শনিবার, অক্টোবর ১০, ২০২৬
২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিজেপির বিক্ষোভের আগে বিমান থেকে শীর্ষ তিন নেতা আটক

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫১ পিএম

সিজেপির বিক্ষোভের আগে বিমান থেকে শীর্ষ তিন নেতা আটক
ছবি: Collected

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে রাজনৈতিক উত্তাপ এবং উত্তেজনা এক নতুন ও নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছেছে। দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে পূর্বঘোষিত একটি বিশাল বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে এক ব্যাপক ধরপাকড় ও কঠোর পুলিশি পদক্ষেপের সাক্ষী হলো দেশবাসী।

 

গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের এই আন্দোলনকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে, তার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর উদাহরণটি দেখা গেছে দিল্লি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখানে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির শীর্ষ তিন নেতাকে তাদের বহনকারী উড়োজাহাজ থেকে সরাসরি আটক করেছে পুলিশ।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো রাজনৈতিক নেতাকে সরাসরি বিমানের ভেতর থেকে আটকের এই ঘটনা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল এবং এটি প্রশাসনের চরম অসহিষ্ণুতারই সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ।

 

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, শনিবার সকালে সিজেপির শীর্ষ তিন নেতা-অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে করে মুম্বাই থেকে নয়াদিল্লির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।

 

তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর এলাকায় পূর্বনির্ধারিত বিক্ষোভ কর্মসূচিতে সশরীরে অংশগ্রহণ করা এবং রাজপথের এই আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করা। স্থানীয় সময় সকাল দশটা বেজে উনিশ মিনিটে তাদের বহনকারী ফ্লাইটটি যখন দিল্লি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে, তখন সেখানে আগে থেকেই সতর্ক অবস্থায় প্রস্তুত ছিল দিল্লি পুলিশের একটি বিশাল দল।

 

উড়োজাহাজটি রানওয়ে স্পর্শ করে নির্দিষ্ট স্থানে থামার পরপরই, যাত্রীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুলিশ সদস্যরা সরাসরি বিমানের ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে অবস্থানরত শীর্ষ এই তিন নেতাকে তাদের নিজ নিজ আসন থেকেই আকস্মিকভাবে আটক করা হয়।

 

সাধারণ যাত্রীদের উপস্থিতিতে বিমানের মতো একটি সংরক্ষিত ও সংবেদনশীল স্থানে এ ধরনের পুলিশি অভিযানের ঘটনায় উপস্থিত সকলের মধ্যেই ব্যাপক আতঙ্ক, ভয় ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। বিমান থেকে আটক করার এই পুরো শ্বাসরুদ্ধকর প্রক্রিয়াটি সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকে তার ব্যক্তিগত ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে সরাসরি সম্প্রচার বা লাইভ করেন।

 

মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, দিল্লি পুলিশের একটি দল বিমানের সরু করিডোর দিয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। এ সময় বিমানের ভেতরে এক ধরনের হট্টগোল ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

 

সিজেপির শীর্ষ নেতারা পুলিশের এই আকস্মিক ও অনভিপ্রেত পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং তাদের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ তর্কে জড়িয়ে পড়েন। ভিডিওতে স্পষ্টভাবে শোনা যায়, নেতারা পুলিশের কাছে বারবার জানতে চাইছেন কেন তাদের বিমান থেকে স্বাভাবিকভাবে নেমে আসার জন্য অন্তত সামান্যতম সময়টুকুও দেওয়া হলো না।

 

বিমানে ওঠা নারী পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ করে অভিজিৎ দীপকে অত্যন্ত দৃঢ় ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন যে, তারা অন্তত তাদের বিমান থেকে বেরিয়ে টার্মিনালে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারতেন। তিনি পুলিশের চোখে চোখ রেখে আরও বলেন যে, পুলিশ চাইলে তাদের অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করতে পারে, কিন্তু তারা কোনোভাবেই এসব স্বৈরতান্ত্রিক পদক্ষেপে ভীত নন।

 

তার এই অকুতোভয় বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং দেশজুড়ে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে প্রতিবাদের উদ্দীপনার জন্ম দিয়েছে। এই ব্যাপক ধরপাকড় ও চরম উত্তেজনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সিজেপির একটি এক দফা দাবির আন্দোলন।

 

দলটি বেশ কিছুদিন ধরেই ভারতের বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কার্যক্রমে স্বচ্ছতার অভাব ও নিরপেক্ষতা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন তুলে আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় তার অবিলম্বে পদত্যাগের দাবিতে শনিবার সকাল দশটায় নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে এক বিশাল গণবিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল সিজেপি।

 

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যেকোনো দলের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার সাংবিধানিক অধিকার থাকলেও, দিল্লি পুলিশ এই কর্মসূচির জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমতি প্রদান করেনি। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির আশঙ্কা প্রকাশ করে অনুমতি প্রদানে অস্বীকৃতি জানানো হলেও, সিজেপি নেতৃত্ব অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিল যে তারা পুলিশের এই অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞা কোনোভাবেই তোয়াক্কা করবে না এবং পূর্বনির্ধারিত সময়েই তাদের বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু হবে।

 

আর ঠিক সেই গণকর্মসূচিতে যোগ দিতে আসার পথেই তাদের প্রথম সারির নেতৃত্বকে এভাবে নাটকীয় ও নজিরবিহীন কায়দায় অবরুদ্ধ করা হলো। বিমান থেকে শীর্ষ নেতাদের আটকের এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর ককরোচ জনতা পার্টির পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত কড়া ও তীব্র নিন্দাসূচক আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে।

 

দলটির পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে সরাসরি ‘স্বৈরাচারী কায়দায় আটক’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে অভিযোগ করা হয়েছে যে, দিল্লি পুলিশের এই পদক্ষেপ কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ও পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক চক্রান্ত।

 

দলটির মতে, আজকের এই শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক বিক্ষোভের মূল নেতৃত্ব যেন কোনোভাবেই বিক্ষোভস্থলে পৌঁছাতে না পারে এবং বিশাল এই আন্দোলনটি যেন শুরুতেই নেতৃত্বহীন হয়ে ব্যর্থ হয়ে পড়ে, ঠিক সেই হীন উদ্দেশ্যেই প্রশাসন এই নগ্ন হস্তক্ষেপ করেছে।

 

সিজেপি তাদের বিবৃতিতে অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে আরও উল্লেখ করেছে যে, এটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের অবাধ চলাফেরার স্বাধীনতার ওপর এক চরম ও নগ্ন লঙ্ঘন। তারা অবিলম্বে অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কার সম্পূর্ণ নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি জানিয়েছে এবং হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে যে এই ধরনের অমানবিক দমন-পীড়ন চালিয়ে তাদের ন্যায়সঙ্গত ও যৌক্তিক আন্দোলনকে কোনোভাবেই স্তব্ধ বা দমন করা যাবে না।

 

দিল্লি পুলিশের এই দমন-পীড়ন কেবল সিজেপির শীর্ষ তিন নেতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা শহরজুড়ে এক ভীতিজনক রূপ ধারণ করেছে। এর আগে শনিবার সকালেই ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ইউটিউবার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রভাবক ধ্রুব রাঠি এবং সিজেপির আইনি শাখার প্রধান রত্না সিংহকেও তাদের নিজ নিজ বাসভবন থেকে আটক করা হয়।

 

ধ্রুব রাঠি তার তথ্যবহুল বিভিন্ন ভিডিওর মাধ্যমে সরকারের নানা নীতির বস্তুনিষ্ঠ ও গঠনমূলক সমালোচনা করে তরুণ সমাজের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন। তাকে এবং রত্না সিংহকে আটকে রাখার মূল উদ্দেশ্যও ছিল তারা যেন কোনোভাবেই এই সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সশরীরে অংশগ্রহণ করে সাধারণ মানুষকে উদ্দীপ্ত বা ঐক্যবদ্ধ করতে না পারেন।

 

এ ছাড়া, বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যমের নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, এই বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গত শুক্রবার গভীর রাত থেকে শুরু করে শনিবার সকাল পর্যন্ত রাজধানী নয়াদিল্লি এবং এর সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকা থেকে এক হাজারের বেশি সাধারণ মানুষ, দলের মাঠপর্যায়ের কর্মী ও সমর্থককে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

 

মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ব্যাপক মাত্রার গণগ্রেপ্তারকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং নাগরিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে আখ্যায়িত করেছে। বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুরো রাজধানী নয়াদিল্লি কার্যত একটি অবরুদ্ধ ও সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন নগরীতে পরিণত হয়েছে।

 

সাধারণ মানুষের স্বাধীন চলাচল এবং যেকোনো ধরনের জমায়েত ঠেকাতে প্রশাসন কঠোরতম নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। জননিরাপত্তার খোঁড়া অজুহাতে দিল্লির অন্তত পঁয়তাল্লিশটি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে লাখ লাখ সাধারণ যাত্রী চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

 

পাশাপাশি, আড়াই শতাধিক যাত্রীবাহী ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে, যা রাজধানীর রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। শুধু রেল বা মেট্রো নয়, শহরের প্রধান সড়কগুলোতে চলাচলকারী সাধারণ গাড়ি এবং গণপরিবহনগুলোতেও পুলিশের ব্যাপক তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

 

মোড়ে মোড়ে কাঁটাতারের ব্যারিকেড বসিয়ে সন্দেহভাজন যাত্রীদের নামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরিচয়পত্র যাচাই করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সর্বোচ্চ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সম্মানজনক সুরাহা না করে উল্টো প্রতিবাদকারীদের ওপর এমন রাষ্ট্রীয় শক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার কোনোভাবেই একটি সুস্থ ও পরিপক্ব গণতান্ত্রিক কাঠামোর লক্ষণ হতে পারে না।

 

সংবিধানে উল্লেখিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারকে যেভাবে নিছক প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে পদদলিত করা হচ্ছে, তা আগামী দিনের সুস্থ রাজনীতির জন্য এক ভয়ংকর অশনিসংকেত।

 

পুলিশি হেফাজতে থাকা নেতাদের সাথে আইনি দলের সদস্যদেরও দেখা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না বলে বিভিন্ন দলীয় সূত্রে গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে, যা মানবাধিকারের আরেকটি সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

 

বিমানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক নেতাদের আটকের মতো নজিরবিহীন ঘটনা কেবল দেশের ভেতরেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক আলোড়ন ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার যদি অবিলম্বে সংলাপ ও আলোচনার গণতান্ত্রিক পথ বেছে না নিয়ে কেবল লাঠিচার্জ ও দমন-পীড়নের ওপর নির্ভর করে, তবে এই বিক্ষোভ আগামী দিনে আরও বৃহৎ ও অপ্রতিরোধ্য আকার ধারণ করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা গভীরভাবে সতর্ক করেছেন।

 

সব মিলিয়ে, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সর্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদত্যাগের দাবিকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনীতিতে যে গভীর ও অস্থিতিশীল সংকট তৈরি হয়েছে, তার আশু কোনো সমাধান আপাতত দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।

 

- এনডিটিভি