রবিবার, নভেম্বর ১, ২০২৬
১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বিশাল বিক্ষোভ, কড়া নিরাপত্তা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:১৩ পিএম

দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বিশাল বিক্ষোভ, কড়া নিরাপত্তা
ছবি : Collected

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথ আজ এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক উত্তাপ ও তীব্র উত্তেজনার সাক্ষী হচ্ছে। দেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত শক্তিশালী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের ডাকে আজ রোববার ভোর থেকেই ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দান অভিমুখে জড়ো হতে শুরু করেছেন লাখো জনতা ও সাধারণ সমর্থক।

 

ভারতের মতো বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এই বিশাল ও সর্বাত্মক প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। বিরোধী শিবিরের মূল ও এক দফা লক্ষ্য হলো বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ নিশ্চিত করা।

 

ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ নামক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক মাত্রায় অনিয়ম, কারচুপি এবং সরকারদলীয় পক্ষপাতিত্বের গুরুতর অভিযোগ এনে ‘চলো দিল্লি’ বা ‘দিল্লি চলো’ নামক এই সুবিশাল কর্মসূচির সূচনা করেছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন এই বিরোধী জোট।

 

দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের মতো একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানের বিরুদ্ধে এমন সুসংগঠিত গণ-আন্দোলন নিঃসন্দেহে ভারতের সমসাময়িক রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

 

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনার সবচেয়ে প্রাথমিক শর্ত হলো একটি ত্রুটিমুক্ত এবং শতভাগ যাচাইকৃত ভোটার তালিকা। কিন্তু ইন্ডিয়া জোটের শীর্ষ নেতাদের অভিযোগ, সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ভোটার তালিকার যে বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, সেখানে বিরোধী দলের অসংখ্য বৈধ ভোটারের নাম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।

 

এর বিপরীতে ক্ষমতাসীনদের অনুকূলে ভুয়া বা ভুতুড়ে ভোটার যুক্ত করার মতো অগণতান্ত্রিক কার্যক্রম নির্লজ্জভাবে প্রশ্রয় পেয়েছে বলে তারা মনে করছেন। বিরোধী দলগুলোর দাবি, নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদেই এই নীরব ভোট ডাকাতির ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে।

 

এই গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতেই তারা আজ রাজপথে নেমেছেন নিজেদের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার তাগিদে। তাদের মতে, নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ পদে এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তির অবস্থান ভারতের পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

 

রোববারের এই মেগাসমাবেশকে কেন্দ্র করে গোটা ভারতবাসীসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর নজর এখন দিল্লির দিকে নিবদ্ধ। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধী নয়াদিল্লির কেন্দ্রস্থল কনট প্লেস ও মিন্টো রোডের ঐতিহাসিক সংযোগস্থল থেকে এক বিশাল প্রতিবাদী মিছিলের নেতৃত্ব দিয়ে সমাবেশস্থলের দিকে অগ্রসর হবেন বলে দলীয় সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

শুধু প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস নয়, বরং ইন্ডিয়া জোটের শরিক দলগুলোর শীর্ষ ও হেভিওয়েট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এই কর্মসূচিকে এক অনন্য রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই মহা মিছিলে সশরীরে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

 

একই সাথে উত্তরপ্রদেশের শক্তিশালী রাজনৈতিক দল সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, তেলেঙ্গানার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা রেবন্ত রেড্ডি এবং ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনসহ অন্যান্য বিরোধী দলীয় শীর্ষ নেতাদেরও এই প্রতিবাদ মিছিলে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে।

 

এতগুলো ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের একমঞ্চে উপস্থিতি ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বিরোধীদের ইস্পাতকঠিন ঐক্যের এক জোরালো বার্তাই বহন করছে।

 

বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এই বর্ণাঢ্য ও প্রতিবাদী মিছিলগুলোর চূড়ান্ত গন্তব্যস্থল হলো দিল্লির রামলীলা ময়দান, যেখানে এক বিশাল জনসমাবেশের মাধ্যমে তারা তাদের জোরালো দাবিগুলো দেশবাসীর সামনে তুলে ধরবেন।

 

বিরোধী দলগুলোর এই বিশাল রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজধানীর সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে এক অভূতপূর্ব ও নিশ্চিদ্র রূপ দেওয়া হয়েছে। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি, সহিংসতা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি এড়াতে দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত কঠোর ও সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে।

 

সরকারি সূত্র অনুযায়ী, শুধুমাত্র মূল প্রতিবাদস্থল রামলীলা ময়দান এবং এর চারপাশের এলাকাগুলোতেই প্রায় দশ হাজার সুশিক্ষিত পুলিশ সদস্য এবং আধাসামরিক বাহিনীর জওয়ানদের মোতায়েন করা হয়েছে, যা পরিস্থিতি কতটা সংবেদনশীল তার প্রমাণ দেয়।

 

দিল্লির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, প্রবেশদ্বার এবং রাজপথগুলোতে পুলিশের পক্ষ থেকে ভারী ব্যারিকেড ও কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে এক ধরনের অবরুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, যাতে কোনোভাবেই আন্দোলনকারীরা নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে না পারে।

 

আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে পুরো শহরের সার্বিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য আড়াইশোরও বেশি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। আকাশপথে ড্রোন ক্যামেরার মাধ্যমেও চালানো হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি।

 

বিশাল এই জনস্রোতকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য ট্রাফিক পুলিশ ইতোমধ্যেই দিল্লির একাধিক প্রধান সড়কে সাধারণ যান চলাচল সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ বা বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দেওয়ার নির্দেশিকা জারি করেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক যাতায়াতে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও নিরাপত্তার সর্বোচ্চ স্বার্থে প্রশাসন এই পদক্ষেপকে অপরিহার্য বলে মনে করছে।

 

রামলীলা ময়দানের দিকে অগ্রসর হওয়া জনস্রোতের আকার ক্রমশ বেড়েই চলেছে। বেলা বাড়ার সাথে সাথেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর খণ্ড খণ্ড মিছিল ময়দান প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে শুরু করেছে।

 

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) বা সিপিএম-এর শক্তিশালী ছাত্র সংগঠন স্টুডেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (এসএফআই)-এর একটি বিশাল ও স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল ইতোমধ্যেই তাদের নিজস্ব লাল পতাকায় সুসজ্জিত হয়ে সমাবেশস্থলে পৌঁছে গেছে।

 

তবে এই বিপুল জনসমাগম প্রশাসনের জন্য একটি বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিল্লি পুলিশের দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্যমতে, ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে সর্বোচ্চ পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্ন হাজার মানুষের সুশৃঙ্খল জমায়েত ধারণ করার সক্ষমতা রয়েছে।

 

কিন্তু ইন্ডিয়া জোটের শীর্ষ নেতাদের পক্ষ থেকে অত্যন্ত জোর গলায় দাবি করা হয়েছে যে, তাদের এই ‘চলো দিল্লি’ কর্মসূচিতে সারা দেশ থেকে আগত অন্তত দশ লাখ মানুষের এক বিশাল জনসমুদ্র তৈরি হবে।

 

প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ময়দানের ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলে বা পরিস্থিতি বিন্দুমাত্র নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে, পুলিশ বাধ্য হয়ে সেই অতিরিক্ত ভিড়কে তাদের চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই শহরের বিভিন্ন প্রবেশমুখে বা রাস্তায় আটকে দেবে।

 

এই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে রাজপথে পুলিশের সাথে আন্দোলনকারীদের সরাসরি সংঘাতের এক গভীর শঙ্কা থেকেই যায়। একদিকে যখন বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজপথ উত্তপ্ত করে তুলছে, ঠিক তখনই বসে নেই ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।

 

বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার এই বিশাল কর্মসূচির রাজনৈতিক প্রভাবকে ম্লান করতে এবং রাজপথে পাল্টা রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে একই দিনে, অর্থাৎ রোববারেই দিল্লিতে এক বিশাল পাল্টা মিছিল ও সমাবেশের ডাক দিয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপি।

 

দলটির এই সমাবেশের মূল বিষয়বস্তু হিসেবে অত্যন্ত সুকৌশলে বেছে নেওয়া হয়েছে ভারতের ইতিহাসের অন্যতম এক কলঙ্কজনক অধ্যায়-১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গাকে। ওই মর্মান্তিক দাঙ্গায় নিহত নিরীহ মানুষদের স্মরণ করা এবং সেই সময়ের তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে জনমনে নতুন করে প্রশ্ন তোলাই ক্ষমতাসীনদের আজকের এই কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধীদের নির্বাচন কমিশন বিরোধী আন্দোলন থেকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে এবং প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসকে ঐতিহাসিকভাবে কোণঠাসা করতেই বিজেপি এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আবেগঘন বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।

 

একই দিনে একই শহরে দেশের প্রধান দুটি বৃহৎ রাজনৈতিক শিবিরের এমন পাল্টাপাল্টি এবং বিশাল আয়োজনের কারণে গোটা নয়াদিল্লি এখন এক চরম রাজনৈতিক উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

 

একদিকে বিরোধী জোট ইন্ডিয়া তাদের অস্তিত্ব রক্ষা এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হারানো নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার এক মরণপণ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিজেপি তাদের রাজনৈতিক আধিপত্য যেকোনো মূল্যে ধরে রাখতে এবং বিরোধীদের অতীত দুর্বলতাগুলোকে পুনরায় জনসমক্ষে তুলে ধরতে বদ্ধপরিকর।

 

দুই পক্ষের এই অনড় অবস্থানের কারণে রাজধানীর সাধারণ মানুষের মনে যেমন একদিকে কৌতূহল কাজ করছে, ঠিক তেমনি যেকোনো সময় বড় ধরনের রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কায় এক ধরনের চাপা আতঙ্ক ও ভীতিও বিরাজ করছে।

 

দিন শেষে রাজপথের এই পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক মহড়া ও পেশিশক্তির প্রদর্শন ভারতের আগামী দিনের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে ঠিক কতটুকু প্রভাব ফেলবে, তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। তবে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, রোববারের এই রোমাঞ্চকর ঘটনাপ্রবাহ ভারতের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবেই লিপিবদ্ধ থাকবে।

 

- আনন্দ বাজার