মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের প্রদর্শনীতে কিম জং উন

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের প্রদর্শনীতে কিম জং উন
ছবি : Collected

বৈশ্বিক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি আঘাত হানতে সক্ষম একটি সর্বাধুনিক আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা আইসিবিএম সজ্জিত নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প জাদুঘর অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণভাবে পরিদর্শন করেছেন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন।

 

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) পিয়ংইয়ংয়ের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সির (কেসিএনএ) প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ওই গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন স্থিরচিত্রে দেখা যায়, কিম জং উন তার শিশুকন্যা ও স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে এই অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র জাদুঘরটি ঘুরে দেখছেন।

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিদর্শনের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া মূলত পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতার একটি পরোক্ষ কিন্তু অত্যন্ত কঠোর বার্তা প্রদান করল।

 

এই ঘটনাটির সময়কাল আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, আসন্ন এশিয়া সফরের সময় উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতার সঙ্গে একটি সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হতে পারে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।

 

আর ট্রাম্পের সেই ঘোষণার ঠিক এক দিন পরই কিম জং উনের এই সুপরিকল্পিত জাদুঘর পরিদর্শনের ঘটনা ঘটল। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে চীনের মাটিতে অনুষ্ঠিতব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থা বা এপিইসি শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অংশগ্রহণ করবেন বলে জোরালোভাবে আশা করা হচ্ছে।

 

আর সেই সফরের ফাঁকেই কিমের সঙ্গে তার সাক্ষাতের একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য সেই বৈঠকের আগে নিজেদের সামরিক শক্তি প্রদর্শন করে আলোচনার টেবিলে কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার জন্যই পিয়ংইয়ং এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেসিএনএ তাদের বিস্তৃত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত রোববার সম্পূর্ণ নতুনভাবে নির্মিত ‘প্রতিরক্ষা বিপ্লব জাদুঘর’ বা ডিফেন্স রেভোলিউশন মিউজিয়ামের এক জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সপরিবারে উপস্থিত ছিলেন উত্তর কোরিয়ার এই একনায়ক।

 

রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে কিম জং উনের সঙ্গে তার আদরের কন্যা জু আয়ে এবং সহধর্মিণী রি সোল জু উপস্থিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো দীর্ঘদিন ধরেই কিমের সামরিক পরিদর্শনে তার কন্যার উপস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে আসছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সামরিক শক্তির উত্তরাধিকার হস্তান্তর এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা অবিচল রাখার এক সুদূরপ্রসারী মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের অংশ হিসেবেই কিম জং উন তার মেয়েকে রাষ্ট্রীয় এমন সংবেদনশীল সামরিক প্রদর্শনীগুলোতে প্রতিনিয়ত জনসমক্ষে নিয়ে আসছেন।

 

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রকাশিত এবং প্রচারিত ছবিগুলোতে দেখা যায়, নবনির্মিত এই সুবিশাল জাদুঘরটিতে কিম জং উনের শাসনামলে উদ্ভাবিত ও তৈরি করা নানা ধরনের অত্যাধুনিক সামরিক যুদ্ধাস্ত্রের এক বিশাল সমাহার ঘটানো হয়েছে।

 

প্রদর্শনীতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির চালকবিহীন বিমান বা ড্রোন থেকে শুরু করে শত্রুপক্ষের জন্য চরম আতঙ্কের কারণ হিসেবে বিবেচিত 'হোয়াসং-২০' মডেলের আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সগর্বে প্রদর্শন করা হয়েছে।

 

এসব সমরাস্ত্র কেবল উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর শক্তিরই জানান দেয় না, বরং বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার মাঝেও তাদের সামরিক প্রযুক্তির অভাবনীয় এবং নিরবচ্ছিন্ন উন্নতির প্রমাণ বহন করে। বিশেষ করে 'হোয়াসং-২০' ক্ষেপণাস্ত্রটির উপস্থিতি পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের কপালে নতুন করে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

 

এই প্রদর্শনীর ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কোরিয়া ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি ফোরামের সম্মানিত মহাসচিব শিন জং-উ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।

 

তিনি উল্লেখ করেছেন, হোয়াসং-২০ ক্ষেপণাস্ত্রের বিশালাকার উৎক্ষেপণ যন্ত্রের ঠিক সামনে রাখা একটি বিশেষ প্রদর্শনীতে এমন একটি নকশা উপস্থাপন করা হয়েছে, যা একই সঙ্গে একাধিক ধ্বংসাত্মক বিস্ফোরক শীর্ষ বা ওয়ারহেড বহনে সক্ষম।

 

সামরিক পরিভাষায় এটি অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত, যা শত্রুপক্ষের যেকোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে দারুণভাবে কার্যকর। শিন জং-উ আরও জানান, প্রদর্শনীতে একটি বিশাল বিশ্বমানচিত্রও অত্যন্ত সুকৌশলে উপস্থাপন করা হয়েছে।

 

সেই মানচিত্রে এই ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্রটির সম্ভাব্য আঘাত হানার সীমা বা পাল্লা নিখুঁতভাবে নির্দেশ করা হয়েছে। মানচিত্র অনুযায়ী, এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সুদূর মধ্যপ্রাচ্য, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অস্ট্রেলিয়া এবং এমনকি দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত বলে স্পষ্টভাবে দাবি করা হয়েছে।

 

মহাসচিব শিন জং-উ তার গভীর বিশ্লেষণে আরও বলেন, কিম জং উন মূলত তার প্রতিরক্ষা বিজ্ঞান উন্নয়ন কর্মসূচির ধারাবাহিক ও চূড়ান্ত সাফল্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জোরালোভাবে তুলে ধরার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যেই এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন বলে প্রবলভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

 

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে যদি কোনো শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, তবে সেই সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনার আগে দরকষাকষিতে কৌশলগত সুবিধা আদায় করে নেওয়ার লক্ষ্যে পিয়ংইয়ং যে প্রচার-প্রচারণা চালানোর দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করেছে, এই অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র প্রদর্শনী তারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে তিনি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন।

 

এর মাধ্যমে পিয়ংইয়ং ওয়াশিংটনকে এই বার্তাই দিতে চাইছে যে, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে আঘাত হানার মতো সক্ষমতা তাদের সম্পূর্ণভাবে অর্জিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সামরিক বিশ্লেষকরা এই জাদুঘর নির্মাণের পেছনে আরও গভীর একটি মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাল দেখতে পাচ্ছেন।

 

তারা বলছেন, সামরিক প্রদর্শনীর মতো সাময়িক আয়োজনগুলোকে স্থায়ী রূপ দিয়ে সরকারের চিরস্থায়ী অর্জনে পরিণত করার যে নিরন্তর চেষ্টা কিম জং উন চালিয়ে যাচ্ছেন, এই সুবিশাল জাদুঘরটি তারই একটি অত্যন্ত বড় ও দৃশ্যমান প্রমাণ।

 

এ প্রসঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়ুংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ফার ইস্টার্ন স্টাডিজের স্বনামধন্য অধ্যাপক লিম উল-চুল তার সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, একসময়ের অস্থায়ী অস্ত্র প্রদর্শনী কেন্দ্রগুলোকে রাতারাতি স্থায়ী ও সুরম্য জাদুঘরে রূপান্তরের মাধ্যমে কিম জং উন মূলত তার দেশের সামরিক সাফল্যকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাচ্ছেন।

 

অধ্যাপক লিম উল-চুলের মতে, এই সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার একনায়ক তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ও সর্বাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অর্জনকে কোনো সাময়িক ঘটনা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের এক চূড়ান্ত, অপরিবর্তনীয় এবং দীর্ঘস্থায়ী গৌরবময় সাফল্য হিসেবে নিজ দেশের জনগণ ও বহির্বিশ্বের কাছে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরছেন।

 

সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আন্তর্জাতিক নানামুখী চাপ, কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতার মাঝেও উত্তর কোরিয়া তাদের সামরিক শক্তিবৃদ্ধির লক্ষ্য থেকে এক চুলও সরে আসেনি।

 

বরং কিম জং উনের নেতৃত্বে তারা তাদের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের ঠিক আগমুহূর্তে কিমের এই অস্ত্র প্রদর্শন নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে এক নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সূত্রমতে প্রাপ্ত এই সংবাদটি নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ করে যে, কোরীয় উপদ্বীপের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সহসাই প্রশমিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, বরং তা নতুন মাত্রা লাভ করতে যাচ্ছে।

 

- রয়টার্স