সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬
১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খাড়গের পদত্যাগ দাবিতে ভারতজুড়ে বিজেপির বিক্ষোভ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম

খাড়গের পদত্যাগ দাবিতে ভারতজুড়ে বিজেপির বিক্ষোভ
ছবি : Collected

ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও চরম উত্তেজনা ও বাগযুদ্ধের সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে ভারতের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের করা একটি বিতর্কিত ও আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে গোটা ভারতজুড়ে তীব্র ও সর্বাত্মক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।

 

কংগ্রেস সভাপতির এহেন মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে তার নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা এবং দলের শীর্ষ পদ থেকে পদত্যাগের জোর দাবি তুলেছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে শুরু করে দেশের প্রধান প্রধান শহর ও রাজ্যগুলোতে এই বিক্ষোভের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে।

 

সোমবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভারতের রাজনৈতিক এই অস্থিরতা ও উত্তেজনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। গত রোববার বিহারের রাজধানী পাটনায় আয়োজিত একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করতে গিয়ে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত মন্তব্য করে বসেন।

 

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক পদক্ষেপ ও নীতির কঠোর সমালোচনা করার একপর্যায়ে তিনি হিন্দি ভাষায় বলে ওঠেন যে, মোদির অহংকার ভেঙে যাবে এবং এই প্রসঙ্গে তিনি আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করেন।

 

তার এই মন্তব্যটি মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমগুলোতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে। দেশের প্রধানমন্ত্রীর মতো একটি সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির সম্পর্কে দেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার এমন মন্তব্য ভারতীয় রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও শালীনতার সম্পূর্ণ পরিপন্থি বলে দাবি করেছে বিজেপি।

 

এর ফলশ্রুতিতে সোমবার সকাল থেকেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে রাজপথে নেমে আসেন বিজেপির হাজার হাজার কর্মী ও সমর্থক। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সোমবার নয়াদিল্লি, মুম্বাই, পাটনা, রাঁচি, কলকাতা, জম্মু এবং বেঙ্গালুরুর মতো ভারতের প্রায় সবগুলো প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ শহরে একযোগে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে ভারতীয় জনতা পার্টি।

 

বিহারের পাটনা এবং জম্মু ও কাশ্মীরে ক্ষুব্ধ বিজেপি কর্মীরা রাস্তায় নেমে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের কুশপুত্তলিকা ও পোস্টার দাহ করেন। এ সময় তারা কংগ্রেস ও খাড়গের বিরুদ্ধে নানা ধরনের স্লোগান দেন এবং অবিলম্বে তার পদত্যাগের দাবি জানান।

 

অন্যদিকে, দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রধান শহর বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়, যেখানে দলের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত থেকে কংগ্রেসের রাজনৈতিক সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করেন।

 

কংগ্রেস সভাপতির এই মন্তব্যের পর বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও বিজেপির অন্যতম শীর্ষ ও প্রবীণ নেতা রাজনাথ সিং এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

 

সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন যে, এই ঘটনাটি ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও হতাশাজনক। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে মর্মান্তিক ও দুর্ভাগ্যজনক বিষয়টি হলো, এই আপত্তিকর মন্তব্যগুলো সাধারণ কোনো কংগ্রেস কর্মী বা তৃণমূল পর্যায়ের কোনো যুব নেতা করেননি, বরং এটি এসেছে এমন একজন ব্যক্তির কাছ থেকে যিনি নিজেকে দেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দলের সর্বভারতীয় সভাপতি হিসেবে দাবি করেন।

 

তার মতো একজন প্রবীণ ও দায়িত্বশীল নেতার মুখ থেকে এ ধরনের শব্দচয়ন কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন যে, একটি বড় ভুল করার পরও কংগ্রেস নেতৃত্ব এখানেই থেমে থাকেনি।

 

তারা মল্লিকার্জুন খাড়গের সেই আপত্তিকর কথাগুলোকে রাজনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত করার এবং এর পক্ষে সাফাই গাওয়ার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের অনুভূতিতে আরও গভীরভাবে আঘাত করছে।

 

নিজেদের ভুল স্বীকার করে অনুশোচনা প্রকাশ করার বদলে কংগ্রেস নেতৃত্ব এই শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্যকে নির্লজ্জভাবে রক্ষা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিজেপির আরেক প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশীও এই বিতর্কে কংগ্রেসের কড়া সমালোচনা করেছেন।

 

তিনি কংগ্রেস নেতৃত্বের মানসিক অবস্থা ও রাজনৈতিক হতাশার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন যে, সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণে কংগ্রেস দলের সবাই এখন অপক্ব, হতাশ ও চরম দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার রাজনৈতিক হতাশা থেকেই তারা এমন অশালীন মন্তব্য করছেন।

 

তিনি আরও বলেন, এত নিচে নেমে তারা মূলত ভারতের চিরায়ত রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতিকেই ধ্বংস করছেন। যেকোনো প্রয়াত পিতা-মাতা বা যিনি আর জনজীবনে বা রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় নেই, এমন কোনো ব্যক্তির নাম রাজনৈতিক বিতর্কে টেনে আনা সম্পূর্ণ অনৈতিক।

 

প্রহ্লাদ জোশী দাবি করেন যে, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গ ও তার রাজনৈতিক দর্শনের প্রভাবের কারণেই কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এমন হতাশাগ্রস্ত ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করতে বাধ্য হয়েছেন।

 

তবে ক্ষমতাসীন দলের এই ব্যাপক সমালোচনা ও বিক্ষোভের মুখে মোটেও নিশ্চুপ বসে নেই কংগ্রেস। তারা বিজেপির এই ক্ষোভকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যায়িত করেছে। কংগ্রেস সভাপতির ছেলে ও কর্ণাটক রাজ্য সরকারের বর্তমান মন্ত্রী প্রিয়াঙ্ক খাড়গে অত্যন্ত কড়া ভাষায় বিজেপির এই প্রতিবাদের জবাব দিয়েছেন।

 

তিনি বিজেপির নেতাদের অতীত কর্মকাণ্ড ও মন্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন যে, আজ যারা নিজেদের অত্যন্ত সংস্কৃতিবান ও শিষ্টাচারের ধারক হিসেবে দাবি করছেন, তারা সুবিধাজনকভাবে ভুলে গেছেন যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অতীতে বিরোধী দলের নেতাদের সম্পর্কে কী ধরনের অশালীন ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছিলেন।

 

প্রিয়াঙ্ক খাড়গে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, ভারতীয় জনতা পার্টির মতো একটি দলের কাছ থেকে তাদের নতুন করে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বা সংস্কৃতি শেখার কোনো প্রয়োজন নেই। এই রাজনৈতিক বিতর্কে কংগ্রেসের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারতের বিরোধী দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত রাজনৈতিক জোট ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA)।

 

বিরোধী জোটের অন্যতম শরিক রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) প্রবীণ নেতা ও সংসদ সদস্য মনোজ ঝা কংগ্রেস সভাপতির মন্তব্যের সমালোচনা করার পাশাপাশি বিজেপির বর্তমান ক্ষোভের দ্বিচারিতা ও দ্বিমুখী নীতি নিয়ে জোরালো প্রশ্ন তুলেছেন।

 

তিনি গণমাধ্যমের ভূমিকা ও বিজেপির অতীত আচরণের কড়া সমালোচনা করে বলেন, অতীতে যখন বিজেপির শীর্ষ নেতারা জনসমক্ষে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী এবং বর্তমান সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেকে নিয়ে অত্যন্ত অশালীন ও অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন, তখন দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যম বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের মধ্যে এমন কোনো ক্ষোভ বা প্রতিবাদ দেখা যায়নি।

 

তিনি অভিযোগ করেন যে, বিজেপি যখন বিরোধী নেতাদের আক্রমণ করে তখন সেটি বাকস্বাধীনতা হিসেবে বিবেচিত হয়, কিন্তু বিরোধীরা কোনো মন্তব্য করলেই তা শিষ্টাচার লঙ্ঘনের ধুয়া তুলে দেশজুড়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করা হয়।

 

সব মিলিয়ে, ভারতের রাজনীতিতে সরকারি দল ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে এই চলমান বাগযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে এবং বিভিন্ন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ ধরনের আক্রমণাত্মক বক্তৃতা ও ব্যক্তিগত আক্রমণ ভারতের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও বেশি উত্তপ্ত ও মেরুকৃত করে তুলছে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে দলগুলোর মধ্যে এই ধরনের বাকযুদ্ধ আরও তীব্র রূপ ধারণ করতে পারে, যা বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য মোটেও ইতিবাচক সংকেত নয়।

 

- এনডিটিভি