আগামী ১ নভেম্বর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে এই সুবিশাল গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। দেশের অন্যতম উদীয়মান এবং প্রতিবাদী রাজনৈতিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি (CJP) আনুষ্ঠানিকভাবে এই সরকারবিরোধী সমাবেশের প্রতি তাদের পূর্ণাঙ্গ এবং নিঃশর্ত সমর্থন ব্যক্ত করেছে।
নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সমুন্নত রাখার এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে সিজেপির এই সমর্থন ভারতের বিরোধী রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বুধবার, ২৮ অক্টোবর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক এবং বিস্তারিত বিবৃতিতে সিজেপির প্রধান আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে ইন্ডিয়া জোটের এই রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রতি তার দলের জোরালো সমর্থন নিশ্চিত করেন।
তিনি তার বিবৃতিতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান যে, ভারতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং সবার জন্য অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার দাবিতে বিরোধী দলগুলোর চলমান এই গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের প্রতিটি পদক্ষেপে সিজেপি তাদের পাশে অবিচল রয়েছে।
নিজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া ওই পোস্টে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে লেখেন, ‘জ্ঞানুকে (সিইসি জ্ঞানেশ কুমার) অবশ্যই তার পদ থেকে সরে যেতে হবে... কারণ দেশের স্বার্থ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সবার ওপরে।’
অভিজিৎ দিপকের এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনগুলোও চরমভাবে আস্থা হারিয়েছে।
সিজেপি তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নির্বাচন কমিশনের চালু করা বিশেষ নিবিড় পর্যালোচনা বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ এবং প্রবল আপত্তি প্রকাশ করেছে। দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের আশঙ্কা, এই বিতর্কিত প্রক্রিয়ার আড়ালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অসংখ্য যোগ্য এবং বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারে।
দলটির মতে, সর্বজনীন ভোটাধিকার হলো যেকোনো কার্যকর গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অলঙ্ঘনীয় ভিত্তি। দেশের প্রতিটি নাগরিকের এই পবিত্র অধিকার সুরক্ষায় ভারতের নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত নিরপেক্ষতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা অপরিহার্য।
নির্বাচন কমিশন যদি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে, তবে তা পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। গণতন্ত্রের মূল চেতনা ও দর্শনকে ধারণ করে সিজেপির বিবৃতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মন্তব্য করা হয়।
সেখানে বলা হয়, প্রকৃত গণতন্ত্রে দেশের স্বাধীন জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের পছন্দের সরকার নির্বাচন করে থাকে; কোনো অবস্থাতেই ক্ষমতাসীন সরকার নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী ভোটারদের বেছে নিতে পারে না।
সিজেপি দৃঢ়ভাবে দাবি করেছে যে, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গণতন্ত্রের এই মৌলিক এবং সার্বজনীন নীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের মতে, ভারতের নির্বাচন কমিশনের হারানো স্বাধীনতা, সাংবিধানিক মর্যাদা এবং সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পুনরায় ফিরিয়ে আনতে বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ করা রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে অপরিহার্য।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে সিজেপির ওই বিবৃতিতে ভারতের সংবিধান প্রণেতা বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুসহ অন্যান্য দূরদর্শী নেতাদের মহান লক্ষ্যের কথা সবিস্তারে তুলে ধরা হয়।
বিবৃতিতে স্মরণ করা হয় যে, ভারতের সংবিধানের মূল উদ্দেশ্যই ছিল জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে দেশের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের অবাধ ভোটাধিকার নিশ্চিত করা।
স্বাধীন ভারতের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্রের পরিধিকে সমাজের প্রতিটি স্তরে আরও বিস্তৃত করা এবং কাউকেই এই গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত বা বাইরে না রাখা। সিজেপির মতে, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন পদক্ষেপে সংবিধান প্রণেতাদের সেই মূল দর্শন মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।
সিজেপির পক্ষ থেকে সরাসরি অভিযোগ করা হয়েছে যে, এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার নামে মূলত সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ, ভীতি এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করা হয়েছে।
আধুনিক যুগে যেখানে ভোটদান প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, প্রযুক্তি নির্ভর এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করার কথা, সেখানে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার শঙ্কা সাধারণ ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের উৎসাহ কমিয়ে দিচ্ছে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার মহান উদ্দেশ্যে যেসব রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সংগঠন বর্তমানে রাজপথে আন্দোলন করছে, তাদের সবার প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন ও সংহতি জানানোর কথাও দলটির পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
ইন্ডিয়া জোটের সাথে সিজেপির এই রাজনৈতিক ঐক্য বা সমঝোতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এর আগেও ভারতের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনে এই দুই রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে আদর্শিক সম্পর্ক সামনে এসেছে।
বিশেষ করে, সম্প্রতি সিজেপির উদ্যোগে আয়োজিত ‘যন্তর মন্তর ২.০’ নামক ব্যাপক গণআন্দোলনে ইন্ডিয়া জোটের একাধিক শীর্ষ নেতাকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে। রাজনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারসহ বিভিন্ন প্রবীণ ও প্রভাবশালী নেতা ওই প্রতিবাদী আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত হয়েছিলেন।
এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক মিলন প্রমাণ করে যে, দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে বিরোধী শিবির ক্রমশ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। তবে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস সিজেপির সেই ‘যন্তর মন্তর ২.০’ আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেয়নি।
তা সত্ত্বেও, যখন সিজেপির দুই শীর্ষ ছাত্রনেতা আশুতোষ রাঙ্কা এবং সৌরভ দাসকে পুলিশ অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করে, তখন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধী তাদের সমর্থনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোরালো ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
রাহুল গান্ধী তার বার্তায় স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন যে, যন্তর মন্তরের মতো গণতান্ত্রিক প্রতিবাদস্থলে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা কখনোই কোনো অপরাধ হতে পারে না। এই ঘটনার পর থেকেই কংগ্রেস এবং সিজেপির মধ্যে এক ধরনের পরোক্ষ রাজনৈতিক বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
সর্বশেষ, ইন্ডিয়া জোটের ১ নভেম্বরের মেগাসমাবেশে সমর্থন জানানোর মাধ্যমে সিজেপি দেশের বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের প্রশ্নে উভয় পক্ষের অভিন্ন ও শক্তিশালী অবস্থানের কথা আবারও জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরেছে।
তবে রামলীলা ময়দানে অনুষ্ঠিতব্য এই বিশাল সমাবেশে সিজেপির শীর্ষ নেতারা শারীরিকভাবে মঞ্চে উপস্থিত থাকবেন কি না, তা নিয়ে এখনও কিছুটা ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। দলটির প্রধান আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে তার বিবৃতিতে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট এবং স্পষ্ট করে কিছু উল্লেখ করেননি। তবুও, সিজেপির এই নৈতিক সমর্থন ইন্ডিয়া জোটের আন্দোলনকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য এবং বেগবান করবে বলেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।