রাজ্যের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার কাকদ্বীপে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় তিনি প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন যে, বাংলায় ‘মা’-কে কোনোভাবেই ‘আম্মা’ বলা যাবে না এবং ‘জল’ শব্দের পরিবর্তে ‘পানি’ শব্দের ব্যবহার মেনে নেওয়া হবে না।
তার এই অপ্রত্যাশিত ও উসকানিমূলক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, ভাষার প্রতি গভীরভাবে সংবেদনশীল দুই বাংলার সুধীসমাজ, ভাষাবিদ, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, কাকদ্বীপের ওই জনসভায় শুভেন্দু অধিকারী মূলত রাজ্যের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের মানসিকভাবে উজ্জীবিত করার কৌশল গ্রহণ করেছিলেন।
বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি রাজ্যের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। রাজনৈতিক আক্রমণের পাশাপাশি তিনি পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ভাবাবেগ সুকৌশলে উসকে দেওয়ার লক্ষ্যে অভিযোগ করেন যে, অতীতে মহালয়ার পুণ্য তিথিতে মা কালীকে প্রিজন ভ্যানে বা পুলিশের বন্দিবাহী গাড়িতে তোলা হয়েছিল।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আবেগতাড়িত করার এই চেষ্টার ঠিক পরেই তিনি ভাষা-সংক্রান্ত ওই বিতর্কিত হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি অত্যন্ত উচ্চস্বরে ও স্পষ্টভাবে বলেন যে, বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতিতে ‘জল খাব’ কথাটি কোনোভাবেই যেন ভবিষ্যতে ‘পানি খাব’ হয়ে না যায়, এবং পরম শ্রদ্ধার ‘মা’ ডাক যেন ভিনদেশি বা ভিন্ন সংস্কৃতির ‘আম্মা’ ডাকে রূপান্তরিত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে এখন থেকেই সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে।
তার এই বক্তব্য ধারণ করা ভিডিও মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মূলধারার সংবাদমাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজ্যজুড়ে এক অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক, সমাজবিজ্ঞানী এবং সচেতন নাগরিকদের একটি বড় অংশের মতে, বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারীর এই বক্তব্য নিছক কোনো ভাষাতাত্ত্বিক উদ্বেগ বা ভাষার প্রতি বিশুদ্ধ ভালোবাসা থেকে উৎসারিত নয়, বরং এর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক সুগভীর ও সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক উদ্দেশ্য।
তারা মনে করেন, রাজ্যে যখন বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সীমাহীন দুর্নীতি, শিক্ষাখাতে নিয়োগ কেলেঙ্কারি এবং আর্থসামাজিক বৈষম্যের মতো জ্বলন্ত সমস্যাগুলো নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হওয়া সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, ঠিক তখন সাধারণ মানুষের দৃষ্টি সুকৌশলে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্যই ভাষা ও ধর্মকে এক করে ফেলার এই বিপজ্জনক রাজনৈতিক খেলা শুরু হয়েছে।
আসন্ন নির্বাচনে নিজেদের নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক সুরক্ষিত করতে এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে মেরুকরণ বা বিভাজন সৃষ্টি করতেই অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে নির্দিষ্ট কিছু শব্দকে সুনির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে।
‘জল’ ও ‘মা’ শব্দ দুটিকে ‘হিন্দুত্ব’ এবং ‘পানি’ ও ‘আম্মা’ শব্দ দুটিকে ‘মুসলিমত্ব’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার এই অপপ্রয়াসকে সমাজবিজ্ঞানীরা বাংলার হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং মারাত্মক সাংস্কৃতিক বিকৃতি বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ইতিহাস, বিবর্তন ও ভাষাতত্ত্বের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, বাংলা ভাষা কখনোই কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের একান্ত ব্যক্তিগত বা নিজস্ব সম্পত্তি নয়। হাজার বছরের দীর্ঘ বিবর্তনের পথ ধরে বাংলা ভাষা একটি প্রবহমান নদীর মতো নিজের গতিপথ নিজেই তৈরি করে নিয়েছে।
এই দীর্ঘ যাত্রাপথে বাংলা ভাষার মূল স্রোতে এসে মিশেছে সংস্কৃত, প্রাকৃত, পালি, আরবি, ফারসি, তুর্কি, পর্তুগিজ, ইংরেজি এবং নানা দেশীয় ও আদিবাসী শব্দের অগণিত স্রোতধারা। এই বৈচিত্র্যময় শব্দগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত ও সাবলীল মিশ্রণেই বাংলা ভাষা আজ বিশ্বদরবারে এত বেশি সমৃদ্ধ, প্রাণবন্ত ও বৈচিত্র্যময়।
ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, ‘পানি’ শব্দটি কোনোভাবেই বিদেশি শব্দ নয়, বরং এটি মূলত প্রাচীন সংস্কৃত ‘পানীয়’ শব্দ থেকেই উদ্ভূত হয়ে প্রাকৃত ভাষার বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আধুনিক বাংলায় প্রবেশ করেছে।
তাই সম্পূর্ণ দেশজ ও শেকড়সংলগ্ন এই শব্দটিকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মোড়কে আবদ্ধ করার রাজনৈতিক চেষ্টা কেবল অবৈজ্ঞানিকই নয়, বরং ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তনের গৌরবময় ইতিহাসকে সরাসরি অস্বীকার করার শামিল।
বাংলা সাহিত্যের বিশাল ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত ভাণ্ডার ঘাঁটলে এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শব্দমৈত্রীর অগণিত অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়। বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী স্রষ্টারা কখনোই শব্দের গণ্ডিতে ধর্মকে বেঁধে রাখেননি।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে পল্লীকবি জসীমউদ্দীন-সবার কালজয়ী ও জনপ্রিয় রচনাতেই ‘জল’ ও ‘পানি’ শব্দ দুটির অত্যন্ত সাবলীল, শৈল্পিক ও স্বতঃস্ফূর্ত সহাবস্থান রয়েছে। তারা কখনোই ধর্ম বা সম্প্রদায়ের সংকীর্ণ মানদণ্ডে শব্দ নির্বাচন করেননি, বরং যখন যে শব্দটি তাদের কাব্যের মাধুর্য ও ছন্দকে বাড়িয়ে তুলেছে, তারা সেটিই পরম মমতায় গ্রহণ করেছেন।
শুধু সাহিত্যে নয়, গ্রামবাংলার আপামর সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এবং এমনকি সনাতন ধর্মাচরণেও এর অত্যন্ত গভীর ও ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। ভারতের অনেক অঞ্চলে পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে ‘গঙ্গাজল’-এর পাশাপাশি ‘গঙ্গাপানি’ শব্দের বহুল প্রচলন রয়েছে, যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।
এছাড়া মানুষের গভীর আবেগ, সীমাহীন দুঃখ বা বেদনার মুহূর্তে ‘চোখের জল’-এর পাশাপাশি ‘চোখের পানি’ শব্দবন্ধটি দুই বাংলার মানুষের কাছেই সমানভাবে আদৃত ও ব্যবহৃত হয়ে আসছে, যেখানে কোনো ধর্মের বিভেদ নেই।
শুভেন্দু অধিকারীর এই উসকানিমূলক মন্তব্যের পর ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই বাংলার (বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ) ভাষাপ্রেমী মানুষ তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছেন। শিক্ষাবিদ, প্রখ্যাত সাহিত্যিক, গবেষক ও সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা একবাক্যে বলছেন, সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য মাতৃভাষার গায়ে ধর্মের রং মাখানোর এই ঘৃণ্য প্রবণতা সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক।
ভাষা মূলত মানুষের মনের ভাব প্রকাশের একটি সার্বজনীন মাধ্যম, যা একটি সমাজের সব স্তরের মানুষকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করে, তাদের মধ্যে কোনো বিভেদ বা দেয়াল সৃষ্টি করে না।
রাজনৈতিক নেতারা যখন ক্ষমতার মোহে ভাষার স্বাভাবিক গতিপ্রবাহে কৃত্রিম দেয়াল তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন, তখন তা কেবল ভাষার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যকেই নষ্ট করে না, বরং সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহনশীলতাকেও মারাত্মকভাবে বিষাক্ত করে তোলে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোও ভারতের মতো বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে ভাষার এমন রাজনৈতিকীকরণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য, তীব্র মতবিরোধ বা কঠোর সমালোচনা থাকাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত একটি বিষয়।
কিন্তু সেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে মাতৃভাষাকে ব্যবহার করা এবং নির্দিষ্ট কিছু বহুল প্রচলিত শব্দকে বয়কটের ডাক দেওয়া কোনোভাবেই একটি সুস্থ, গণতান্ত্রিক ও পরিপক্ব রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচায়ক হতে পারে না বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য, আর ভাষা হলো সেই মানুষের আত্মপরিচয়। আত্মপরিচয়কে খণ্ডিত করে কখনোই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কল্যাণ অর্জন করা সম্ভব নয়। পরিশেষে, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও এই ভাষা-বিতর্ক রাজ্যের সাধারণ মানুষের সামনে একটি বড় আদর্শিক প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
ভাষার স্বাভাবিক বিকাশকে রাজনৈতিক ফতোয়া দিয়ে রোধ করার ইতিহাস পৃথিবীতে কখনোই সফল হয়নি। বাংলার মানুষ, যারা মাতৃভাষার মর্যাদার জন্য জীবন দেওয়ার মতো গৌরবময় ইতিহাসের অধিকারী, তারা তাদের চিরায়ত প্রজ্ঞা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনা দিয়ে এই ধরনের বিভাজনের রাজনীতিকে চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যান করবে।
রাজনৈতিক নেতাদের সাময়িক হুংকার বা ফতোয়া সাময়িক বিতর্কের জন্ম দিলেও, ভাষার স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ তার নিজস্ব গতিতেই অব্যাহত থাকবে বলেই সুধীসমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।