বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানী ঢাকার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এই দাবি করেন। বিগত কয়েক দিন ধরে শিক্ষাব্যবস্থা ও পরীক্ষা সংক্রান্ত কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি নিয়ে শিক্ষার্থীদের রাজপথে বিক্ষোভ প্রদর্শনের বিষয়টি জাতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এমন একটি সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এই আন্দোলনের নেপথ্য উদ্দেশ্য, এর প্রভাব এবং সমাধানের উপায় নিয়ে নিজেদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, রাজপথে যারা বর্তমানে আন্দোলন করছেন, তাদের একটি বড় অংশই প্রকৃত শিক্ষার্থী বা পরীক্ষার্থী নন। তার দাবি, কিছু নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গোষ্ঠী নিজেদের প্রকৃত পরিচয় আড়াল করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগকে পুঁজি করে এই আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করেছে।
মূলত বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয়কে কেন্দ্র করে সমাজে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা এবং ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের মাধ্যমে নিজেদের অন্যায্য রাজনৈতিক ফায়দা লোটাই এদের প্রধান লক্ষ্য।
একটি নির্বাচিত সরকারকে রাজনৈতিকভাবে বিব্রত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে বলে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলোর মধ্যে থাকা পরীক্ষা সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়েও বর্তমান সরকার যথেষ্ট সহানুভূতিশীল ও আন্তরিক বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, সাম্প্রতিক সময়ের দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার কারণে যেসব পরীক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি বা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ গভীরভাবে বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
বিশেষ করে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের স্থগিত হওয়া পরীক্ষাগুলো যখন নতুন সময়সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে, তখন এই দুর্যোগ-কবলিত ও বঞ্চিত শিক্ষার্থীরাও সেই একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পূর্ণ সুযোগ পাবেন।
এর পাশাপাশি, পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে থাকা অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের বিষয়টি নিয়েও সরকার কঠোর ও আপসহীন অবস্থানে রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত শুরু করেছে। এই গাফিলতির সঙ্গে যুক্ত দায়ীদের দ্রুত চিহ্নিত করে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সর্বোপরি, শিক্ষার্থীদের যেন কোনো ধরনের একাডেমিক ক্ষতি না হয়, সেজন্য ভুল হওয়া ওই দুটি প্রশ্নের পূর্ণ নম্বর সব পরীক্ষার্থীকে নিঃশর্তভাবে প্রদান করার একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রীর একটি নির্দিষ্ট মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, সেটিরও যৌক্তিক ও সম্মানজনক অবসান হয়েছে বলে মনে করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, শিক্ষামন্ত্রী ইতোমধ্যেই জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে জনপ্রতিনিধিদের সামনে তার ওই মন্তব্যের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
রাষ্ট্রের একজন শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রীর এমন দায়িত্বশীল ও বিনয়ী আচরণের পর এই বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করা বা রাজপথে আন্দোলন দীর্ঘায়িত করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। চলমান এই আন্দোলনকে সরকার কতটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে-এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে জানান যে, এই আন্দোলনকে সরকার খুব একটা বড় ধরনের জাতীয় সংকটের পর্যায়ে ফেলছে না।
তার মতে, ঢাকা শহরের নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থান এবং দেশের দু-একটি জেলায় অত্যন্ত সীমিত পরিসরে কিছু মানুষ জড়ো হয়ে এই প্রতিবাদ জানাচ্ছে। মূলত গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি অতিরিক্ত মাত্রায় প্রচার পাওয়ার কারণেই এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বড় আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে, বাস্তবে এর ব্যাপকতা বা জনসম্পৃক্ততা ততটা জোরালো নয়।
শিক্ষার্থীদের রাজপথ অবরোধ করে সাধারণ জনগণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটানো এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টির কঠোর সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় জেঁকে বসা এক দীর্ঘস্থায়ী অপসংস্কৃতির দিকে ইঙ্গিত করেন।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে সচিবালয়ে গিয়ে ঘেরাও করে জোরপূর্বক দাবি আদায় করা, পরীক্ষা স্থগিত করতে প্রশাসনকে বাধ্য করা কিংবা কোনো ধরনের মেধা যাচাই ছাড়া বিনা পরীক্ষায় পাসের মতো কিছু অনৈতিক ও ক্ষতিকর প্রবণতা তৈরি হয়েছিল।
বর্তমান আন্দোলনেও সেই একই ধ্বংসাত্মক অপসংস্কৃতির একটি ধারাবাহিক প্রতিফলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। অতীত সরকারগুলোর তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, পূর্বতন সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে সস্তা জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে বিনা পরীক্ষায় পাস, উত্তরপত্রে অতিরিক্ত নম্বর প্রদান এবং ঢালাওভাবে সর্বোচ্চ গ্রেড দেওয়ার যে অসুস্থ সংস্কৃতি চালু করা হয়েছিল, তা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ডকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিয়েছে।
বর্তমান সরকার সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে শিক্ষাব্যবস্থাকে টেনে তুলতে এবং একটি টেকসই, আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষাকাঠামো বিনির্মাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো সম্পূর্ণ নকলমুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা, যাতে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে একটি জ্ঞানসমৃদ্ধ ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।
আন্দোলনের সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওর সত্যতা সরাসরি নাকচ করে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচার করা এসব দৃশ্য ও তথ্য মূলত চরম মাত্রার অপপ্রচার। একটি নির্দিষ্ট অসাধু মহল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ছবি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে, অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রকৃত অবস্থান ও ঘটনার সত্যতা সবার সামনেই উন্মুক্ত।
পরিশেষে, এই চলমান আন্দোলনের নেপথ্যে কোনো রাজনৈতিক দল বা নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী সংগঠনের ইন্ধন রয়েছে কি না, এমন একটি স্পর্শকাতর প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, পর্দার আড়ালে যেই থাকুক না কেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং জনগণের জানমালের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও সজাগ রয়েছে।