শনিবার, অক্টোবর ১০, ২০২৬
২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দিল্লিতে এবার ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা আটক

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:৪০ পিএম

দিল্লিতে এবার ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা আটক
ছবি : Collected

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে চলমান উত্তপ্ত রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এবার দেশটির প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ ও তরুণ সমাজের প্রতিনিধি নেহা বোরাকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ।

 

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) লিবারেশন-এর ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বা আইসার সর্বভারতীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। শনিবার জাতীয় রাজধানীর আইএনএ এলাকার নিকটবর্তী স্থানে আয়োজিত এক পদযাত্রা চলাকালে পুলিশ তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয়।

 

দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরেই রাজধানীজুড়ে কঠোর নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে প্রশাসন।

 

বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সমাজকর্মী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পর এবার শীর্ষস্থানীয় ছাত্রনেত্রীকে আটকের ঘটনা চলমান এই গণআন্দোলনে এক নতুন মাত্রার উত্তেজনা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন যোগ করেছে।

 

ঘটনার বিস্তারিত পটভূমি থেকে জানা যায়, শনিবার সকালে রাজধানীর ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর প্রাঙ্গণে ককরোচ জনতা পার্টির আহ্বানে একটি বিশাল প্রতিবাদ কর্মসূচি নির্ধারিত ছিল। এই আন্দোলনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল সদ্য সমাপ্ত বিভিন্ন নির্বাচনে কমিশনের কথিত অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করা এবং এর সুস্পষ্ট দায় নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ নিশ্চিত করা।

 

তবে পুলিশ প্রশাসন শুরু থেকেই এই রাজনৈতিক সমাবেশের অনুমতি প্রদানে অস্বীকৃতি জানায় এবং যন্তর মন্তর ও এর আশপাশের এলাকাগুলোকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে ঘিরে ফেলে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে সাধারণ ছাত্র, তরুণ ও বিক্ষোভকারীরা মূল সমাবেশস্থলে প্রবেশ করতে সম্পূর্ণ বাধার সম্মুখীন হন।

 

এই চরম প্রতিকূল ও অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মুখে তরুণদের রাজপথের আন্দোলন সচল রাখতে বিকল্প কৌশল বেছে নেন আইসার সর্বভারতীয় সভানেত্রী নেহা বোরা। প্রশাসনিক বাধা ও পুলিশের অব্যাহত চাপের মুখে তিনি প্রতিবাদস্থলটি কৌশলগতভাবে আইএনএ এলাকার সন্নিকটে অবস্থিত ‘দিল্লি হাট’ প্রাঙ্গণে সরিয়ে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।

 

কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে সে সময় তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন যে, যদি যন্তর মন্তরে তাদের কথা বলতে না দেওয়া হয়, তবে ঐতিহাসিক এই দিল্লি হাটই হয়ে উঠবে তাদের প্রতিবাদের নতুন যন্তর মন্তর। তার এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত বহু তরুণ ও সাধারণ শিক্ষার্থী দিল্লি হাটের প্রবেশমুখে জড়ো হতে শুরু করেন।

 

পরবর্তীতে বিশিষ্ট সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব এবং ছাত্রনেত্রী নেহা বোরার প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে দিল্লি হাট অভিমুখে একটি সুশৃঙ্খল প্রতিবাদী পদযাত্রা শুরু হয়। কিন্তু পদযাত্রাটি মূল সড়ক অতিক্রমের চেষ্টা করতেই দিল্লি পুলিশের একটি বিশাল দল সেখানে ব্যারিকেড দিয়ে পথরোধ করে।

 

কোনো ধরনের পূর্বসতর্কতা বা আনুষ্ঠানিক সমঝোতা ছাড়াই পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে উদ্যত হয় এবং নির্বিচারে ধরপাকড় অভিযান শুরু করে। পুলিশের এই সাঁড়াশি অভিযানের সময় ঘটনাস্থল থেকে পদযাত্রার সামনের সারিতে থাকা নেহা বোরাকে আটক করে পুলিশ ভ্যানে তুলে নেওয়া হয়।

 

একই সঙ্গে তার সঙ্গে থাকা আরও বেশ কয়েকজন তরুণ কর্মীকেও নিজেদের হেফাজতে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, শান্তিপূর্ণভাবে স্লোগান দিয়ে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলেও পুলিশ কোনো সুযোগ না দিয়ে তাদের জোরপূর্বক আটক করে অজানা গন্তব্যে নিয়ে যায়।

 

রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরে পুলিশের এই দমনমূলক তৎপরতা কেবল শনিবারের এই পদযাত্রাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মূলত কর্মসূচি শুরুর বহু পূর্ব থেকেই প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর ও আগ্রাসী কৌশল অবলম্বন করে আন্দোলনকারীদের শীর্ষ নেতৃত্বকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পরিকল্পনা নেয়।

 

শনিবারের নির্ধারিত বিক্ষোভের অনেক আগেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দিল্লিতে সমবেত হওয়া জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একের পর এক আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের দীর্ঘ তালিকায় রয়েছেন ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ভিডিও বিশ্লেষক ও ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র ও সমাজকর্মী তুষার গান্ধী এবং ককরোচ জনতা পার্টির কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক।

 

এ ছাড়া সংগঠনের দুই শীর্ষ সংগঠক আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকেও আন্দোলনস্থলে পৌঁছানোর আগেই আটক করে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। নেতৃত্বস্থানীয় এই ব্যক্তিদের এভাবে লাগাতার আটক করার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছে ককরোচ জনতা পার্টিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।

 

তাদের পক্ষ থেকে দেওয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংবিধানপ্রদত্ত শান্তিপূর্ণ সমাবেশের মৌলিক অধিকারকে রাষ্ট্রযন্ত্রের সাহায্যে পুরোপুরি পদদলিত করা হচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মতো একটি সাংবিধানিক পদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তোলা কোনো বেআইনি কাজ নয়, অথচ সরকার পুরো দিল্লি শহরকে এক ধরনের পুলিশি দুর্গে পরিণত করে বিরোধী স্বরকে সম্পূর্ণরূপে নিস্তব্ধ করতে চাইছে।

 

বিশেষ করে তরুণদের মুখপাত্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়া নেহা বোরাকে আটকের ঘটনা প্রমাণ করে যে সরকার শিক্ষার্থীদের ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদকেও চরম ভয় পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, নির্বাচন কমিশনের মতো দেশের সর্বোচ্চ ও স্বাধীন একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষা করার বদলে আন্দোলনকারীদের ওপর এমন বলপ্রয়োগ পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলছে।

 

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। ছাত্র সমাজের ক্ষোভকে প্রশাসনিক চাপ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে আটকে রাখা যায় না বলেই সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

 

ছাত্রনেত্রী নেহা বোরাসহ অন্যান্য আন্দোলনকারীদের আটকের ফলে এই বিক্ষোভ থেমে যাওয়ার পরিবর্তে রাজধানী দিল্লির বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে এবং সামাজিক মাধ্যমে আরও তীব্র প্রতিবাদের রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগের দাবিকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনীতিতে যে অস্বস্তিকর অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তা ক্রমেই আরও গভীর সংঘাতের দিকে মোড় নিচ্ছে।

 

- ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস