গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ এবং সাংবিধানিক কাঠামো পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করার গুরুতর অভিযোগ তুলে তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেছেন, ভারত এখন আর কোনোভাবেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নেই, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ও চরম স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
দিল্লিতে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কথিত ভোট চুরি এবং ব্যাপক অনিয়মের প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা শান্তিপূর্ণ গণবিক্ষোভে পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজিরবিহীন দমনপীড়নের পর শনিবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তিনি এই অত্যন্ত কঠোর ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন।
প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর এই বক্তব্য ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই রাজনৈতিক সংঘাত ও বিরোধী কণ্ঠস্বররোধের খবর প্রচার করছে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচিত সংসদ সদস্য, সাধারণ নেতাকর্মী এবং অধিকার সচেতন সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করে রাজধানী নয়াদিল্লি জুড়ে যে ব্যাপক মাত্রায় প্রশাসনিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, কংগ্রেস নেত্রী তার বিবৃতিতে সেই বিষয়গুলোর তীব্র ও তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেছেন।
তার মূল অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে রাষ্ট্রের একচ্ছত্র প্রশাসনিক শক্তি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে স্তব্ধ করে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত সরকারি অপচেষ্টা।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেছেন যে, শুধুমাত্র একটি যৌক্তিক, অহিংস ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কারণে দেশের ২৫৪ জন নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে চরমভাবে হেনস্তা করা হয়েছে এবং তাদের অনেককে জোরপূর্বক পুলিশি হেফাজতে আটক করা হয়েছে।
একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর এ ধরনের পুলিশি হস্তক্ষেপ ও নির্লজ্জ বলপ্রয়োগকে তিনি রাষ্ট্রের চরম অসহিষ্ণুতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এর পাশাপাশি, সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে দিল্লির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যান চলাচল এবং সাধারণের চলাচলে যেভাবে অগণতান্ত্রিক বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে, তা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট ও সরাসরি লঙ্ঘন বলে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
এই নজিরবিহীন ধরপাকড় ও দমনপীড়নের নির্মম চিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী আরও বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ দমনের নামে রাজধানী জুড়ে গণপরিবহন ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে অচল করে দেওয়া হয়েছে, যাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক ও রাজনৈতিক কর্মীরা কোনোভাবেই এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে এসে অংশ নিতে না পারে।
এর পাশাপাশি, আধুনিক যুগে মতপ্রকাশ ও অবাধ তথ্য আদান-প্রদানের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে গোটা শহরকে কার্যত একটি অবরুদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন নগরীতে পরিণত করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, ভারতের পবিত্র সংবিধান দেশের প্রতিটি নাগরিককে যে অহিংস প্রতিবাদ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের মৌলিক অধিকার প্রদান করেছে, সেই আইনি অধিকার প্রয়োগ করে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অসংখ্য তরুণ ও সাধারণ শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে আটক করা হয়েছে।
তরুণ প্রজন্মের এই স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে পেশিশক্তির মাধ্যমে দমন করার এই হীন অপচেষ্টা দেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
ভারতের স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং ক্ষমতাসীন সরকারের মধ্যে গোপন রাজনৈতিক আঁতাত বা যোগসাজশের যে অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ধারাবাহিকভাবে করে আসছে, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী তার সাম্প্রতিক বিবৃতিতে সেই অভিযোগটি আরও জোরালো ও সুনির্দিষ্টভাবে উত্থাপন করেছেন।
ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভের মূল কারণই ছিল সদ্য সমাপ্ত বিভিন্ন নির্বাচনগুলোতে ব্যাপক কারচুপি, প্রশাসনযন্ত্রের অপব্যবহার ও পরিকল্পিত ভোট চুরির অভিযোগ। এই প্রেক্ষাপটে কংগ্রেস নেত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, নির্বাচনি অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে সাধারণ মানুষ ও বিরোধী দলগুলোর কাছে জবাবদিহির মুখোমুখি হওয়ার গভীর আশঙ্কা থেকেই ক্ষমতাসীন সরকার আজ চরমভাবে ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে।
তাদের এই অভ্যন্তরীণ ভীতি থেকেই তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি অঙ্গকে নগ্নভাবে ব্যবহার করে বিরোধী কণ্ঠস্বরকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে চাইছে। একটি স্বাধীন, সাংবিধানিক ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের যে নির্মোহ ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করার কথা ছিল, সেই জায়গা থেকে সম্পূর্ণ সরে এসে তারা আজ ক্ষমতাসীন সরকারের একটি আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
বিরোধী দলগুলোর এই দীর্ঘদিনের অভিযোগকে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর এই সাহসী বক্তব্য আরও একবার জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করল। শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই নয়, বরং যারা পর্দার আড়ালে থেকে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে আসীন হয়ে দেশের এই ঐতিহ্যবাহী ও সুপ্রাচীন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকে দুর্বল করার কাজে সহায়তা করছেন, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী তাদেরও অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন।
তিনি মনে করেন, একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো তার স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানসমূহ-যেমন স্বাধীন বিচারবিভাগ, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
যখন এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব স্বাধীনতা হারিয়ে শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক আত্মা সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হয়ে যায়। যারা নগণ্য ব্যক্তিস্বার্থ কিংবা সাময়িক রাজনৈতিক চাপের কাছে মাথা নত করে এই ধরনের চরম অগণতান্ত্রিক ও বেআইনি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছেন এবং সংবিধানের মর্যাদা পদে পদে ক্ষুণ্ন করছেন, কংগ্রেস নেত্রী তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার মতো অত্যন্ত গুরুতর ও রাষ্ট্রদ্রোহী অভিযোগ তুলেছেন।
তার মতে, ক্ষমতার সাময়িক মোহে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা হলেও, ভারতের ইতিহাস ও আপামর জনগণ কখনোই এই সংবিধান ধ্বংসকারী বিশ্বাসঘাতকদের ক্ষমা করবে না। বিশ্বের বৃহত্তম ও বৈচিত্র্যময় গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারতের যে সুপ্রাচীন বৈশ্বিক পরিচিতি ও সম্মান রয়েছে, সাম্প্রতিক এই ধরপাকড় ও দমনপীড়নের ঘটনাপ্রবাহ সেই ভাবমূর্তিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে বলে অনেক স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন।
দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়াসহ বিভিন্ন স্বনামধন্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, যখন একটি দেশের প্রধান বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় নেত্রী প্রকাশ্যে তার নিজ দেশকে একটি স্বৈরাচারী রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং বিপুল সংখ্যক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে আটকের মতো গুরুতর অভিযোগ তোলেন, তখন তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি অত্যন্ত নেতিবাচক ও হতাশাজনক বার্তা প্রেরণ করে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং অসংখ্য আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন ভারতের যে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান, তা আজ এক নজিরবিহীন ও গভীর সংকটের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।
ককরোচ জনতা পার্টির এই অহিংস বিক্ষোভ এবং তাকে কেন্দ্র করে সরকারের এই আক্রমণাত্মক দমনপীড়ন নীতি প্রমাণ করে যে, দেশের সাধারণ মানুষ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে চরম আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।
সরকার যদি অবিলম্বে এই গভীর আস্থাহীনতা দূর করার জন্য গঠনমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ না করে কেবল লাঠিচার্জ ও পুলিশি শক্তির ওপর নির্ভর করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, তবে আগামী দিনে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও বেশি অস্থিতিশীল, সংঘাতময় ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা গভীরভাবে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।