প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসা সাধারণ মানুষের আন্দোলনে সরাসরি সমর্থন জানিয়ে রাহুল এখন তরুণ ভোটারদের কাছে নিজের এক নতুন ও বিকল্প রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন, যা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক পরিচয় একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর প্রপৌত্র, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নাতি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সন্তান।
এই বিশাল পারিবারিক পরিচয়ের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে একজন স্বতন্ত্র ও দূরদর্শী জাতীয় নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে তাকে দশকের পর দশক ধরে নানা ধরনের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
তবে ছাপ্পান্ন বছর বয়সে এসে তিনি যেন এক নতুন রাজনৈতিক পরিপক্বতা অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি নরেন্দ্র মোদির অত্যন্ত কঠোর এবং নেতৃত্বকেন্দ্রিক রাজনীতির ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে নিজের জন্য একটি মজবুত রাজনৈতিক পরিসর তৈরির চেষ্টা করছেন, যেখানে তিনি সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে সরব হয়েছেন।
রাহুল গান্ধীর মূল বক্তব্য হলো, বর্তমান সরকারের অধীনে ভারতের সাধারণ নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। সম্প্রতি দেশটিতে কলেজে ভর্তির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পরীক্ষা বাতিল এবং পরবর্তীতে যে তীব্র ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে, ঠিক সেই সময়ে রাহুলের এই বক্তব্য তরুণ সমাজের কাছে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও জোরালো হয়ে ওঠে। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই, দেশজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে এবং লাখ লাখ মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়লে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে রাহুলের তীব্র সমালোচনা রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়।
প্রখ্যাত লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নীরজা চৌধুরীর মতে, বর্তমান সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের এই ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ এবং বিরোধী রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান উদ্দীপনার অভাব মূলত রাহুলের বক্তব্যগুলোকে এখন সাধারণ মানুষের কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলছে।
তিনি মনে করেন, এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণেই রাহুল গান্ধী তার রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে শুরু করেছেন। তবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নটি হলো, এই বর্তমান পরিস্থিতি এবং জনরোষকে কাজে লাগিয়ে রাহুল কি সত্যিই তার দল কংগ্রেসকে ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে একটি কাঙ্ক্ষিত জয়ের পথে নিয়ে যেতে পারবেন কি না।
যদি তিনি এই অসাধ্য সাধন করতে পারেন, তবে তা ভারতের রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক পালাবদল ঘটাবে এবং এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্য ও ক্ষমতাও এক চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
রাহুল গান্ধীর এই রাজনৈতিক পথচলা কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপির কাছে প্রতিটি নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। এমনকি একসময় তার বাবা রাজীব গান্ধীর একচেটিয়া দখলে থাকা ঐতিহ্যবাহী আসনেও রাহুলকে পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছে।
তার মা সোনিয়া গান্ধী দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসের হাল ধরে রাখলেও দলের ধারাবাহিক পতন রোধ করা সম্ভব হয়নি। এই চরম হতাশার জায়গা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি বদলাতে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে রাহুল দেশজুড়ে এক বিশাল পদযাত্রা শুরু করেন, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’।
এই কর্মসূচিতে তিনি প্রায় আড়াই হাজার মাইল পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দেন। টানা ১৩৬ দিন ধরে চলা এই ঐতিহাসিক যাত্রার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল, তাকে কেবল অভিজাত ও সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন একজন নেতা হিসেবে দেখার যে ভ্রান্ত ধারণা মানুষের মনে প্রোথিত ছিল, তা সমূলে উৎপাটন করা।
এই দীর্ঘ পদযাত্রার ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায় ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে, যেখানে কংগ্রেসের আসনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায় এবং বিজেপি তাদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। ফলে বাধ্য হয়ে বিজেপিকে জোট শরিকদের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠন করতে হয়।
এই নির্বাচনের পর রাহুল গান্ধী আনুষ্ঠানিকভাবে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব পাওয়ার পরও তিনি ভারতের নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা অব্যাহত রাখেন।
তিনি অভিযোগ করেন যে, মহারাষ্ট্র ও বিহারের মতো রাজ্যগুলোর নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকায় অত্যন্ত সুকৌশলে কারসাজি করা হয়েছিল। বিশেষ করে, এক বছর আগে শুরু হওয়া ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমে দেশজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার বিষয়টিকে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
যদিও নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবে সমালোচকদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় মূলত মুসলিম সম্প্রদায়সহ বিজেপিবিরোধী বলে বিবেচিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভোটাররাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে চেন্নাইয়ে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় রাহুল গান্ধী অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মন্তব্য করেন যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বুঝতে পারছেন না তার রাজনৈতিক আধিপত্যের সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তবে ক্ষমতাসীন বিজেপির শীর্ষ নেতারা রাহুলের এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ অতিরঞ্জিত এবং ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পালটা দাবি করে বলেছেন যে, কংগ্রেস মূলত আরেকটি বড় ধরনের রাজনৈতিক পরাজয়ের দিকে এগোচ্ছে এবং এ ধরনের নেতিবাচক রাজনীতি দলটির কোনো উপকারে আসবে না।
তরুণ প্রজন্মের সমর্থন আদায়ে রাহুল এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কৌশল গ্রহণ করেছেন। চেন্নাইয়ের ওই জনসভায় তিনি ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ বা ‘তরুণদের কণ্ঠস্বর’ নামের একটি প্রচারণার অংশ হিসেবে তরুণদের মঞ্চে ডেকে তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা তুলে ধরার অভাবনীয় সুযোগ দেন।
এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকট ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণদের অসন্তোষকে জাতীয় মঞ্চে নিয়ে আসা। এই সভায় এক তরুণী চিকিৎসা বিজ্ঞানে ভর্তির চাপ সহ্য করতে না পেরে তার বোনের আত্মহত্যার মর্মান্তিক কাহিনি বর্ণনা করেন, যা উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে।
সেখানে রাহুলের ‘পিতৃতন্ত্র ধ্বংস করো’ স্লোগানটিও উপস্থিত তরুণ শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে নারীদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, কারণ ভারতের মতো একটি প্রথাগত সমাজে শীর্ষ পর্যায়ের একজন রাজনৈতিক নেতার মুখে এমন কথা শোনাটা ছিল অত্যন্ত বিরল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব, যিনি দীর্ঘদিন ধরে রাহুলের সঙ্গে কাজ করেছেন, তিনি রাহুলকে বই পড়তে ভালোবাসা এবং নতুন ধারণার প্রতি আগ্রহী একজন নেতা হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে তিনি এ কথাও স্বীকার করেন যে, রাহুল স্বভাবগতভাবে কিছুটা লাজুক এবং সহজাত বাগ্মী নন, যার ফলে অনেক সময় জনসমক্ষে সাবলীলভাবে কথা বলতে তাকে অস্বস্তিতে পড়তে দেখা যায়।
নিজের এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে রাহুল এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সক্রিয় হয়ে উঠেছেন, যেখানে তিনি রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি ফিটনেস, শরীরচর্চা এবং ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
তরুণদের সমর্থন আদায়ের পাশাপাশি নিজেকে বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিপরীতে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের একজন যোগ্য প্রতিনিধি হিসেবেও তুলে ধরছেন রাহুল। প্রতিবাদ কর্মসূচিগুলোতে ভারতের সংবিধানের একটি অনুলিপি হাতে নিয়ে তার উপস্থিতি এখন এক পরিচিত দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি কংগ্রেসের স্বাধীনতাসংগ্রামের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে সামনে এনে দেশের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ রক্ষার জোরালো ডাক দিচ্ছেন। বিশ্লেষক নীরজা চৌধুরীর মতে, ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে লড়াইটি এখন আর কেবল দুই দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি ক্রমেই ‘মোদি বনাম রাহুল’ রূপ পরিগ্রহ করছে।
দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং পরিচয়ের ওপর যে হুমকি তৈরি হয়েছে, তার বিরুদ্ধে জনমত, মনস্তাত্ত্বিক লড়াই এবং আইনি প্রক্রিয়াসহ সব ফ্রন্টে কংগ্রেস তাদের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বলে রাহুল দাবি করেছেন।
তরুণদের এই গভীর অসন্তোষকে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে রাহুল গান্ধী শেষ পর্যন্ত কতটা শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারবেন, তা হয়তো সময়ই বলে দেবে, তবে ভারতের রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তনের যে বীজ তিনি বপন করার চেষ্টা করছেন, তা আন্তর্জাতিক মহলেও এখন এক আলোচিত বিষয়।