শনিবার, অক্টোবর ১০, ২০২৬
২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মোদি সরকারের পতন অনিবার্য, রাহুল গান্ধী

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:২৮ পিএম

মোদি সরকারের পতন অনিবার্য, রাহুল গান্ধী
ছবি : Collected

ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে বর্তমানে এক অভূতপূর্ব, জটিল ও চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদি সরকারের অনিবার্য পতনের বিষয়ে অত্যন্ত জোরালো, বিস্ফোরক ও চাঞ্চল্যকর দাবি উত্থাপন করেছেন দেশটির প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী।

 

তাঁর মতে, এই দুই প্রভাবশালী ও কেন্দ্রীয় শক্তির চূড়ান্ত বিদায়ের মধ্য দিয়েই ভারতের মতো বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র মেরামতের কাজ পুনরায় শুরু হবে। শনিবার, দশই অক্টোবর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-এর সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভিডিও বার্তা শেয়ার করে রাহুল গান্ধী এই সুদৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উচ্চারণ করেন যে, দেশের বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং ক্ষমতাসীন সরকার উভয়কেই অবিলম্বে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হবে, আর কেবল তখনই দেশে বিগত কয়েক বছর ধরে হারিয়ে যাওয়া গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও হৃত গণতন্ত্র আবারও তার স্বমহিমায় ফিরে আসবে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভারতের এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং বিরোধী জোটের এই কঠোর ও আপসহীন অবস্থানকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

 

এর ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ভারতের ঐতিহাসিক সংবিধান সদনের (পুরোনো সংসদ ভবন) সেন্ট্রাল হলে আয়োজিত এক বিশেষ ও জনাকীর্ণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে রাহুল গান্ধী দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও শাসনতান্ত্রিক সংকটের গভীরতা নিয়ে অত্যন্ত বিশদভাবে আলোচনা করেন।

 

তিনি সেখানে উপস্থিত বিরোধী দলীয় অসংখ্য সংসদ সদস্য ও শীর্ষ নেতাদের উদ্দেশে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, বর্তমানে নির্বাচন কমিশনকে কেন্দ্র করে যে অভূতপূর্ব বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা সাময়িক কোনো বিষয় নয়; বরং এই সংকটটি আরও অনেক বেশি গভীর, ব্যাপক এবং ভারতের কাঠামোগত ভিত্তির জন্য অত্যন্ত হুমকিস্বরূপ।

 

তাঁর মতে, এই সুবিশাল, নজিরবিহীন ও শাসনতান্ত্রিক সংকটের চূড়ান্ত ও একমাত্র সমাধান লুকিয়ে আছে বর্তমান ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদি সরকারের সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত পতনের মধ্যে। বিরোধী দলগুলো যদি নিজেদের মধ্যেকার সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ থেকে গত কয়েক দিনের মতো লাগাতার, সুশৃঙ্খল ও আপসহীন চাপ প্রয়োগের ধারা অব্যাহত রাখতে পারে, তবে এই সরকারের বিদায় সম্পূর্ণ নিশ্চিত বলে তিনি প্রবল আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করেন।

 

ভারতের লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘদিনের সংগ্রামের আলোকে রাহুল গান্ধী আরও গভীরভাবে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে ও সংসদে চলমান এই প্রতিবাদ ও গণআন্দোলন কোনো সাধারণ রাজনৈতিক কর্মসূচি বা নিছক ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়; এটি মূলত এমন একটি অস্তিত্ব রক্ষার মৌলিক লড়াই, যার জন্য প্রয়োজনে নিজেদের জীবন পর্যন্ত হাসিমুখে উৎসর্গ করা যায়।

 

তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে বিরোধী জোটের সমস্ত স্তরের নেতাদের গভীরভাবে আশ্বস্ত করে বলেন যে, গত তিন-চার দিন ধরে রাজধানী দিল্লির রাজপথে এবং সংসদের ভেতরে-বাইরে বিরোধী শিবির যেভাবে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে, তা যদি আগামী দিনগুলোতেও ঠিক একইভাবে এবং একই তীব্রতায় বজায় রাখা সম্ভব হয়, তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা প্রদান করছেন যে এই সুদৃঢ় ক্ষমতাসীন সরকার অচিরেই তাসের ঘরের মতো মুখ থুবড়ে পড়বে।

 

তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করেন, ভারতের বিরোধী দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ, স্বতঃস্ফূর্ত ও সুপরিকল্পিত এই গণপ্রতিবাদ এরই মধ্যে সরকারের অস্তিত্বের ভিত্তিমূলকে প্রবলভাবে কাঁপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে এবং সরকার ও প্রশাসন বর্তমানে বিরোধী শিবিরের এই অভাবনীয় ও গগনচুম্বী উত্থান দেখে চরমভাবে ভীতসন্ত্রস্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়েছে।

 

ভারতের এই চরম ও উদ্বেগজনক রাজনৈতিক উত্তেজনার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশটির নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সর্বোচ্চ সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে চলমান এক নজিরবিহীন ও গভীর অন্তর্দ্বন্দ্বের খবর।

 

ভারতের স্বনামধন্য, অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি সাম্প্রতিক গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই দেশের নির্বাচন কমিশন বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি সুশীল সমাজের তীব্র, তীক্ষ্ণ ও অবিরাম আক্রমণের মুখে পড়েছে।

 

প্রকাশিত ওই আলোড়ন সৃষ্টিকারী প্রতিবেদনে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট নথিপত্র ও তথ্যের ভিত্তিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভোটার তালিকার সংবেদনশীল বিশেষ গোয়েন্দা পর্যালোচনা বা এসআইআর কার্যক্রমসংক্রান্ত বিভিন্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও আদেশের বিরুদ্ধে গত দশ মাসের মধ্যে অন্তত চৌদ্দ বার লিখিত ও আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছেন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অপর দুই সম্মানিত কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশি।

 

একটি স্বাধীন, ঐতিহ্যবাহী ও নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে এবং নীতিনির্ধারণী ফোরামে এ ধরনের ধারাবাহিক, প্রকাশ্য ও নজিরবিহীন মতবিরোধের খবর জনসমক্ষে আসার পর দেশের সামগ্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক সন্দেহ, ক্ষোভ ও সংশয় গভীরভাবে দানা বেঁধেছে।

 

অবশ্য দুই জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনারের এই ধারাবাহিক আপত্তির খবরের বিষয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনার মুখে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে।

 

কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক দাবি অনুযায়ী, যেকোনো গণতান্ত্রিক, স্বাধীন ও বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠানে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সদস্যদের মধ্যে ভিন্নমত পোষণ করা এবং নিজস্ব পর্যবেক্ষণ স্বাধীনভাবে তুলে ধরা অত্যন্ত স্বাভাবিক, আইনি ও স্বাস্থ্যকর আলোচনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ মাত্র।

 

তারা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করার উদ্দেশ্যে আরও দাবি করেছে যে, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক বিগত দিনে জারি করা সব আদেশের পূর্ণ আইনি, কাঠামোগত ও সাংবিধানিক বৈধতা সুরক্ষিত রয়েছে এবং তা দেশের প্রতিষ্ঠিত সংবিধিবদ্ধ আইনি প্রক্রিয়া ও কঠোর নিয়মকানুন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করেই সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করা হয়েছে।

 

তবে নির্বাচন কমিশনের এই প্রথাগত, গৎবাঁধা ও প্রশাসনিক আত্মপক্ষ সমর্থন দেশের বিরোধী দলগুলোর পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বিন্দুমাত্র প্রশমিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, বরং তা চলমান এই ভয়ংকর রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন করে ঘি ঢেলে দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।

 

অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ কর্তার পদত্যাগের যৌক্তিক দাবি এবং সামগ্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কথিত ব্যাপক কারচুপির প্রতিবাদে বিরোধী দলগুলোর ডাকা অহিংস গণবিক্ষোভ ঠেকাতে রাজধানী নয়াদিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকার যে নজিরবিহীন, শ্বাসরুদ্ধকর ও কঠোর সামরিক নিরাপত্তার বলয় তৈরি করেছে, তার অত্যন্ত তীব্র, কড়া ও দ্ব্যর্থহীন সমালোচনা করেছেন কংগ্রেসের আরেক জ্যেষ্ঠ, বর্ষীয়ান ও প্রভাবশালী নেতা কে সি ভেনুগোপাল।

 

শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক অত্যন্ত দীর্ঘ, তথ্যবহুল ও ক্ষুব্ধ পোস্টে তিনি সরাসরি সরকারের সর্বোচ্চ মহলের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে বলেন যে, নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের সাধারণ, নিরীহ ও অধিকারবঞ্চিত জনগণের বিরুদ্ধেই এক অঘোষিত ও নগ্ন যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

 

একটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকারকে যেভাবে সরাসরি রাষ্ট্রযন্ত্র ও পুলিশি ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্দয়ভাবে দমন করা হচ্ছে, তা স্বাধীন ভারতের সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক ভয়ংকর কালো অধ্যায় হিসেবে চিরকাল চিহ্নিত হয়ে থাকবে বলে তিনি গভীর আক্ষেপের সঙ্গে মন্তব্য করেন।

 

ভেনুগোপাল তাঁর আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে রাজধানী নয়াদিল্লির বর্তমান অবরুদ্ধ, ভীতিজনক ও দমবন্ধ করা পরিস্থিতির এক অত্যন্ত বিশদ ও ভয়াবহ চিত্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ ও বেদনার সঙ্গে জানান যে, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ ও জমায়েত দমনের খোঁড়া অজুহাতে শহরের সমস্ত লোকাল ও দূরপাল্লার ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং রাজধানীর অন্তত সাতান্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত মেট্রো রেল স্টেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য যাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

 

এর পাশাপাশি শহরজুড়ে প্রতিটি মোড়ে মোড়ে চলছে পুলিশের ব্যাপক তল্লাশি, হয়রানি ও নির্বিচার গণগ্রেপ্তার অভিযান। পুরো রাজধানী দিল্লি শহরকে কার্যত একটি অবরুদ্ধ, জনবিচ্ছিন্ন ও ভীতিকর সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করা হয়েছে, যেখানে রাস্তায় রাস্তায় বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় আধা-সামরিক বাহিনী বা সিআরপিএফ সদস্যকে পূর্ণ যুদ্ধসাজে ও ভারী অস্ত্রে সজ্জিত করে মোতায়েন করা হয়েছে।

 

কংগ্রেসের এই শীর্ষ নেতা তাঁর বক্তব্যের উপসংহারে অত্যন্ত জোরালো অভিযোগ করেন যে, একজন চরম স্বৈরাচারী ও জনবিচ্ছিন্ন শাসকের একগুঁয়ে মনোভাবের কারণে দেশের সাধারণ মানুষের একটি সম্পূর্ণ অহিংস গণআন্দোলন এবং মহাত্মা গান্ধীর মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত পবিত্র সত্যাগ্রহকে অত্যন্ত নির্মম, নিষ্ঠুর ও অগণতান্ত্রিক কায়দায় চিরতরে গুঁড়িয়ে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

 

সব মিলিয়ে ভারতের বর্তমান এই ঘোলাটে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক চরম অনিশ্চয়তা, গভীর প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাস এবং আসন্ন এক বৃহত্তর সংঘাতের দিকেই ক্রমশ দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা গভীরভাবে মনে করছেন।