রবিবার আদালতের হস্তক্ষেপে তিনি মুক্তি লাভ করেন। তবে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাছে যে বিবৃতি দিয়েছেন, তা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ধ্রুব রাঠী স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেছেন যে, তার সাথে যা ঘটেছে তা কোনোভাবেই আইনি প্রক্রিয়ায় আটক বা গ্রেপ্তার নয়, বরং এটি ছিল সম্পূর্ণভাবে একটি সুপরিকল্পিত অপহরণের ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক দীর্ঘ ও বিস্তারিত পোস্টে ধ্রুব রাঠী তার সাথে ঘটে যাওয়া এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভীতিকর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
তিনি জানান, শনিবার সকাল আনুমানিক সাতটার দিকে তার বাড়িতে একদল লোক প্রবেশ করে। এই দলটিতে প্রায় বিশজনের মতো সদস্য ছিল এবং সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, তাদের কারও পরনেই পুলিশের কোনো নির্ধারিত পোশাক বা ইউনিফর্ম ছিল না।
তারা সকলেই সম্পূর্ণ সাদা পোশাকে ছিলেন। ধ্রুব জানান, তিনি তখন ঘুমাচ্ছিলেন এবং যখন এই বিশাল সংখ্যক মানুষ সরাসরি তার ব্যক্তিগত শয়নকক্ষে বা বেডরুমে প্রবেশ করে, তখন তার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি অত্যন্ত বিস্ময় ও আতঙ্কের সাথে বোঝার চেষ্টা করছিলেন যে তার চোখের সামনে ঠিক কী ঘটছে।
এই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ধ্রুব রাঠী নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি তার পোস্টে লিখেছেন, "আমার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, একসাথে এতগুলো মানুষ কীভাবে একজন সাধারণ নাগরিকের বেডরুমে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করতে পারে?
আমি পরিস্থিতি বুঝে কোনো ধরনের আইনি বা মানসিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই, এই মানুষগুলো আমাকে আক্ষরিক অর্থে অপহরণ করে নিয়ে যায়।" তার এই বক্তব্য থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই অতর্কিত অভিযান তাকে মানসিকভাবে কতটা বিপর্যস্ত করেছে এবং সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর এমন অনুপ্রবেশ কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
ধ্রুব রাঠী তার বক্তব্যে অত্যন্ত জোরালোভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় 'গ্রেপ্তার' এবং বেআইনিভাবে 'অপহরণ'-এর মধ্যকার পার্থক্য তুলে ধরেছেন। তিনি পুলিশের এই পদক্ষেপকে কোনোভাবেই 'আটক' হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। তার মতে, একটি গণতান্ত্রিক দেশে কোনো নাগরিককে আটক বা গ্রেপ্তার করার সুনির্দিষ্ট কিছু আইনি নিয়মকানুন ও শিষ্টাচার রয়েছে, যার কোনোটিই তার ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি।
তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, "আটক বিষয়টি তখন প্রযোজ্য হতো, যদি আমি কোনো বিক্ষোভস্থলে উপস্থিত থাকতাম এবং সেখানে প্রতিবাদ করার সময় পুলিশ আমাকে আটক করত। সেটি হতো সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রেক্ষাপট।
আর গ্রেপ্তার হলো এমন একটি সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া, যেখানে পুলিশ কর্মকর্তারা তাদের নির্ধারিত রাষ্ট্রীয় পোশাকে আসবেন, তাদের পরিচয়পত্রে নাম ও পদবি স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করবেন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা আমাকে একটি বৈধ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখিয়ে বলবেন যে, নির্দিষ্ট এই ধারায় বা অভিযোগে আমাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
এরপর তারা আমাকে সম্মানজনকভাবে পুলিশ স্টেশনে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করবেন। যদি এমন আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হতো, তবে দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি অত্যন্ত খুশি মনেই তাদের সাথে যেতাম এবং আইনি প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতাম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এর বিন্দুমাত্রও আমার সাথে ঘটেনি।"
এই পুরো ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশনের একটি সাম্প্রতিক বিতর্ক এবং এর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিবাদী আন্দোলন। জানা যায়, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল।
এই বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল 'ককরোচ জনতা পার্টি' নামের একটি রাজনৈতিক দল। তাদের পরিকল্পনা ছিল রাজধানী দিল্লির প্রাণকেন্দ্র যন্তরমন্তরে এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা। মূলত এই গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কর্মসূচিতে সশরীরে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যেই ধ্রুব রাঠী সুদূর জার্মানি থেকে ভারতে এসেছিলেন।
তার মতো একজন প্রভাবশালী ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর এই বিক্ষোভে যোগ দিলে তা যে ব্যাপক জনসমর্থন পাবে, তা অনুমেয় ছিল। কিন্তু তিনি যেন কোনোভাবেই দিল্লির এই বিক্ষোভস্থলে পৌঁছাতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই তাকে তার গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই পথিমধ্যে বা নিজ বাড়ি থেকে অতর্কিতভাবে তুলে নেওয়া হয়।
এই ঘটনায় কেবল ধ্রুব রাঠীই একা ভুক্তভোগী হননি। তার পাশাপাশি এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতাকেও আটক করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রধান নেতা অভিজিৎ দ্বীপ, এবং দলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাস।
তাদের সকলকেই একইভাবে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধার সম্মুখীন হতে হয় এবং আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে আইনের শাসন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় আস্থা রেখে তাদের আইনজীবীরা দ্রুত আদালতের শরণাপন্ন হন।
অবশেষে আজ রবিবার, মহামান্য আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনায় ধ্রুব রাঠীসহ আটককৃত অন্য সকল রাজনৈতিক নেতাকে নিঃশর্ত মুক্তি প্রদান করা হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এনডিটিভির বরাত দিয়ে জানা গেছে, আদালতের এই রায় দেশের সাধারণ মানুষ এবং বাকস্বাধীনতার পক্ষের কর্মীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনলেও, পুলিশের এই আচরণ নিয়ে নাগরিক সমাজে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাদা পোশাকে পরোয়ানা ছাড়া এভাবে কোনো নাগরিককে তুলে নিয়ে যাওয়া গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিপন্থী। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল যে, ভিন্নমত পোষণকারীদের কণ্ঠ রোধ করতে অনেক সময় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অপব্যবহার করা হয়।
তবে ধ্রুব রাঠীর এই দ্রুত মুক্তি এবং তার সাহসী প্রতিবাদী বয়ান, আগামী দিনে ভারতের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে অনেকেই মনে করছেন।