শনিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২৬
২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রুশ জ্বালানি ক্রয়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল, ভারত ও চীনের অর্থনীতিতে স্বস্তি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম

রুশ জ্বালানি ক্রয়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল, ভারত ও চীনের অর্থনীতিতে স্বস্তি
ছবি : Collected

বিশ্ব অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির দৃশ্যপটে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নাটকীয় বাঁকবদল ঘটেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ক্রয়ের ওপর আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং শাস্তিমূলক শুল্ক সাময়িকভাবে শিথিল করার এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।

 

‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ নামক নতুন এবং অত্যন্ত কঠোর একটি আইনের আওতায় রাশিয়ার তেলের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপের ফলে বিশ্ববাজারে রুশ তেলের বৃহত্তম দুই ক্রেতা দেশ-ভারত এবং চীনের অর্থনীতিতে এক বিশাল স্বস্তি নেমে এসেছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত কেবল এশিয়া মহাদেশের জন্যই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের জ্বালানি বাজার এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রে এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করবে।

 

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বয়ং এই আইনটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেছিলেন। আইনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান আগ্রাসন এবং সামরিক পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় মস্কোর ওপর চরম অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা।

 

কিন্তু শুক্রবার গভীর রাতে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে একটি নতুন নির্বাহী আদেশ জারি করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ‘জাতীয় স্বার্থের’ কথা বিবেচনা করেই আপাতত এই আইনের অধীনে থাকা কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগুলো থেকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে।

 

এই নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তিনি বিশ্ববাণিজ্যের একটি সম্ভাব্য বড় ধরনের সংকটকে সাময়িকভাবে হলেও এড়াতে সক্ষম হয়েছেন বলে বাণিজ্য বিশ্লেষকরা মনে করছেন। শুক্রবার গভীর রাতে হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত ওই বিশেষ নির্বাহী আদেশে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, “আমি এতদ্বারা ‘গ্রাহাম অ্যাক্ট’-এ উল্লিখিত সকল ধরনের নিষেধাজ্ঞা, বিধিনিষেধ এবং শাস্তিমূলক শুল্কের প্রয়োগ শিথিল করছি।

 

আমি ইতোমধ্যে মার্কিন কংগ্রেসের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক সনদ জমা দিয়েছি, যেখানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই মুহূর্তে এ ধরনের ছাড় দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের সম্পূর্ণ অনুকূল।”

 

এই ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এক ধরনের স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা গেছে, যা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছিল। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই নির্দেশনার মাধ্যমে রাশিয়া-সংক্রান্ত শুল্কগুলোর বাস্তবায়ন কেবল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে; অর্থাৎ আইনটি বাতিল হয়ে যায়নি।

 

এর মানে হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট চাইলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অনুযায়ী যেকোনো সময় তার একক নির্বাহী ক্ষমতাবলে এই শুল্কগুলো পুনরায় কার্যকর করতে পারেন। এটিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা যে, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় মস্কোর ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে ও. গ্রাহাম এই আইনটি অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রণয়ন করেছিলেন এবং এর আইনি ভিত্তি এখনো সম্পূর্ণরূপে অটুট রয়েছে।

 

ফলে, যেকোনো সময় এই খড়গ পুনরায় নেমে আসার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। এই আইনে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস ক্রয়কারী শীর্ষ কয়েকটি দেশের ওপর মারাত্মক অর্থনৈতিক অবরোধের বিধান রাখা হয়েছিল।

 

বিশেষ করে চীন, ভারত, স্লোভাকিয়া এবং হাঙ্গেরির মতো দেশগুলো যারা বিপুল পরিমাণে রুশ জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের পণ্যসামগ্রীর ওপর আইনটি কার্যকর হওয়ার মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের একটি জোরালো প্রস্তাব ছিল।

 

তবে আইনটির একটি বিশেষ দিক হলো, এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুল্ক আরোপের কোনো কঠোর বিধান অন্তর্ভুক্ত ছিল না; বরং শুল্ক আদৌ আরোপ করা হবে কি না, তার হার কত হবে এবং ঠিক কখন থেকে তা কার্যকর করা হবে- এসব গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা কেবল মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপরই ন্যস্ত ছিল।

 

পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, আগামীকাল ১৮ অক্টোবর এই ভয়াবহ শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, যা শেষ মুহূর্তে এসে স্থগিত করা হলো। এই ঘটনায় ভারতের প্রসঙ্গটি আলাদাভাবে এবং অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার দাবি রাখে। ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি এবং রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা।

 

এটি মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি যে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক এই ছাড়ের নির্দেশনার ফলে শুল্ক বাস্তবায়ন আপাতত স্থগিত হলেও, ভবিষ্যতে এগুলো পুরোপুরি আরোপ করার পথ কোনোভাবেই চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়নি।

 

অর্থাৎ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট চাইলে নিজের সুবিধামতো এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ অনুযায়ী যেকোনো উপযুক্ত সময়ে এই স্থগিত করা শুল্কগুলো পুনরায় কার্যকর করতে পারেন, যা ভারতের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য একটি স্থায়ী উদ্বেগের কারণ হয়েই থাকছে।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি আইনের বিধান অনুযায়ী ভারতের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক সত্যিই আরোপ করতেন, তবে তা হতো দেশটির জন্য এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়। কারণ, এই নতুন শুল্কটি বিদ্যমান অন্যান্য শুল্কের সম্পূর্ণ অতিরিক্ত হিসেবে গণ্য হতো।

 

বর্তমানে ভারত থেকে আমদানিকৃত বিভিন্ন পণ্যের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমনিতেই ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে রেখেছে-যা মূলত জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি রোধে পর্যাপ্ত এবং কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার একটি শাস্তিস্বরূপ ব্যবস্থা।

 

এর ওপর নতুন করে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপিত হলে মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে যেত, যা ভারতের রপ্তানি খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করত।

 

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, গত বছর দুই দেশের সম্পর্কে বেশ বড় ধরনের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানির ক্ষেত্রে ভারতের ওপর শাস্তিস্বরূপ ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছিলেন।

 

পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয় যখন এর পাশাপাশি আরও ২৫ শতাংশ পারস্পরিক (রেসিপ্রোকাল) শুল্কও ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্ত করা হয়েছিল। তবে, দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বৃহত্তর বাণিজ্য কাঠামোর অংশ হিসেবে চলতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সেই অতিরিক্ত শুল্কগুলো প্রত্যাহার করা হয় এবং পারস্পরিক শুল্কের হার কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়, যা দুই দেশের সম্পর্ককে কিছুটা স্বাভাবিক করে।

 

অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানের এই নতুন শুল্ক ছাড়ের ঘোষণাটি এমন এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এল, যখন ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।

 

এই ধরনের একটি ছাড়ের ফলে সেই চুক্তির পথ আরও সুগম হলো এবং দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান অনেক সংশয় দূর হলো। তবে একইসঙ্গে এটি চীন এবং ভারতের মতো দেশগুলোকে একটি প্রচ্ছন্ন বার্তাও দিচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে।

 

পরিশেষে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতিকে আপাতত একটি বড় ধরনের ধাক্কা থেকে রক্ষা করলেও, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের রাজনীতিতে স্থায়ী কোনো সমাধান এখনো অনেক দূরের পথ।

 

- ফার্স্টপোস্ট