শুক্রবার, অক্টোবর ১৬, ২০২৬
১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মালয়েশিয়ায় বিনা খরচে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী নিচ্ছে ৩৩৮ এজেন্সি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম

মালয়েশিয়ায় বিনা খরচে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী নিচ্ছে ৩৩৮ এজেন্সি
ছবি : Collected

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ মালয়েশিয়া দীর্ঘকাল ধরেই বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় ও আকর্ষণীয় শ্রমবাজার। তবে বিভিন্ন সময়ে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা ও উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ের কারণে এই শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

 

এসকল বাধা অতিক্রম করে অবশেষে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক সংবাদ সামনে এসেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানামুখী কূটনৈতিক তৎপরতার পর মালয়েশিয়ায় পুনরায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

 

সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো, দেশটিতে প্রাথমিকভাবে দশ হাজার বাংলাদেশি কর্মী সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিয়োগের বিষয়ে নীতিগতভাবে চূড়ান্ত সম্মতি জ্ঞাপন করেছে মালয়েশিয়া সরকার। একই সঙ্গে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলার সঙ্গে পরিচালনার লক্ষ্যে বাংলাদেশের ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করতেও সম্মতি প্রদান করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।

 

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের উদ্দেশে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্যগুলো বিস্তারিতভাবে জানানো হয়েছে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

বিজ্ঞপ্তিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত মানদণ্ড ও যোগ্যতার ভিত্তিতে এই রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে নির্বাচন করা হয়েছে। অনুমোদিত এই ৩৩৮টি এজেন্সির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড বা বোয়েসেল।

 

এর পাশাপাশি ২৫টি বেসরকারি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি এবং আরও ৩১২টি সাধারণ রিক্রুটিং এজেন্সিকে এই নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তালিকাভুক্ত করতে সম্পূর্ণভাবে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়া।

 

এত বিপুলসংখ্যক এজেন্সিকে কাজের সুযোগ দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কোনো একক পক্ষের আধিপত্য বা সিন্ডিকেট প্রথা ভেঙে দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ পরিবেশ তৈরি করা।

 

এই প্রক্রিয়ায় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে মন্ত্রণালয় বিশদভাবে জানিয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত প্রতিটি এজেন্সি নিজেদের উদ্যোগে মালয়েশিয়ার বাজারে সম্ভাবনাময় নিয়োগকর্তা খুঁজে বের করতে পারবে।

 

তারা মালয়েশিয়ার বিভিন্ন কোম্পানি থেকে সরাসরি চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহ করার অধিকার পাবে এবং প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ কর্মী নির্বাচন করে সার্বিক নিয়োগপ্রক্রিয়া সফলভাবে পরিচালনা করতে পারবে।

 

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো বিনা খরচে কর্মী নিয়োগের বিষয়টি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মালয়েশিয়ার কাছে বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছিল, যাতে বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক শোষণের শিকার না হয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়।

 

এই আন্তরিক অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই মূলত দশ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিয়োগের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছে মালয়েশিয়া। সরকারের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপের লক্ষ্য দেশে কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি বিদেশ গমনেচ্ছুক সাধারণ কর্মীদের ঘাড় থেকে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের বোঝা সম্পূর্ণরূপে লাঘব করা এবং পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

 

কূটনৈতিক মহলের মতে, এই অর্জন সহজে আসেনি। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তিতে বিধান ছিল, যোগ্যতার মাপকাঠির ভিত্তিতেই রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে যাচাই-বাছাই করে তালিকাভুক্ত করা হবে।

 

এই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এজেন্সিগুলোর যোগ্যতা ও স্বচ্ছতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়। দীর্ঘ যাচাই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় আইনি কাগজপত্রসহ মোট ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির খসড়া তালিকা মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল।

 

সেখান থেকেই যাচাই শেষে ৩৩৮টি এজেন্সিকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে অত্যন্ত কার্যকর এবং ধারাবাহিক আলোচনা পরিচালিত হয়েছে।

 

বিশেষ করে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ায় গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে মিলিত হন এবং বন্ধ থাকা শ্রমবাজার পুনরায় চালু করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে উত্থাপন করেন।

 

সম্পূর্ণ নিয়োগপ্রক্রিয়ার ধাপগুলো কীভাবে সম্পন্ন হবে, সে বিষয়েও মন্ত্রণালয় সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছে। অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো প্রথমে চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহ করবে এবং তার ভিত্তিতে বাংলাদেশে কর্মী নির্বাচন করবে।

 

এরপর নির্বাচিত কর্মীদের কলিং ভিসা, ই-ভিসা সংগ্রহসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ও অত্যন্ত জরুরি প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বোয়েসেল এবং তালিকাভুক্ত ২৫টি বেসরকারি প্রসেসিং এজেন্সি সার্বিক সহায়তা প্রদান করবে।

 

মালয়েশিয়ার মাটিতে নিয়োগের প্রাথমিক প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী পরবর্তী সকল দাপ্তরিক কার্যক্রম শেষ করবে।

 

এ ছাড়া প্রতিটি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিকে তাদের নিজস্ব বৈধ লাইসেন্সের অধীনে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বা বিএমইটি থেকে ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হবে, যা অভিবাসনপ্রক্রিয়াকে আইনি সুরক্ষা প্রদান করবে।

 

এই প্রক্রিয়ায় বোয়েসেল এবং ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সি সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সিকে প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র প্রদান করতে পারবে, যাতে কর্মীর বিদেশযাত্রায় অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা সৃষ্টি না হয়। কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ধাপ।

 

মালয়েশিয়াগামী এই কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারের তালিকা চূড়ান্ত করার একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের শর্ত অনুযায়ী, এই তালিকা চূড়ান্ত করার একক অধিকার কারও নেই, বরং এটি উভয় দেশের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।

 

শ্রমবাজার দ্রুততম সময়ের মধ্যে চালু করার বৃহত্তর স্বার্থে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যমান মেডিকেল সেন্টারের তালিকাটি পরিবর্তনের জন্য মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষের কাছে বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছিল।

 

এর পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, শিগগিরই মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌথ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে আগমন করবে।

 

তারা সরেজমিন বিভিন্ন মেডিকেল সেন্টার পরিদর্শন করার পর একটি নতুন ও সম্পূর্ণ স্বচ্ছ তালিকার চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করবে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে কার্যক্রম যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য ইতিপূর্বে বিতর্কিত এবং অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রমাণিত মেডিকেল সেন্টারগুলোকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

 

মালয়েশিয়ার অনুমোদিত বিদ্যমান তালিকার অবশিষ্ট যে ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই, মূলত সেগুলোর মাধ্যমেই স্বাস্থ্য পরীক্ষার কার্যক্রম শুরু করার বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

 

স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য তালিকাভুক্ত মেডিকেল সেন্টারগুলোর কার্যক্রম বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য ও অভিবাসন কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখবে।

 

এই মনিটরিংয়ের সময় কোনো মেডিকেল সেন্টারের বিরুদ্ধে সামান্যতম কোনো অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে, কালক্ষেপণ না করে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের সকল কার্যক্রম বন্ধ করার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

পর্যায়ক্রমে যোগ্যতার ভিত্তিতে নতুন মানসম্মত মেডিকেল সেন্টার এই তালিকায় যুক্ত করে সংশোধিত তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে বলে সরকার অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে আশ্বস্ত করেছে। মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে যে, মালয়েশিয়ায় আগ্রহী কর্মীরা শুধুমাত্র বৈধভাবে অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমেই তাদের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিরাপদে সম্পন্ন করতে পারবেন।

 

একই সঙ্গে কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুধুমাত্র অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারগুলো থেকেই সম্পন্ন করতে হবে। কোনো একটি নির্দিষ্ট মেডিকেল সেন্টারকে এককভাবে সকল কর্মীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা পরিচালনার একচেটিয়া আধিপত্য বা সুযোগ কোনোভাবেই দেওয়া হবে না।

 

পরিশেষে, মালয়েশিয়ার মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার পুনরায় চালুর যুগান্তকারী উদ্যোগে সার্বিক সহযোগিতা ও আন্তরিকতা প্রদর্শনের জন্য মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হয়েছে।

 

একই সঙ্গে, বাংলাদেশের যেসকল রিক্রুটিং এজেন্সি এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তাদের প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর অথচ সংবেদনশীল আহ্বান জানানো হয়েছে। তাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন কোনো অবস্থাতেই কর্মীদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে আপস না করে।

 

অভিবাসন ব্যয় যাতে কোনোভাবেই নির্ধারিত সীমার বাইরে না যায়, সাধারণ কর্মীরা যাতে প্রতারণার শিকার না হন এবং সর্বোপরি প্রচলিত আইন ও আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ড শতভাগ মেনে যেন পুরো নিয়োগ কার্যক্রম পেশাদারি ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচালনা করা হয়, সে বিষয়ে সরকার তার অনড় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।

 

- দ্য প্রেস২৪