বুধবার, জুলাই ১৫, ২০২৬
৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দাবি বিরোধীদলীয় নেতার

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ জুলাই, ২০২৬, ০৭:১০ পিএম

দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দাবি বিরোধীদলীয় নেতার
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় সংসদকে দেশের অবহেলিত, নিপীড়িত ও সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান। বুধবার জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি সংসদকে মানুষের হতাশা দূর করার এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রধান মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করেন।

 

একই সঙ্গে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা ও সংসদীয় কার্যক্রমে স্পিকারের অভিভাবকত্বকে আরও সুদৃঢ় করার অনুরোধ জানান। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ, দেশজুড়ে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং একটি দুর্নীতিমুক্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সরকারের নীতিগত ও কার্যকর পদক্ষেপের জোর দাবি তুলে ধরেন তিনি।

 

ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা দেশের সমসাময়িক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক নানা সংকট নিয়ে বিস্তারিত ও গঠনমূলক আলোচনা করেন।

 

জাতীয় সংসদের ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক তাৎপর্য তুলে ধরে ড. শফিকুর রহমান বলেন, এই সংসদটি দেশের সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের এক অনন্য স্থান। সংসদের কার্যক্রম যত বেশি সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হবে, দেশের মানুষের মন থেকে হতাশা ততটাই দ্রুত দূরীভূত হবে।

 

এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা ও ভরসা বৃদ্ধি পাবে এবং তারা দেশ গড়ার মহৎ কাজে আরও বেশি মাত্রায় অনুপ্রাণিত হবেন। সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধি ও নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে স্পিকারকে একজন বলিষ্ঠ কাণ্ডারির ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

 

জনগুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের ক্ষেত্রে হতাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সম্প্রতি বেকারত্ব দূরীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো অতীব জরুরি একটি আইন সংসদে পাস হলেও বিরোধী দলের সদস্যরা সেখানে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হয়েছেন।

 

ভবিষ্যতে এ ধরনের অগণতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা পরিহার করে বিরোধী দলের সদস্যদের যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। অন্যথায় কেবল সংসদে উপস্থিত থেকে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ ও সময়ের অপচয় ছাড়া আর কোনো ইতিবাচক ফল আসবে না বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে মন্তব্য করেন।

 

দেশের সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রসঙ্গে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে যেসব মানুষ অকালে প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

 

সাম্প্রতিক এই ভয়াবহ বন্যায় দেশের অন্তত চারটি বিভাগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে চট্টগ্রামের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল সর্বাধিক। নিহতদের পরিবারকে বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

 

অর্থমন্ত্রী চট্টগ্রামের সন্তান হিসেবে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অতিরিক্ত দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতার পরিচয় দেবেন বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে রাজধানী ঢাকার নাজুক পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও ভয়াবহ জলাবদ্ধতা নিয়ে তিনি তীব্র সমালোচনা করেন।

 

তিনি উল্লেখ করেন যে, সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকার রাস্তাঘাট ও নর্দমার দূষিত পানিতে তলিয়ে যায়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দূষিত পানি অনেক সময় সুপেয় পানির সংযোগের সঙ্গে মিশে গিয়ে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

 

ঢাকাকে দেশের প্রধান প্রতিচ্ছবি হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, বিদেশি অতিথিরা রাজধানী দেখেই পুরো দেশ সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা পান। তাই ঢাকাকে দৃষ্টিনন্দন করতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা এবং একটি সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।

 

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রশংসা করে তিনি প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। প্রাথমিক স্তরে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ধর্ম মানুষকে শালীনতা, দেশপ্রেম ও সততা শেখায়।

 

প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং অবহেলিত স্বতন্ত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত উন্নয়নে নজর দেওয়ার তাগিদ দেন তিনি। রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সরকারি অনুদানভুক্ত করার নেতিবাচক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে কেবল মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করার অনুরোধ জানান তিনি।

 

উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে সুষম বণ্টনের দাবি জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি সমতা বিধান করা হয়নি। সংরক্ষিত আসনের সরকারি দলের সদস্যদের বড় অঙ্কের উন্নয়ন তহবিল দেওয়া হলেও বিরোধী দলের কাউকে তা দেওয়া হয়নি।

 

রাজনৈতিক বৈষম্যের কারণে সাধারণ জনগণ যেন তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে কোনোভাবেই বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়টি তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনেন। সরকারি অর্থের অপচয় এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিজেদের নামফলক বসানোর প্রাচীন ও অযৌক্তিক সংস্কৃতির কঠোর সমালোচনা করেন ড. শফিকুর রহমান।

 

তিনি বলেন, জনগণের করের টাকায় নির্মিত কোনো স্থাপনায় নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা রাজনীতিকের নামফলক বসানোর প্রথা চিরতরে বন্ধ হওয়া উচিত। সরকারের পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শত শত কোটি টাকার সরকারি সম্পদ নষ্ট করে নামফলক পরিবর্তনের এই অপরাজনীতি দেশের অর্থনীতির জন্য চরম ক্ষতিকর।

 

আত্মপ্রচারের মোহ থাকলে নিজস্ব অর্থায়নে জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি। দেশের অন্যতম প্রধান ব্যাধি দুর্নীতি দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি জানিয়ে বর্তমান অর্থমন্ত্রীর পূর্ববর্তী সফল কর্মযজ্ঞের প্রশংসা করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী চাইলে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

 

দুর্নীতির শেকড় চিরতরে উপড়ে ফেলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দুর্নীতিবাজদের হাতে হাতকড়া পরিয়ে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনের সাহস না পায়।

 

পরিশেষে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার সরকারি সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানানোর পাশাপাশি সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ বিশেষ উৎসব ভাতা প্রদানের জোর দাবি জানিয়ে তিনি তার অত্যন্ত সময়োপযোগী বক্তব্যের সমাপ্তি টানেন।