বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে বাগেরহাটের মোংলায় আয়োজিত এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এই ঘোষণা দেন। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও বেশি গতিশীল, টেকসই ও আধুনিকায়ন করার ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা যে একান্ত অপরিহার্য, সেই বিষয়টি তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।
বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চল, যা দীর্ঘদিন ধরে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে ছিল, সেখানে নতুন শিল্প কারখানা স্থাপন এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এই জ্বালানি করিডোর একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এই বিশাল ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সরকার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার মোংলায় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশের বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণকারী সংস্থা ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ এবং চীনের অন্যতম বৃহৎ ও বিশ্বখ্যাত রাষ্ট্রায়ত্ত নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ‘চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন’ (সিআরসিসি)-এর মধ্যে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতাবিষয়ক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়।
এই ঐতিহাসিক চুক্তির ফলে বাংলাদেশের অবকাঠামো খাত, বিশেষ করে জ্বালানি পরিবহন, বন্দর উন্নয়ন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হতে যাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো মনে করছে।
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষে সিআরসিসির চেয়ারম্যান দাই হেগেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশে আসা একটি উচ্চপর্যায়ের চীনা প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে দীর্ঘ মতবিনিময় করেন।
এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলাকালে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা এবং দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবকাঠামোগত সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর বিশেষ জোর দেন।
তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ তার উন্নয়ন রূপকল্প বাস্তবায়নে চীনকে একটি অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে এবং উভয় দেশই পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদে একসঙ্গে কাজ করতে গভীরভাবে আগ্রহী।
মোংলা সমুদ্রবন্দরের ভৌগোলিক অবস্থান এবং এর অপার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রতি একটি বিশেষ ও আকর্ষণীয় আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলে যে বিশাল শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা কাজে লাগাতে চীনা উদ্যোক্তাদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসা উচিত।
এই বন্দরটি ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য খুব সহজেই আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা সম্ভব হবে, যা একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য লাভজনক হবে এবং বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে ব্যাপক অবদান রাখবে।
মোংলা কেন্দ্রিক এই অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে উন্নত প্রযুক্তির কারখানা, ভারী শিল্প এবং আধুনিক সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চীনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও কারিগরি দক্ষতা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের বিভিন্ন দিক বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি জানান, মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন যে, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে এই নিবিড় পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে অদূর ভবিষ্যতে এদেশে বিপুল পরিমাণ প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ, আধুনিক শিল্পায়ন এবং বিশ্বমানের অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক নতুন ও উজ্জ্বল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নিরাপদ, বাধাহীন ও অত্যন্ত ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস করে খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিনিয়োগের সব ধরনের ছাড়পত্র প্রদানের বিষয়ে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
এই আনুষ্ঠানিক বৈঠকের একটি অত্যন্ত মানবিক ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দিকও উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিপুল সংখ্যক দক্ষ ও আধা-দক্ষ বাংলাদেশি জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে অব্যাহত সহযোগিতার জন্য সিআরসিসি ও চীনা প্রতিনিধিদলকে বিশেষ ও আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এটি একটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ও সফল ত্রিপক্ষীয় মডেল, যেখানে চীনের প্রযুক্তি ও পুঁজি এবং বাংলাদেশের পরিশ্রমী মানবসম্পদ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে একসঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ করছে।
এর ফলে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, ঠিক তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের শ্রমিকদের দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতাও নতুন করে প্রমাণিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, আগামী দিনগুলোতেও জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে চীনের এই ধরনের গঠনমূলক ও ইতিবাচক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে, যা দুই দেশের মানুষের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে।
পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের দিনটিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যাত্রার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ঐতিহাসিক ও আনন্দের একটি দিন হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
একটি স্বনির্ভর, উন্নত ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দেশকে দাঁড় করানোর যে নিরন্তর প্রচেষ্টা বর্তমান সরকার চালিয়ে যাচ্ছে, সেই উন্নয়ন অভিযাত্রায় বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে এগিয়ে আসায় তিনি উপস্থিত চীনা প্রতিনিধিদল এবং সব চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মোংলা থেকে উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত জ্বালানি নিরাপত্তার এই নতুন রূপরেখা যদি সঠিক সময়ে এবং সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি কেবল ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলের চেহারা পাল্টে দেবে না, বরং সমগ্র বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক অভাবনীয় ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে, যা দেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করবে।