বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২২, ২০২৬
৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যন্তরমন্তরে বিক্ষোভ না করার শর্তে জামিন পেলেন ককরোচ জনতা পার্টির দুই শীর্ষ নেতা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৯ পিএম

যন্তরমন্তরে বিক্ষোভ না করার শর্তে জামিন পেলেন ককরোচ জনতা পার্টির দুই শীর্ষ নেতা
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের রাজধানী দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তরমন্তরে আর কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রতিবাদী সমাবেশের আয়োজন না করার সুনির্দিষ্ট ও কঠোর শর্তে দীর্ঘ সাত দিন কারাভোগের পর অবশেষে মুক্তি লাভ করেছেন উদীয়মান রাজনৈতিক দল ককরোচ জনতা পার্টির দুই অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা।

 

বুধবার, ২১ অক্টোবর, দিল্লির একটি বিচারিক হাকিম বা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতে ওই নির্দিষ্ট স্থানে কোনো ধরনের আন্দোলনের ডাক না দেওয়ার লিখিত ও মৌখিক প্রতিশ্রুতি প্রদানের পর বিচারক তাদের জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন।

 

এর মধ্য দিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দিল্লির রাজনৈতিক অঙ্গনে যে তীব্র উত্তেজনা ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছিল, তার একটি সাময়িক অবসান ঘটল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। যন্তরমন্তর দীর্ঘকাল ধরে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের এক অবিচ্ছেদ্য কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত।

 

তবে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে ওই এলাকায় সব ধরনের জমায়েত ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে প্রশাসন।

 

ককরোচ জনতা পার্টির এই দুই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল, তারা প্রশাসনের এই সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ওই স্পর্শকাতর এলাকায় দলীয় কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করেছিলেন, যা জনমনে আতঙ্ক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারত।

 

ঘটনার সূত্রপাত হয় চলতি মাসের শুরুর দিকে। গত ১০ অক্টোবর ককরোচ জনতা পার্টির পক্ষ থেকে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানের কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছিল।

 

দলটির দাবি ছিল, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে যে ধরনের অভিযোগ উঠেছে, তাতে তার স্বপদে বহাল থাকা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।

 

এই দাবির সপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে এবং নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তারা যন্তরমন্তরে দেশব্যাপী কর্মী-সমর্থকদের জড়ো হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু দিল্লির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন কোনোভাবেই এই সমাবেশ সফল হতে দিতে রাজি ছিল না।

 

প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওইদিন যন্তরমন্তর এবং এর আশপাশের এলাকায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়। কাউকে সমাবেশস্থলে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, আন্দোলনকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার লক্ষ্যে পুলিশ আগাম পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

 

দলটির প্রধান নেতা অভিজিৎ দীপ এবং তার দুই বিশ্বস্ত সহযোগী সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে দিল্লির বিমানবন্দর এলাকা থেকেই আকস্মিকভাবে আটক করা হয়। মূলত নেতৃত্বহীন করে দিয়ে আন্দোলনকারীদের মনোবল ভেঙে দেওয়াই ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান উদ্দেশ্য।

 

অবশ্য প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর পরদিন তাদের সকলকেই মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। আটক অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর পরই দলটির প্রধান অভিজিৎ দীপের জীবনে এক মর্মান্তিক ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নেমে আসে। তার শ্রদ্ধেয়া দাদি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

এই গভীর শোকের মুহূর্তে রাজনৈতিক কর্মসূচির চেয়ে পরিবার ও স্বজনদের পাশে থাকাকেই তিনি অধিক গুরুত্ব দেন এবং সাময়িকভাবে নিজেকে আন্দোলনের মাঠ থেকে সরিয়ে নিয়ে নিজ বাড়িতে চলে যান।

 

একজন নেতার জীবনে ব্যক্তিগত শোক এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার যে মানসিক দ্বন্দ্ব, তা অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে মোকাবেলা করেছিলেন অভিজিৎ। কিন্তু শীর্ষ নেতার এই সাময়িক অনুপস্থিতি সত্ত্বেও ককরোচ জনতা পার্টির অন্য দুই সহ-প্রতিষ্ঠাতা সৌরভ এবং আশুতোষ তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থাকেন।

 

গত ১৩ অক্টোবর, প্রশাসনের রক্তচক্ষু ও কড়া নজরদারি উপেক্ষা করে সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে যন্তরমন্তরে উপস্থিত হন। সেখানে তারা তাদের দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন, যা ছিল রাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিবাদ।

 

তাদের এই আকস্মিক পদক্ষেপে প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী হতবাক হয়ে যায়। দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তাদের দুজনকেই পুনরায় গ্রেপ্তার করে। এবার আর তাদের সহজে ছেড়ে দেওয়া হয়নি, বরং বিস্তারিত তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের পুলিশি হেফাজতে বা রিমান্ডে নেওয়া হয়।

 

এই ঘটনা ককরোচ জনতা পার্টির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে। সহকর্মীদের এই অন্যায্য গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে এবং নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের মূল দাবিকে আরও বেগবান করতে শোক কাটিয়ে ফিরে আসেন দলীয় প্রধান অভিজিৎ দীপ।

 

তিনি ১৫ অক্টোবর দিল্লির প্রাণকেন্দ্র সেন্ট্রাল পার্কে এক বিশাল 'পতাকা উড়াও' কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তার এই ঘোষণায় নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। ওইদিনও পুলিশ অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে এবং সেন্ট্রাল পার্ক এলাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে।

 

অভিজিৎ দীপকে তার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে না দিয়ে সমাবেশস্থল থেকেই পুনরায় আটক করা হয়। যদিও পরের দিনই অভিজিৎকে মুক্তি দেওয়া হয়, কিন্তু তার দুই সহযোগী সৌরভ এবং আশুতোষকে কারাগারেই আটকে রাখা হয়।

 

প্রশাসনের এই দ্বৈত নীতি নিয়ে সে সময় নাগরিক সমাজে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। অবশেষে দীর্ঘ আইনি লড়াই ও টানাপোড়েনের পর বুধবার তাদের দিল্লির উচ্চ আদালত ও পরবর্তীতে বিচারিক হাকিম আদালতে হাজির করা হয়।

 

শুনানিকালে আদালতের বিচারক অত্যন্ত গুরুগম্ভীর পরিবেশে দুই নেতার প্রতি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন। আদালত তাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, যন্তরমন্তরের মতো একটি স্থানে, যেখানে সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেখানে জোরপূর্বক জমায়েত করার চেষ্টা করা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

 

বিচারক অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তাদের কাছে জানতে চান, তাদের এই বেআইনি কর্মসূচির কারণে যদি সেখানে কোনো ধরনের সহিংসতা বা অপ্রীতিকর ঘটনার সৃষ্টি হতো, তবে সাধারণ মানুষের জানমালের যে ক্ষয়ক্ষতি হতো, তার দায়ভার কি তারা নিজেদের কাঁধে তুলে নিতেন?

 

একজন রাজনৈতিক নেতার দায়িত্ব কেবল অধিকার আদায়ের আন্দোলন করা নয়, বরং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকাও তাদের নৈতিক কর্তব্য বলে আদালত মন্তব্য করেন।

 

আদালতের এই তীক্ষ্ণ ও যৌক্তিক প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করেন। তারা বুঝতে পারেন যে, আইনি কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

 

দীর্ঘ আলোচনার পর তারা আদালতের কাছে বিনম্রভাবে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন যে, ভবিষ্যতে তারা যন্তরমন্তরে আর কোনো ধরনের আন্দোলনের ডাক দেবেন না বা এমন কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করবেন না যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে।

 

তাদের এই নিঃশর্ত প্রতিশ্রুতি ও মুচলেকা প্রদানের পরই বিচারক তাদের জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন এবং দীর্ঘ সাত দিনের কারাবাসের পর তারা মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই পুরো ঘটনাপ্রবাহকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে।

 

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মধ্যে যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন, দিল্লির এই ঘটনা তা পুনরায় প্রমাণ করল। ককরোচ জনতা পার্টি তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ভবিষ্যতে কোন পথ অবলম্বন করে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো দেশ।

 

- এনডিটিভি