্ররা জানিয়েছেন যে, আটকের পর পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কারাবন্দিদের বহনের বিশেষ যানে করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার সঙ্গীদের সম্পূর্ণ অজ্ঞাত একটি স্থানে নিয়ে যাচ্ছে।

 

তাদের কোথায় রাখা হয়েছে বা তাদের বিরুদ্ধে ঠিক কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য প্রদান করা হয়নি। মূলত ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি নামক একটি রাজনৈতিক দলের পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানী নয়াদিল্লিতে যে নজিরবিহীন ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে, তারই ধারাবাহিকতায় বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের ওপর এই ধরনের ধরপাকড় ও আটকের ঘটনা ঘটছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের কণ্ঠস্বরকে এভাবে পুলিশি প্রহরায় স্তব্ধ করার চেষ্টা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সমোলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই অভাবনীয় রাজনৈতিক উত্তেজনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ককরোচ জনতা পার্টির একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও এক দফা দাবি।

 

দলটি বেশ কিছুদিন ধরেই ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন তুলে আসছিল। এই ধারাবাহিকতায় শনিবার সকাল দশটার দিকে নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তর এলাকায় এক বিশাল গণবিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল সিজেপি।

 

তাদের প্রধান ও একমাত্র দাবি ছিল ভারতের বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে যেকোনো দলের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার সাংবিধানিক অধিকার থাকলেও, দিল্লি পুলিশ প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির আশঙ্কা প্রকাশ করে এই কর্মসূচির জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমতি প্রদান করেনি।

 

তবে সিজেপি নেতৃত্ব অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিল যে, তারা পুলিশ প্রশাসনের এই অযৌক্তিক ও অগণতান্ত্রিক নিষেধাজ্ঞার কোনোভাবেই তোয়াক্কা করবে না এবং পূর্বনির্ধারিত সময়েই তাদের বিক্ষোভ কর্মসূচি রাজপথে শুরু হবে।

 

সিজেপির এই অনড় অবস্থানের পর প্রশাসনও অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও নাটকীয় উদাহরণটি দেখা যায় দিল্লি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। পূর্বনির্ধারিত এই গণবিক্ষোভ কর্মসূচিতে সশরীরে অংশ নিতে এবং আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করতে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা উড়োজাহাজে করে বাণিজ্যনগরী মুম্বাই থেকে নয়াদিল্লির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।

 

স্থানীয় সময় সকাল দশটা বেজে উনিশ মিনিটে তাদের বহনকারী বাণিজ্যিক ফ্লাইটটি যখন নয়াদিল্লি বিমানবন্দরে অবতরণ করে, তখন সেখানে আগে থেকেই সতর্ক অবস্থায় প্রস্তুত ছিল দিল্লি পুলিশের একটি বিশেষ দল।

 

উড়োজাহাজটি রানওয়ে স্পর্শ করার পরপরই পুলিশ সদস্যরা সরাসরি বিমানের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সাধারণ যাত্রীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই এই তিন শীর্ষ নেতাকে বিমান থেকেই আকস্মিকভাবে আটক করেন।

 

কোনো রাজনৈতিক নেতাকে সরাসরি বিমানের ভেতর থেকে আটকের এই ঘটনা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল এবং এটি প্রশাসনের চরম অসহিষ্ণুতার সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

বিমান থেকে আটক করার এই পুরো শ্বাসরুদ্ধকর প্রক্রিয়াটি সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে সরাসরি সম্প্রচার করেন। মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিও ফুটেজে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখা যায়, দিল্লি পুলিশের একটি দল বিমানের ভেতর প্রবেশ করে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।

 

সাধারণ যাত্রীদের উপস্থিতিতে বিমানের মতো একটি সংরক্ষিত ও সংবেদনশীল স্থানে এ ধরনের পুলিশি অভিযানের ঘটনায় ব্যাপক হট্টগোল ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা কোনো ধরনের কালক্ষেপণ না করে অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করে বিমান থেকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে যাচ্ছেন।

 

আধুনিক প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে এই আটকের দৃশ্য মুহূর্তে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দিল্লি পুলিশের এই দমন-পীড়ন ও ধরপাকড় কেবল রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের ওপরও নেমে এসেছে।

 

সিজেপি নেতাদের সঙ্গে এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার জন্য সুদূর জার্মানি থেকে ভারতে ছুটে এসেছিলেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও সমালোচনামুখর ভিডিও নির্মাতা ধ্রুব রাঠী। সরকার ও প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির তথ্যবহুল ও বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করে তরুণ সমাজের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জনকারী এই তরুণকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

 

৩২ বছর বয়সী ধ্রুব রাঠীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিশাল ও অভাবনীয় অনুসারী গোষ্ঠী রয়েছে। শুধুমাত্র স্বনামধন্য ভিডিও শেয়ারিং মাধ্যমেই তার তিন কোটি ত্রিশ লাখের বেশি গ্রাহক রয়েছে, ইনস্টাগ্রামে অনুসারীর সংখ্যা এক কোটি নব্বই লাখ এবং সামাজিক মাধ্যম এক্সে তাকে অনুসরণ করেন তেত্রিশ লাখের বেশি মানুষ।

 

এই বিপুল জনপ্রিয়তা ও প্রভাবের কারণেই প্রশাসন তাকে রাজপথের আন্দোলন থেকে দূরে রাখতে চেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শনিবার সকালের দিকে রাজধানী সংলগ্ন গুরুগ্রামের একটি আবাসিক এলাকায় অবস্থিত ধ্রুব রাঠীর নিজ বাসভবনে এক বিশাল অভিযান পরিচালনা করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

 

অত্যন্ত আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, শুধুমাত্র একজন ভিডিও নির্মাতাকে গ্রেপ্তার করার জন্য দিল্লি পুলিশের প্রায় পঞ্চাশ জন সদস্যের একটি বিশাল দল এই অভিযানে অংশগ্রহণ করে। একটি সাধারণ বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবক পর্যন্ত সকলকে এমন কঠোরভাবে দমন করার এই কৌশল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ এবং ‘এনডিটিভি’-এর মতো ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী নয়াদিল্লি এখন কার্যত একটি অবরুদ্ধ নগরীতে পরিণত হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চরম হুমকির সম্মুখীন।

 

দেশের সর্বোচ্চ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুরাহা না করে উল্টো প্রতিবাদকারীদের ওপর এমন রাষ্ট্রীয় শক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার সুস্থ গণতান্ত্রিক কাঠামোর লক্ষণ হতে পারে না।

 

- টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি