শনিবার, অক্টোবর ১০, ২০২৬
২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গণবিক্ষোভে যোগ দেওয়ার পথে মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র আটক

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:২৮ পিএম

গণবিক্ষোভে যোগ দেওয়ার পথে মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র আটক
ছবি : Collected

ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান তীব্র অস্থিরতা এবং বিরোধী দলগুলোর ওপর প্রশাসনের কঠোর দমনপীড়ন নীতির ধারাবাহিকতায় এবার এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হলো মহারাষ্ট্রের রাজধানী মুম্বাই।

 

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আহ্বানে আয়োজিত এক বিশাল গণবিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সরাসরি সমর্থন জানিয়ে সেখানে অংশগ্রহণ করতে যাওয়ার পথে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও অহিংস আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীকে আকস্মিকভাবে আটক করেছে মুম্বাই পুলিশ।

 

এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের ওপর ব্যাপক ধরপাকড় ও পুলিশি নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। অহিংসা এবং সত্যাগ্রহের আদর্শের প্রবর্তক মহাত্মা গান্ধীর নিজ বংশধরকে একটি শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিবাদে যাওয়ার পথে পুলিশি বাধার সম্মুখীন হওয়ার এই দৃশ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ এবং ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

বিস্তারিত সংবাদ সূত্রে জানা যায়, তুষার গান্ধী মূলত ‘হাম ভারত কে লোগ’ বা ‘আমরা ভারতের জনগণ’ নামক একটি সুপরিচিত নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠনের সম্মানিত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই সংগঠনটি দীর্ঘকাল ধরে ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সাংবিধানিক অধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলনে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে।

 

পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক কর্মসূচি অনুযায়ী, ককরোচ জনতা পার্টির গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি ও একাত্মতা প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে শনিবার মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক অগাস্ট ক্রান্তি ময়দানে আয়োজিত এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশে তার আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার কথা ছিল।

 

কিন্তু সেই সভাস্থলে পৌঁছানোর অনেক আগেই পথিমধ্যে মুম্বাই পুলিশের একটি বিশাল দল তার পথরোধ করে এবং তাকে তার অন্যান্য সহযোদ্ধা ও রাজনৈতিক সহযোগীদেরসহ আটক করে। আটকের পরপরই অত্যন্ত গোপনীয়তা ও কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের সকলকে মুম্বাইয়ের ডিএন নগর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

 

এই আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ প্রশাসন এবং তুষার গান্ধীর নিজ বক্তব্যের মধ্যে এক ধরনের সুস্পষ্ট বৈপরীত্য ও বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা গেছে। আটকের পরপরই তুষার গান্ধী সংবাদমাধ্যম এবং তার সমর্থকদের কাছে দৃঢ়ভাবে দাবি করেছেন যে, তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তার গণতান্ত্রিক অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে পদদলিত করা হয়েছে।

 

অন্যদিকে, মুম্বাই পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তুষার গান্ধীর এই গ্রেপ্তারের দাবিকে সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন যে, এটি কোনো আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তার নয়, বরং সম্ভাব্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধ করার জন্য নিছকই একটি সতর্কতামূলক বা প্রতিরোধমূলক আটক ব্যবস্থা মাত্র।

 

তবে প্রশাসন একে যে নামেই অভিহিত করুক না কেন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, বিরোধী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার জন্যই এই ধরনের পুলিশি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

 

মুম্বাইয়ের যে অগাস্ট ক্রান্তি ময়দানে এই বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সেই স্থানের গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৪২ সালে এই ঐতিহাসিক ময়দান থেকেই মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তার বিখ্যাত ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন এবং দেশবাসীকে ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’ বা ‘করব অথবা মরব’ মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন।

 

আজ এত বছর পর সেই একই ময়দানে মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র যখন একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দিতে গিয়ে স্বাধীন দেশের পুলিশের হাতেই আটক হলেন, তখন তা সমগ্র জাতির বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।

 

সমালোচকরা বলছেন, যে ময়দান একদিন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, আজ সেখানেই স্বাধীন নাগরিকদের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, যা ভারতের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তির জন্য এক অশনিসংকেত।

 

এদিকে, এই ধরপাকড় ও দমনপীড়নের চিত্র কেবল মুম্বাইতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরেও সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী নয়াদিল্লিতে আম আদমি পার্টির (আপ) শীর্ষ নেতাদের ওপরও প্রশাসনের চরম কঠোরতা লক্ষ্য করা গেছে।

 

ককরোচ জনতা পার্টির চলমান এই আন্দোলনের আবহে দিল্লির সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং আম আদমি পার্টির অন্যতম শীর্ষ নেতা মণীশ সিসোদিয়াকেও পুলিশ আটক করেছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

 

আম আদমি পার্টির পক্ষ থেকে অত্যন্ত তীব্র ক্ষোভ ও অভিযোগের সঙ্গে জানানো হয়েছে যে, সরকার সম্পূর্ণ স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে দমন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।

 

দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং দলের সর্বভারতীয় আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বাসভবনের বাইরে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করে এক ধরনের অবরুদ্ধ ও ভীতিজনক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে।

 

শুধু তাই নয়, নয়াদিল্লিতে অবস্থিত আম আদমি পার্টির প্রধান সদর দপ্তরটিও পুলিশ সিলগালা করে দিয়েছে, যার ফলে দলটির দৈনন্দিন রাজনৈতিক কার্যক্রম ও গণতান্ত্রিক অধিকার চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

 

রাজনৈতিক উত্তেজনার এই আঁচ মহারাষ্ট্রের অন্যান্য প্রান্তেও জোরালোভাবে অনুভূত হচ্ছে। ককরোচ জনতা পার্টির শীর্ষ নেতাদের গতিবিধি সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পুলিশি তৎপরতা বহুগুণে বৃদ্ধি করা হয়েছে।

 

এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগর এলাকার পরিস্থিতি। সেখানে ককরোচ জনতা পার্টির অন্যতম প্রধান সংগঠক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক অভিজিৎ দীপকের বাসভবনের চারপাশ ঘিরে বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

 

মূলত সিজেপির এই গণবিক্ষোভ কর্মসূচিকে নেতৃত্বহীন করে দেওয়া এবং সাধারণ মানুষকে এই আন্দোলনে যোগদানে নিরুৎসাহিত করার কৌশল হিসেবেই প্রশাসন এই ধরনের আগাম দমনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

 

সবচেয়ে উদ্বেগজনক এবং শাসনতান্ত্রিক সংকটের যে বিষয়টি এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে, তা হলো দেশের আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত স্বাধীন আইনজীবীদের ওপর পুলিশি হস্তক্ষেপ।

 

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ককরোচ জনতা পার্টির এই গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সংহতি জানাতে যাওয়ার পথে বিপুল সংখ্যক সাধারণ আইনজীবীকেও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পুলিশ আটক করেছে।

 

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে বিবেচিত আইনজীবীদের এভাবে নির্বিচারে আটক করার ঘটনা বিচারব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর এক বিরাট আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

এই নজিরবিহীন ও বেআইনি আটকের ঘটনার পর দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের সংগঠন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন অত্যন্ত কড়া ভাষায় এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা এই পুলিশি বাড়াবাড়ি এবং নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি ও জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

 

বার অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা মনে করেন, যদি আইনজীবীদেরই স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ এবং গণতান্ত্রিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার অধিকার না থাকে, তবে সাধারণ মানুষের আইনি সুরক্ষার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়বে।

 

পরিশেষে বলা যায়, ককরোচ জনতা পার্টির এই বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সারা ভারতজুড়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্রের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর প্রশাসনের এই যে সাঁড়াশি অভিযান ও দমনপীড়ন চলছে, তা আধুনিক ভারতের গণতান্ত্রিক চর্চায় একটি গভীর ক্ষত সৃষ্টি করছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই পুরো পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। অহিংস আন্দোলনের পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত ভারতে যখন অহিংস প্রতিবাদকারীদের এভাবে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়, তখন তা কেবল সেই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের জন্যই নয়, বরং সমগ্র দেশের সাংবিধানিক মূল্যবোধের জন্যই এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন হিসেবে আবির্ভূত হয়।