মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিক্ষোভ, সিজেপির শীর্ষনেতারা আটক

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:২৬ পিএম

নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিক্ষোভ, সিজেপির শীর্ষনেতারা আটক
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর এলাকায় পুলিশের জারি করা কঠোর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিক্ষোভ প্রদর্শনকালে আটক হয়েছেন ইন্টারনেটভিত্তিক রাজনৈতিক দল ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) শীর্ষস্থানীয় দুই নেতা।

 

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক নির্দেশিকা লঙ্ঘন করে মঙ্গলবার সকালে এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের আটক করে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাকে ঘিরে রাজধানীজুড়ে ব্যাপক উত্তেজনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

 

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর চলমান আন্দোলনের মাঝেই এই আটকের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও বেশি উত্তপ্ত করে তুলেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তা এবং সিজেপির অন্যতম শীর্ষ সংগঠক অভিজিৎ দীপকের আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে এই আটকের বিষয়টি প্রথম জনসমক্ষে আসে।

 

অভিজিৎ দীপকের দেওয়া তথ্যমতে, মঙ্গলবার সকাল ঠিক ১০টার দিকে দলটির শীর্ষ দুই মুখপাত্র সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা তাদের বেশ কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক ও সমর্থককে সঙ্গে নিয়ে যন্তর মন্তর এলাকায় প্রবেশ করার চেষ্টা করেন।

 

এক্সে প্রকাশিত ওই ভিডিওচিত্রে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা হাতে দলীয় পতাকা নিয়ে অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে যন্তর মন্তরের মূল ফটক টপকে ভেতরে প্রবেশ করছেন। তাদের এই আকস্মিক প্রবেশের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে আগে থেকে মোতায়েন থাকা বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেন এবং ধাওয়া করেন।

 

এ সময় পুলিশের হাতে আটক এড়াতে এবং নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত জোরালোভাবে জানান দিতে বিক্ষোভকারীরা 'ভারত মাতা কি জয়' এবং 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ' স্লোগানে পুরো এলাকা প্রকম্পিত করে তোলেন। পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ তাদের বাধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ তীব্র ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে।

 

একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনে এবং বিক্ষোভকারীদের আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, পুলিশি পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং কোনো ধরনের জমায়েত হতে না দেওয়ার বিষয়ে প্রশাসন বদ্ধপরিকর ছিল।

 

দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে চলমান এই ব্যাপক বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ভারতের নির্বাচন কমিশনের একটি অত্যন্ত বিতর্কিত পদক্ষেপ। মূলত 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' বা ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করেই এই তীব্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে এই ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াটিকে ঘিরে ভারতজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকায় ব্যাপক অস্বচ্ছতা, কারচুপি ও অনিয়ম তৈরি হতে পারে, যা আগামী নির্বাচনগুলোর ফলাফলে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

 

বিরোধীদের দাবি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখা অপরিহার্য, কিন্তু বর্তমান কমিশনের অধীনে সেটি চরম হুমকির সম্মুখীন। এই গুরুতর বিতর্কের জেরে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নিরপেক্ষতা নিয়েও দেশজুড়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।

 

বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবিতে রাজপথে নেমেছে বিজেপিবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বৃহত্তর জোট ‘ইনডিয়া’ এবং ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।

 

তারা মনে করছেন, নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ পদে পরিবর্তন না আনলে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হবে। বিক্ষোভকারীদের এমন অনড় অবস্থানের কারণে দিল্লির পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি নির্দেশে গত সোমবার যন্তর মন্তর এলাকায় সব ধরনের রাজনৈতিক বিক্ষোভ, সমাবেশ ও জমায়েত সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দিল্লি পুলিশ।

 

যন্তর মন্তর দীর্ঘকাল ধরে ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও প্রতিবাদের একটি ঐতিহাসিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সরকারের এই নতুন নির্দেশনার ফলে সেই ঐতিহ্যবাহী প্রতিবাদ স্থলের বদলে বিক্ষোভকারীদের জন্য রাজধানীর অন্য তিনটি সুনির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

 

পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, এখন থেকে যেকোনো রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান অথবা পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দানে পালন করতে হবে।

 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, সাধারণ মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, যানজট এড়াতে এবং জনদুর্ভোগ কমাতেই মূলত এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। তবে বিরোধী দলগুলো সরকারের এই যুক্তি মানতে নারাজ।

 

তাদের মতে, যন্তর মন্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থান থেকে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো বিরোধী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়া এবং আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুকে শহরের মূল প্রাণকেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া।

 

এর ফলে আন্দোলনকারীদের দাবি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর পথ আরও কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সিজেপির শীর্ষ নেতারা। গত ১০ অক্টোবর থেকেই দিল্লি পুলিশ পুরো যন্তর মন্তর এলাকাটিকে কয়েক স্তরের কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলেছে। সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকারও অত্যন্ত সীমিত করা হয়েছে।

 

উল্লেখ্য, সিজেপি তাদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গত ১০ অক্টোবরই যন্তর মন্তরে একটি বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছিল। কিন্তু আন্দোলন দমাতে পুলিশ আগে থেকেই অত্যন্ত কঠোর ও সতর্ক অবস্থানে ছিল।

 

ওই দিন সকালে সিজেপির শীর্ষ সংগঠক অভিজিৎ দীপকে, মুখপাত্র সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা বিমানে করে দিল্লিতে অবতরণ করার পরপরই বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়েছিল।

 

রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই তীব্র বিক্ষোভ ঠেকাতে গত শনিবার এবং রবিবার পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে হাজার হাজার সাধারণ বিক্ষোভকারী ও রাজনৈতিক কর্মীকে আটক করা হয়েছে। সার্বিকভাবে, নয়াদিল্লির বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত থমথমে।

 

একদিকে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের নিরন্তর সংগ্রাম-এই দুইয়ের টানাপোড়েনে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

 

আগামী দিনগুলোতে এই বিক্ষোভ আরও বৃহত্তর রূপ নিতে পারে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং সরকারের দমনপীড়ন নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ কীভাবে প্রশমিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

 

- এনডিটিভি