সেখানে তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শীর্ষ পর্যায়ের এক বৈঠকে মিলিত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। পাকিস্তানের প্রভাবশালী ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন সোমবার তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের এই সম্ভাব্য মস্কো সফরকে সামনে রেখে ইতোমধ্যেই আড়ালে ব্যাপক কূটনৈতিক প্রস্তুতি ও আলাপ-আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। যদিও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা ইসলামাবাদের সরকারি মহল থেকে এই সফরের সময়সূচি বা আলোচ্যসূচি নিয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা প্রদান করা হয়নি, তবুও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই সফরের খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা বৈশ্বিক মেরুকরণের এই যুগে পাকিস্তান ও রাশিয়ার মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের এই যোগাযোগ আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য একটি বিশেষ বার্তা বহন করে। উল্লেখ্য যে, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের এই মস্কো সফরটি মূলত গত মার্চ মাসেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
সে সময় দুই দেশের পররাষ্ট্র দপ্তর এই সফরের যাবতীয় প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করে এনেছিল। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে অপ্রত্যাশিত ও আকস্মিক কিছু কারণে ইসলামাবাদকে ওই সফরটি স্থগিত করতে হয়। মূলত পাকিস্তান সেই সময়ে অভ্যন্তরীণ এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে একসঙ্গে দুটি অত্যন্ত বড় ও জটিল নিরাপত্তা সংকটের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছিল।
একদিকে নিজেদের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং অন্যদিকে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা-এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে পাকিস্তানের পক্ষে তখন রাষ্ট্রপ্রধানের বিদেশ সফর অব্যাহত রাখা সম্ভব ছিল না।
পরবর্তী সময়ে দুই দেশের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের মধ্যে পারস্পরিক কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই সফরের একটি নতুন তারিখ নির্ধারণের বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, যার ধারাবাহিকতায় বর্তমান এই সফরের প্রস্তুতি চলছে।
গত মার্চ মাসে সফর স্থগিত হওয়ার পেছনের মূল কারণগুলোর দিকে আলোকপাত করলে দেখা যায়, তৎকালীন আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি কতটা ভঙ্গুর ও চরম উত্তেজনাকর ছিল। প্রথমত, প্রতিবেশী রাষ্ট্র আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সীমান্ত সংঘাত সেই সময়ে চরম আকার ধারণ করেছিল।
সীমান্তে গোলাগুলি, আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ এবং তালেবান সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা এক নজিরবিহীন হুমকির মুখে পড়ে। দ্বিতীয়ত, ঠিক একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যেও এক ভয়াবহ ও বিস্তৃত সংঘাতের দামামা বেজে ওঠে।
বিশেষ করে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সম্ভাব্য সামরিক অভিযান ও পাল্টা হামলার হুমকিকে কেন্দ্র করে সমগ্র অঞ্চলে এক গভীর ও বহুমুখী সংকট ছড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়।
এমন একটি শ্বাসরুদ্ধকর ও যুদ্ধাবস্থার পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠা প্রতিবেশী দেশ ইরান থেকে অবস্থানরত হাজার হাজার পাকিস্তানি নাগরিককে দ্রুত ও নিরাপদে সরিয়ে আনার বিষয়টিতেই ইসলামাবাদকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হয়েছিল।
ফলে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ ও নাগরিকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই শাহবাজ শরিফের সেই বহু প্রতীক্ষিত মস্কো সফরটি তৎকালীন সময়ের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। তবে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার পর শাহবাজ শরিফের এই আসন্ন মস্কো সফর নতুন করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের সম্ভাব্য মস্কো সফরে দুই দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার পাবে।
স্নায়ুযুদ্ধকালীন বৈরী অতীতকে পেছনে ফেলে পাকিস্তান ও রাশিয়া এখন নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য, বৃহৎ বিনিয়োগ এবং বিশেষ করে জ্বালানি খাতে নিবিড় সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে মনোনিবেশ করেছে।
চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং জ্বালানি ঘাটতিতে ধুঁকতে থাকা পাকিস্তানের জন্য বর্তমানে রাশিয়ার কাছ থেকে তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলোর অব্যাহত ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা রাশিয়ার জন্যও দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের জ্বালানি পণ্য রপ্তানির জন্য নতুন ও নির্ভরযোগ্য বাজার অনুসন্ধান করা সমপরিমাণে গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে এই দুই দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ বর্তমানে একই বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছে। এছাড়া, প্রেসিডেন্ট পুতিন ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যকার এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আফগানিস্তানের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত আলোচনা হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যা পুরো দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান ও রাশিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে একাধিক দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়েছে। এই সম্পর্কের উষ্ণতার একটি বড় প্রমাণ হলো গত ১২ অক্টোবর রাশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভ্লাদিমির কোলোকোলৎসেভের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ইসলামাবাদ সফর।
তার এই সফরের সময় তিনি পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসনের পাশাপাশি শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গেও একাধিক রুদ্ধদ্বার ও গভীর কৌশলগত বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন। এসব বৈঠকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদ দমন, মাদক চোরাচালান রোধ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে তথ্য বিনিময় ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
রুশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত সেই বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক ‘ইতিবাচক অগ্রগতিতে’ গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন।
একই সঙ্গে তিনি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, বিশাল পরিসরে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বহুগুণ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন, যা তার আসন্ন মস্কো সফরের ভিত্তি হিসেবেই কাজ করছে।
তবে দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন থেকে এটিও স্পষ্ট যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তান ও রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক জ্বালানি সরবরাহ, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি খাতের আধুনিকায়ন এবং সার্বিক বাণিজ্য খাতে সহযোগিতার বিপুল ও সম্ভাবনাময় বিভিন্ন দিক নিয়ে বহুবার আলোচনা করলেও, অর্থনৈতিক সম্পর্ককে একটি কাঙ্ক্ষিত ও বিস্তৃত রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনো বেশ কিছু বড় ধরনের ও কাঠামোগত বাধা বিদ্যমান রয়েছে।
এই বাধাগুলো অতিক্রম করতে না পারলে কোনো দেশের পক্ষেই প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফল ঘরে তোলা সম্ভব নয়। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বড় ও জটিল চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার ব্যাংকগুলো বৈশ্বিক লেনদেনের প্রধান মাধ্যম সুইফট (SWIFT) সিস্টেম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে, যার ফলে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানির অর্থ পরিশোধের কোনো কার্যকর, নির্ভরযোগ্য ও মসৃণ পদ্ধতি এখনো গড়ে ওঠেনি।
এর পাশাপাশি, সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থার অভাব, সরাসরি কার্গো ফ্লাইটের সীমাবদ্ধতা এবং বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থার অনুপস্থিতি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। সার্বিক দিক বিবেচনা করে বলা যায়, এই সমস্ত বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের পাহাড় ডিঙিয়ে শাহবাজ শরিফের সম্ভাব্য মস্কো সফরটি যদি শেষ পর্যন্ত সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তবে তা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে শুধু সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়াই নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আফগানিস্তান ইস্যুতে পারস্পরিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি বিনিময়ের এক অনন্য সুযোগ তৈরি করবে।
পশ্চিমা বিশ্বের ওপর একচেটিয়া নির্ভরশীলতা কমিয়ে পাকিস্তান যেভাবে ধীরে ধীরে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতিতে বহুমুখীকরণ আনছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দেয়।
তবে, দুই দেশের সরকার বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই ঐতিহাসিক সফরের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ও আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচি সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকাশ্য ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসায়, পুরো বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন কবে নাগাদ ইসলামাবাদ ও মস্কো থেকে এই সফরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে এবং বিশ্ব রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ঠিক কী দাঁড়ায়।