মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক ও কৌশলগত উত্তেজনার মধ্যেই তেহরানের পক্ষ থেকে এই ধরনের কঠোর মনোভাব প্রকাশ করা হলো। রেজায়ি তার বক্তব্যে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের পরাজয়ের ঐতিহাসিক স্মৃতিকে সামনে নিয়ে এসে আধুনিক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির কড়া সমালোচনা করেছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বক্তব্য কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং আধুনিক সমরাস্ত্র ও কূটনীতির লড়াইয়ে নিজেদের হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাসকে একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ হিসেবে তুলে ধরার সুপরিকল্পিত কৌশল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা ও সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবি-র বরাতে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি মার্কিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রতি একটি বিশেষ বার্তা প্রদান করেছেন।
সেই বার্তায় তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও সামরিক পদক্ষেপে ইরানের কাছে ধারাবাহিক কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরাজয় এবং অপমানের সম্মুখীন হয়েছে ওয়াশিংটন।
আর সেই ব্যর্থতা ও অপমান ঢাকার জন্য তারা এখন গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে গিয়ে তথাকথিত সভ্যতার সংঘাত নিয়ে নতুন ধরনের মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান বা বয়ান তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্ব যখন নিজেদের গ্রিক সভ্যতার সরাসরি উত্তরাধিকারী হিসেবে দাবি করে অন্য জাতিগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তারের নীতিকে বৈধতা দিতে চাইছে, ঠিক তখনই মোহসেন রেজায়ি তাদের সেই দাবিকে ইতিহাসের আলোকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।
রেজায়ি মার্কিন নেতৃত্বকে প্রাচীন ইতিহাসের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, গৌরবোজ্জ্বল ও ভাগ্যনির্ধারণী অধ্যায় গভীরভাবে অধ্যয়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের একটি ঐতিহাসিক ঘটনার কথা বিশেষভাবে স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে সাসানীয় পারস্যের প্রতাপশালী সম্রাট প্রথম শাপুরের কাছে রণক্ষেত্রে চরমভাবে শোচনীয় পরাজয় বরণ করেছিলেন পরাক্রমশালী রোমান সম্রাট।
বিশ্ব ইতিহাসে একমাত্র রোমান সম্রাট হিসেবে যুদ্ধবন্দি হয়ে পারস্যের সম্রাটের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে নতজানু হতে বাধ্য হয়েছিলেন সেই শাসক। মোহসেন রেজায়ির মতে, পশ্চিমা শক্তিগুলো যখন নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে ইতিহাসকে একপেশেভাবে তাদের নিজস্ব আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হিসেবে টেনে আনছে, তখন তাদের এই পরাজয়ের নির্মম বাস্তবতাও স্বীকার করে নিতে হবে।
তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যারা বর্তমানের সংঘাতকে বৈধতা দিতে গিয়ে ইতিহাসের অবতারণা করে, তাদের অবশ্যই সেই ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তির জন্যও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, তেহরানের এই সাম্প্রতিক বক্তব্য মূলত পশ্চিমা বিশ্বের আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে একটি জোরালো আদর্শিক জবাব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব বজায় রাখতে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান ব্যবহার করে আসছে।
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে প্রায়শই সভ্যতার সংঘাত হিসেবে অভিহিত করা হয়, যার মাধ্যমে পশ্চিমা মূল্যবোধকে বিশ্বের অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতার চেয়ে উন্নত এবং অগ্রগামী হিসেবে দেখানোর একটি নিরন্তর প্রচেষ্টা চালানো হয়।
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে যখনই এই ধরনের আধিপত্যকামী বক্তব্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে উচ্চারিত হয়, তখন তা পারস্যের মতো হাজার বছরের প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সভ্যতার ধারক দেশগুলোর জন্য আত্মমর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়। মোহসেন রেজায়ির এই সাম্প্রতিক বার্তা সেই আধিপত্যকামী বয়ানের মূলে সরাসরি আঘাত হেনেছে।
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রেজায়ির এই হুঁশিয়ারি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী বার্তা বহন করে। গত কয়েক দশক ধরে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি, একের পর এক কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং তেহরানকে বিশ্ব রাজনীতি থেকে একঘরে করে ফেলার বহুবিধ চেষ্টা সত্ত্বেও ইরান তাদের কৌশলগত অবস্থানে অনড় রয়েছে।
উল্টো আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজেদের প্রতিরোধ অক্ষকে আরও বেশি সংহত ও শক্তিশালী করে তুলতে সক্ষম হয়েছে দেশটি। সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের নানামুখী হিসাব-নিকাশ বারবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
তেহরানের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের বিশ্বাস, সমরাস্ত্রের আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক চাপের জোরে কোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতিকে পদানত করা সম্ভব নয়, যদি সেই জাতির থাকে হাজার বছরের প্রতিরোধ সংগ্রামের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য।
মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি ইরানের প্রতিরক্ষা ও সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি। তার মুখ থেকে যখন রোমান সম্রাটের বন্দি হওয়া এবং হাঁটু গেড়ে বসার প্রসঙ্গটি উচ্চারিত হয়, তখন তা নিছক কোনো রূপক হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ভবিষ্যৎ সংঘাতের এক কঠিন সতর্কবার্তা হয়ে ওঠে।
এটি বিশ্ব সম্প্রদায়কে জানিয়ে দেয় যে, বাইরের কোনো আগ্রাসী শক্তি যদি ইরানের সার্বভৌমত্ব, সীমানা কিংবা জাতীয় মর্যাদায় আঘাত হানার দুঃসাহস দেখায়, তবে অতীতে পারস্যের বুকে আক্রমণ চালাতে এসে রোমান বাহিনীর যে মর্মান্তিক পরিণতি হয়েছিল, আধুনিক মার্কিন বাহিনীর জন্যও ঠিক তেমনই এক হতাশাজনক পরাজয় অপেক্ষা করছে।
ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি যে সরলরেখায় চলে না এবং অহংকারী পরাশক্তিগুলোও যে একসময় নিজেদের ভুলে ধুলোয় মিশে যায়, রেজায়ি সেই সত্যটিই পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। পশ্চিমা শক্তির সামরিক সক্ষমতার বিপরীতে ইরানের এই মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ বিশ্বের বহু মুক্তিকামী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
ওয়াশিংটন যখনই নিষেধাজ্ঞার জাল বিস্তার করে কিংবা সামরিক আগ্রাসনের হুমকি দিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চায়, ইরান তখন তাদের মনে করিয়ে দেয় যে তারা কোনো ক্ষণস্থায়ী রাষ্ট্র নয়, বরং একটি সুপ্রাচীন সাম্রাজ্যের ধারাবাহিক রূপ।
মোহসেন রেজায়ির এই কড়া বার্তা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ার পর পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্মানজনক সমাধান খুঁজে না নেয় এবং কেবল শক্তির অহংকারে অন্ধ হয়ে পথ চলতে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের একাকীত্ব ও রাজনৈতিক পরাজয় আরও ত্বরান্বিত হবে।
পরিশেষে বলা যায়, ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিবের এই সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তির জন্য এক স্পষ্ট রাজনৈতিক সংকেত। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে পরাশক্তিগুলোকে তাদের চিরাচরিত আধিপত্যকামী মনোভাব ত্যাগ করতে হবে এবং অন্য দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও ঐতিহাসিক মর্যাদাকে নিঃশর্তভাবে সম্মান জানাতে হবে।
রেজায়ির এই সাহসী ও ঐতিহাসিক বক্তব্য কেবল তেহরানের অভ্যন্তরীণ আত্মবিশ্বাসকেই সুদৃঢ় করে না, বরং বিশ্বমঞ্চে যেকোনো আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সত্য ও আত্মমর্যাদার পক্ষে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার এক বলিষ্ঠ ঘোষণাপত্র হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ময়দানে এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে এই বক্তব্যের রেশ কতটুকু প্রভাব ফেলে, তা বিশ্ববাসী অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গেই পর্যবেক্ষণ করবে।