খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সুহাইল আফ্রিদির প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে হাজার হাজার নেতাকর্মীর অংশগ্রহণে এই বিশাল প্রতিবাদ কর্মসূচি রাজধানী ইসলামাবাদের দিকে ধেয়ে আসছে।
এমন এক ঘোলাটে ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার। উদ্ভূত এই রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকট মোকাবিলায় পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছেন, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনাকল্পনা শুরু হয়েছে।
পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমের একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনের সূত্র ধরে জানা গেছে যে, শনিবার দশই অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে এই উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্যবৃন্দ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফকে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি, পিটিআইয়ের লংমার্চের গতিবিধি এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে অবহিত করা হবে।
কেন্দ্রীয় সরকার প্রদেশের এই গণজাগরণ ও প্রতিবাদ কর্মসূচিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং যেকোনো মূল্যে রাজধানীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর যে তথ্যটি সূত্রগুলোর মাধ্যমে বেরিয়ে এসেছে তা হলো, খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনা করে সেখানে জরুরি অবস্থা জারির মতো চরম পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি এই বৈঠকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি সরকার সত্যিই এমন কোনো কঠোর পদক্ষেপের দিকে অগ্রসর হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তবে তা পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি করতে হলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।
তাই উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় আইনি ও সাংবিধানিক অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ যেকোনো মুহূর্তে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একটি বিশেষ ও জরুরি বৈঠকও ডাকতে পারেন বলে ওই সূত্রগুলো আভাস দিয়েছে।
এই বিষয়ে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তারিক ফজল চৌধুরী সংবাদমাধ্যমের কাছে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মন্তব্য করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারির বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে প্রাথমিক আলোচনা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
তবে এই আলোচনার ভিত্তিতে ঠিক কী ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট করে কোনো তথ্য প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানান। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে বলেন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে এ ধরনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া একটি অত্যন্ত নিয়মিত ও স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
তাই এই নির্দিষ্ট বৈঠকটিকেই জরুরি অবস্থা জারির মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ডাকা কোনো বিশেষ বা নির্ণায়ক বৈঠক হিসেবে আখ্যায়িত করতে তিনি রাজি হননি। তবে তার এই মন্তব্য রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের জল্পনা থামাতে পারেনি।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে, পিটিআইয়ের এই গণমিছিল বা লংমার্চের অংশগ্রহণকারীদের কোনো অবস্থাতেই রাজধানী ইসলামাবাদে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
তার এই বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, কেন্দ্রীয় সরকার এবার পিটিআইয়ের এই আন্দোলনকে আর কোনোভাবেই ছাড় দিতে রাজি নয়। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, এবার এই লাগাতার আন্দোলনের একটি চূড়ান্ত অবসান ঘটাবে সরকার।
রাজধানীতে প্রবেশ করে নিজেদের ইচ্ছামতো অবস্থান কর্মসূচি পালন করার মাধ্যমে দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত করার কোনো সুযোগ পিটিআইকে আর দেওয়া হবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই কড়া বার্তার পর রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বহুগুণ জোরদার করা হয়েছে এবং সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।
এরই মধ্যে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এক নতুন মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সুহাইল আফ্রিদিকে তার ভূমিকার জন্য কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির বর্ষীয়ান নেতা এবং প্রদেশটির বর্তমান গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি।
প্রদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ক্রমাবনতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি প্রাদেশিক সরকারের দায়িত্বশীলতা ও ভূমিকা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, প্রাদেশিক সরকার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
একই সঙ্গে, সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থা দমনে প্রণীত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বর্তমান প্রাদেশিক সরকার কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, সে বিষয়েও তিনি প্রকাশ্যে জবাবদিহিতা দাবি করেছেন।
রাজনৈতিক এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের অভ্যন্তরেও এক গভীর ফাটল ও অন্তর্দ্বন্দ্বের খবর সামনে এসেছে। খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সুহাইল আফ্রিদির বিরুদ্ধে দলের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়ে আপস বা সমঝোতা করার মতো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন দলটিরই আরেক প্রভাবশালী নেতা এবং সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আলী আমিন গান্দাপুর।
সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি বিতর্কিত কণ্ঠস্বরভিত্তিক বার্তায় এই অভিযোগের সূত্রপাত হয়। ওই বার্তায় শোনা যায়, সুহাইল আফ্রিদির বিরুদ্ধে দলের নীতিবহির্ভূত কাজে জড়িত থাকার এবং কারাবন্দি নেতা ইমরান খানের সঙ্গে দলের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের সাক্ষাতের সুযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সীমিত করার অভিযোগ আনা হচ্ছে। এই তথ্য ফাঁসের পর রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
পরবর্তীতে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আলী আমিন গান্দাপুরের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র গণমাধ্যমের কাছে ফাঁস হওয়া ওই বার্তাটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন, যা পিটিআইয়ের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে আরও প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এই অভিযোগের পর চরম বিভ্রান্তি ও হতাশার মধ্যে পড়েছেন।
তবে যার বিরুদ্ধে এত বড় অভিযোগ, সেই মুখ্যমন্ত্রী সুহাইল আফ্রিদি এখন পর্যন্ত এসব অভিযোগের বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করছেন। গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে বারবার চেষ্টা করা হলেও তিনি এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তার এই নিশ্চুপ অবস্থান দলের ভেতরের সন্দেহ ও অবিশ্বাসকে আরও ঘনীভূত করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
পাকিস্তানের এই চলমান সংকট কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব নিয়েও বিশ্লেষকরা চিন্তিত। এমতাবস্থায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি যে ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন, তা পাকিস্তানের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরেই দেশটি চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং বারবার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক ঋণদানকারী সংস্থাগুলোর কাছে একটি নেতিবাচক বার্তা পৌঁছাচ্ছে।
রাজধানী ইসলামাবাদ যদি আবারো কোনো দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ বা রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, তবে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর এক বিশাল আঘাত হানবে বলে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন।
সরকার কোনোভাবেই চাইছে না যে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা অন্যান্য অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে চলমান আলোচনা ও চুক্তির এই অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়ে দেশে এমন কোনো অস্থিরতা তৈরি হোক, যা তাদের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করে।
অন্যদিকে, পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এই মুহূর্তে কোনো ধরনের আপস করতে নারাজ। তাদের একমাত্র এবং প্রধান দাবি হলো তাদের অবিসংবাদিত নেতা ইমরান খানের দ্রুত ও নিঃশর্ত মুক্তি।
টানা ষষ্ঠ দিনের মতো চলা এই দীর্ঘ পদযাত্রা প্রমাণ করে যে, দলের শীর্ষ পর্যায়ে যতই মতবিরোধ বা অন্তর্দ্বন্দ্ব থাকুক না কেন, সাধারণ সমর্থকরা তাদের নেতার প্রতি অবিচল আনুগত্য বজায় রেখেছেন।
খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের প্রতিটি জেলা থেকে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই মিছিলে যোগ দিচ্ছেন। তারা ঘোষণা দিয়েছেন যে, তাদের মূল দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন কোনোভাবেই থামানো হবে না।
তবে কেন্দ্রীয় সরকার যদি সত্যিই ওই প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি করে এবং কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে এই আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে, তবে পরিস্থিতি এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের দিকে মোড় নিতে পারে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলোও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বর্তমান এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো সুস্পষ্ট পথ আপাতত দৃশ্যমান নয়। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপ বা সমঝোতার কোনো পরিবেশ নেই বললেই চলে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার যেমন তাদের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসতে নারাজ, ঠিক তেমনি পিটিআইও রাজপথের আন্দোলনকে তাদের চূড়ান্ত হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে।
খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের মতো একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যদি সত্যিই জরুরি অবস্থা জারি করা হয়, তবে তা কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যকার সাংবিধানিক সম্পর্ককে এক চরম সংকটের মুখে ফেলে দেবে।
এখন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিতব্য সেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের দিকে, যেখান থেকে আসা যেকোনো সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করে দেবে।