সোমবার, অক্টোবর ১২, ২০২৬
২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুলিশের বাধা পেরিয়ে সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছেছে রাহুল-প্রিয়াঙ্কার মিছিল

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম

পুলিশের বাধা পেরিয়ে সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছেছে রাহুল-প্রিয়াঙ্কার মিছিল
ছবি : Collected

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এক অভূতপূর্ব ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদী কর্মসূচির সাক্ষী হলো দেশটির রাজধানী নয়াদিল্লি। সোমবার, ১২ অক্টোবর দুপুরে ভারতের সম্মিলিত বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-এর উদ্যোগে আয়োজিত ‘সুপ্রিম কোর্ট চলো’ নামক এই মেগা মিছিলে রাজপথ যেন পরিণত হয়েছিল এক বিশাল জনসমুদ্রে।

 

এই জোরালো প্রতিবাদী মিছিলে একেবারে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতা রাহুল গান্ধী, দলের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে।

 

পথে পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফ থেকে ব্যাপক বাধা, ব্যারিকেড ও নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হলেও শেষ পর্যন্ত অনড় ও অদম্য বিক্ষোভকারীদের রুখতে পারেনি পুলিশ। সমস্ত প্রতিকূলতা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে অতিক্রম করে সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে বিরোধী জোটের এই ঐতিহাসিক মিছিল সফলভাবে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে গিয়ে পৌঁছায়।

 

ভারতের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রতিবাদী পদযাত্রা একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ধারাবাহিকভাবে নানা ধরনের প্রশ্ন ও গভীর উদ্বেগ উত্থাপন করে আসছিল।

 

বিশেষ করে বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কার্যপ্রণালী এবং সাম্প্রতিক বেশ কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বিরোধী জোটের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সম্পূর্ণ সাংবিধানিক ও স্বাধীন সংস্থার সর্বোচ্চ পদে এমন কোনো ব্যক্তির আসীন থাকা উচিত নয়, যার নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে বিন্দুমাত্র সংশয় রয়েছে।

 

এই প্রেক্ষাপটেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার বৃহত্তর স্বার্থে জ্ঞানেশ কুমারের নিঃশর্ত পদত্যাগের এক দফা দাবি তুলে এই রাজপথের আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়।

 

পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সোমবার দুপুরের দিকে দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কনস্টিটিউশন ক্লাব থেকে এই বিশাল ও সুসংগঠিত কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং প্রবীণ রাজনীতিবিদ মল্লিকার্জুন খাড়গে একটি বিশেষ বাসে আরোহণ করে যাত্রা শুরু করেন।

 

তাদের সাথে একই বাসে উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেসের আরেক পরিচিত মুখ নেহা বোরাসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা। বাসটির ঠিক পেছনে, আশপাশে এবং পুরো রাজপথ জুড়ে হাজার হাজার উজ্জীবিত নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত করে মিছিল নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন।

 

বিরোধী দলগুলোর এই সমন্বিত উপস্থিতিতে দিল্লির রাজপথ মুহূর্তের মধ্যেই এক অভাবনীয় উৎসবমুখর অথচ তীব্র প্রতিবাদী রূপ ধারণ করে। অংশগ্রহণকারীদের হাতে থাকা নানা ধরনের প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবির পাশাপাশি গণতন্ত্র রক্ষার বিভিন্ন জোরালো স্লোগান লেখা ছিল।

 

যাত্রাপথের একপর্যায়ে, যখন বাসটি দিল্লির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম বারাখাম্বা এলাকার কাছাকাছি এসে পৌঁছায়, তখন কর্মসূচির দৃশ্যপটে এক নাটকীয় পরিবর্তন আসে। শীর্ষ নেতারা সিদ্ধান্ত নেন যে, তারা আর বাসে করে নয়, বরং সাধারণ কর্মীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পায়ে হেঁটেই বাকি পথ অতিক্রম করবেন।

 

এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং মল্লিকার্জুন খাড়গে বাস থেকে নেমে আসেন এবং সরাসরি সাধারণ জনতার কাতারে এসে দাঁড়ান। শীর্ষ নেতাদের নিজেদের সাথে সাধারণ পথচারীর মতো রাজপথে হাঁটতে দেখে মিছিলের কর্মীদের উৎসাহ, উদ্দীপনা ও উন্মাদনা যেন বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

 

তারা আরও বেশি সংঘবদ্ধ হয়ে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল কিন্তু জোরালোভাবে সর্বোচ্চ আদালতের দিকে পদযাত্রা অব্যাহত রাখেন। নেতাদের এই সরাসরি অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, এই দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে বিরোধী জোট কতটা আন্তরিক এবং তারা যেকোনো মূল্যে এই আন্দোলনকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।

 

কিন্তু বিরোধীদের এই সুশৃঙ্খল প্রতিবাদী যাত্রা খুব একটা মসৃণ ছিল না। বিশাল মিছিলটি যখন সুপ্রিম কোর্টের কাছাকাছি ভগবান দাস মার্গের মোড়ে এসে পৌঁছায়, তখন সেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা বিশাল পুলিশ বাহিনী তাদের পথরোধ করে দাঁড়ায়।

 

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং আদালতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যুক্তিতে দিল্লি পুলিশের তরফ থেকে রাস্তায় বড় বড় লোহার ব্যারিকেড ও কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন করা হয়েছিল। পুলিশি বাধার মুখে মিছিলের অগ্রযাত্রা সাময়িকভাবে থমকে গেলেও, বিক্ষোভকারীরা তাদের অবস্থান থেকে একচুলও সরে যাননি।

 

বরং সেখানে এক অত্যন্ত উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ ধরে তুমুল তর্কবিতর্ক ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ ও বদ্ধপরিকর আন্দোলনকারীরা পুলিশের তৈরি করা সমস্ত স্তরের নিরাপত্তা ব্যারিকেড ও প্রতিবন্ধকতা ভেঙে ফেলেন এবং অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সুপ্রিম কোর্টের দিকে তাদের চূড়ান্ত গন্তব্যের পথে অগ্রসর হতে শুরু করেন।

 

পুলিশের তরফ থেকে বারবার লাঠিচার্জের হুমকি এবং জলকামান ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও, শীর্ষ নেতাদের সরাসরি উপস্থিতি এবং মিছিলের বিশাল আকার দেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শেষ পর্যন্ত খুব বেশি কঠোর হওয়া থেকে বিরত থাকে।

 

দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস পদযাত্রা, অব্যাহত স্লোগান এবং পুলিশের সাথে দফায় দফায় উত্তেজনার পর, অবশেষে সন্ধ্যা ঠিক সাড়ে ছয়টার দিকে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নেতৃত্বে এই সুবিশাল প্রতিবাদী মিছিল ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের কাছাকাছি পৌঁছাতে সক্ষম হয়।

 

সর্বোচ্চ আদালতের সামনে পৌঁছে নেতারা তাদের চূড়ান্ত অবস্থান গ্রহণ করেন। তারা সেখানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ করছেন এবং নির্বাচন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত দেশের সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের এই গণতান্ত্রিক সংগ্রাম কোনোভাবেই থামবে না।

 

রাজপথে যখন এই বিশাল প্রতিবাদী মিছিল সমস্ত বাধা উপেক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেই একই সময়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের ভেতরেও চলছিল আরেক নীরব কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আইনি লড়াই।

 

রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি আইনি পথেও সমানভাবে অগ্রসর হওয়ার সুচিন্তিত কৌশল গ্রহণ করেছিল প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। মিছিল সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টা আগেই, সোমবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে কংগ্রেস দলের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীদের একটি সুদক্ষ প্যানেল সুপ্রিম কোর্টে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি আইনি পিটিশন বা আবেদন দাখিল করে।

 

এই পিটিশনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং তার অবিলম্বে অপসারণের বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালতের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা কামনা করা হয়।

 

রাজপথে রাজনৈতিক চাপ এবং আদালতে আইনি লড়াই-এই দ্বিমুখী কৌশলের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার এক সুপরিকল্পিত ছক বাস্তবায়িত করেছে বিরোধী শিবির।

 

রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী জোটের এই ‘সুপ্রিম কোর্ট চলো’ কর্মসূচি শুধু একটি সাধারণ রাজনৈতিক মিছিল নয়, বরং এটি ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর সুরক্ষায় একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও দূরদর্শী বার্তা।

 

নির্বাচন কমিশনের মতো স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সাধারণ জনগণের পূর্ণ আস্থা বজায় রাখা একটি সুস্থ ও কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য পূর্বশর্ত। বিরোধীদের এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন প্রমাণ করে যে, আসন্ন দিনগুলোতে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আরও বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ হতে চলেছে।

 

নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ওঠা এই গুরুতর প্রশ্নগুলো যদি দ্রুত সমাধান না হয়, তবে ভবিষ্যতে অনুষ্ঠিতব্য যেকোনো নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই জনমনে গভীর সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে।

 

একই সাথে, সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করে এবং কংগ্রেসের দায়ের করা পিটিশনের ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তার ওপর নির্ভর করছে ভারতের আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি।

 

পরিশেষে বলা যায়, ১২ অক্টোবরের এই ঘটনাবহুল দিনটি ভারতের সমসাময়িক রাজনীতির ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। পুলিশি বাধা, ব্যারিকেড এবং নানাবিধ প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে এই পদযাত্রা বিরোধী দলগুলোর মনোবল ও অটুট ঐক্যের এক অনবদ্য প্রদর্শনী।

 

এখন গোটা দেশের সচেতন নাগরিক সমাজের নজর নিবদ্ধ রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের দিকে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধীদের এই রাজপথের আন্দোলন এবং আইনি লড়াই শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের কাঠামোগত বা গুণগত সংস্কার আনতে সক্ষম হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

 

ভারতের সাধারণ মানুষ গভীরভাবে প্রত্যাশা করে যে, দেশের সর্বোচ্চ আদালত তার নিজস্ব প্রজ্ঞা ও বিচারবোধ প্রয়োগ করে এমন একটি দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, যা দেশের গণতান্ত্রিক ভিতকে ভবিষ্যতের জন্য আরও বেশি সুদৃঢ় ও মজবুত করবে।

 

- আনন্দবাজার