এক গুরুতর আহত রোগীর শরীরের গভীর ক্ষতস্থানে ভাঙা কাঁচের বড় টুকরো রেখেই অবহেলাভরে সেলাই করে দেওয়ার মতো ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে ওই হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্মীদের বিরুদ্ধে। এই অকল্পনীয় চিকিৎসা-বিভ্রাটের কারণে রোগীকে দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে অসহনীয় শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, জীবনঘাতী এই চরম অবহেলার ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে কেবল ‘দুঃখিত’ বা দুঃখপ্রকাশ করেই নিজের দায়বদ্ধতা এড়ানোর চেষ্টা করেছেন, যা স্থানীয় সচেতন মহল ও নাগরিক সমাজের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।
অমানবিক এই চিকিৎসাবিল্রাটের শিকার হওয়া ভুক্তভোগী ব্যক্তির নাম সাইদার আলী। তিনি কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার মজিদেরপাড় এলাকার খয়রুদ্দিনের ছেলে। পেশায় একজন ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক সাইদার আলী তার প্রতিদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থে কোনোমতে পরিবারের ভরণপোষণ চালিয়ে আসছিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত পঁচিশে সেপ্টেম্বর। প্রতিদিনের নিয়ম অনুযায়ী সেদিনও তিনি তার উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম ব্যাটারিচালিত রিকশাটি নিজ ঘরের সামনে বৈদ্যুতিক সংযোগের মাধ্যমে পুনরায় সচল করার জন্য প্রস্তুত করছিলেন। আকস্মিকভাবেই সেখানে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে যায়।
বিদ্যুৎ সংযোগ চলাকালীন কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সাইদার আলীর স্ত্রী ও সন্তান হঠাৎ করেই রিকশার ধাতব কাঠামোর সঙ্গে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আটকে যান। চোখের সামনে নিজের স্ত্রী ও সন্তানের এই প্রাণঘাতী পরিস্থিতি দেখে সাইদার আলী দিশেহারা হয়ে পড়েন।
পরিবারকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ছুটে যান প্রধান বৈদ্যুতিক সুইচটি বন্ধ করার জন্য। প্রধান সুইচটি বন্ধ করার এই মরণপণ চেষ্টার মুহূর্তেই ঘটে যায় আরেক বিপত্তি।
তাড়াহুড়ো ও প্রবল মানসিক চাপের মধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে সাইদার আলী ঘরের ভেতরে থাকা একটি কাঁচের আলমারিতে সজোরে ধাক্কা খান। মুহূর্তের মধ্যে আলমারির কাঁচ ভেঙে চুরমার হয়ে যায় এবং কাঁচের বড় বড় ধারালো টুকরো তার বাম হাতে গভীরভাবে বিদ্ধ হয়।
শরীর থেকে প্রবল বেগে রক্তক্ষরণ শুরু হলে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় প্রতিবেশীরা তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় দ্রুত উদ্ধার করে নিকটস্থ চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী এমন গুরুতর দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে একজন দায়িত্বরত চিকিৎসকের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রোগীর ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে পরবর্তী চিকিৎসা দেওয়ার কথা।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে যে, ওই সংকটময় মুহূর্তে সেখানে কোনো দক্ষ চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না অথবা তারা রোগীর প্রতি যথাযথ মনোযোগ প্রদান করেননি। চিকিৎসকের বদলে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসাসহায়ক কর্মীরা অত্যন্ত অপেশাদার ও দায়িত্বহীনভাবে রোগীর ক্ষতস্থানটি নূন্যতম পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই তড়িঘড়ি করে সেলাই করে দেন এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে হাসপাতাল থেকে বিদায় করে দেন।
সরকারি হাসপাতাল থেকে দেওয়া এই দায়সারা চিকিৎসা যে সাইদার আলীর জীবনে এক অন্তহীন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে, তা তিনি ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেননি। সেলাইয়ের পর ক্ষতস্থান শুকিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে তার বাম হাতের যন্ত্রণার মাত্রা দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে।
পেশায় একজন দিনমজুর হওয়ায় হাতের ওপরই তার পুরো পরিবারের বেঁচে থাকা নির্ভরশীল। কিন্তু এই তীব্র ব্যথার কারণে তিনি যেমন উপার্জনের কাজে ফিরতে পারছিলেন না, তেমনি রাতের পর রাত ব্যথায় কাতরাতে বাধ্য হচ্ছিলেন। ক্ষতস্থানটি ক্রমশ ফুলে উঠতে থাকে এবং সেখানে ভয়াবহ সংক্রমণের লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে।
দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ দিন ধরে তিনি চরম শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করেন। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসার ওপর সম্পূর্ণ আস্থা হারিয়ে এবং নিজের বাম হাতটি চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কায় তিনি বাধ্য হয়ে উন্নত চিকিৎসার সন্ধানে গত ত্রিশে অক্টোবর কুড়িগ্রাম শহরের ‘সেবা’ নামক একটি বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের শরণাপন্ন হন।
শহরের বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোর পর সেখানকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সাইদার আলীর হাতের এই অস্বাভাবিক অবস্থা দেখে চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে ক্ষতস্থানের একটি রঞ্জনরশ্মি পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন। পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে আসার পর চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনরা যা দেখতে পান, তাতে তাদের রীতিমতো বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।
রঞ্জনরশ্মির চিত্রে একেবারে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে যে, সাইদার আলীর বাম হাতের ক্ষতস্থানের গভীর পেশির ভেতরে দুটি বেশ বড় আকারের কাঁচের টুকরো রয়ে গেছে এবং সেই কাঁচ ভেতরে রেখেই বাইরের চামড়ায় সেলাই দেওয়া হয়েছিল।
এই ধারালো কাঁচের টুকরোগুলোই গত এক মাসের বেশি সময় ধরে তার হাতের ভেতরে ক্রমাগত ক্ষত সৃষ্টি করছিল এবং তাকে অবর্ণনীয় যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে চিকিৎসকরা কালক্ষেপণ না করে জরুরি ভিত্তিতে একটি অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
পরবর্তীতে এক সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ দিন পর সাইদার আলীর হাতের ভেতর থেকে সেই প্রাণঘাতী কাঁচের টুকরো দুটি নিরাপদে বের করে আনা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক নীতি ও রোগীর নিরাপত্তার চরম লঙ্ঘনের এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর পুরো কুড়িগ্রাম জেলাজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে।
সরকারি হাসপাতালের জরুরি সেবার এমন বেহাল দশা ও চরম দায়িত্বহীনতা সাধারণ মানুষের মনে প্রবল আস্থাহীনতার জন্ম দিয়েছে। এই অমার্জনীয় চিকিৎসা অবহেলার বিষয়ে যখন চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শীর্ষ কর্মকর্তা, অর্থাৎ স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমিনুল ইসলামের কাছে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়, তখন তার প্রতিক্রিয়া ছিল আরও হতাশাজনক ও দায়সারা।
একজন ঊর্ধ্বতন চিকিৎসা কর্মকর্তা হিসেবে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা বা দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেওয়ার বদলে তিনি অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে কেবল ‘দুঃখিত’ বলে নিজের দায়বদ্ধতা এড়ানোর চেষ্টা করেন।
সংবাদমাধ্যমের সরাসরি প্রশ্নের জবাবে তিনি শুধুমাত্র এতটুকুই জানান যে, ব্যাপারটি সম্পূর্ণ ভুলবশত ঘটে গেছে এবং তিনি এই বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। একজন মুমূর্ষু রোগীর অঙ্গহানি বা মৃত্যুঝুঁকির মতো এমন একটি ভয়াবহ চিকিৎসাজনিত অপরাধের বিপরীতে সরকারি কর্তৃপক্ষের এমন অপেশাদার জবাবদিহি মূলত দেশের প্রান্তিক স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত দুর্বলতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের প্রান্তিক পর্যায়ের চিকিৎসাব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত পদ্ধতিগত ত্রুটি ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির অভাবের একটি অত্যন্ত নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা মানদণ্ড অনুযায়ী, যেকোনো গভীর ক্ষতের ক্ষেত্রে চিকিৎসককে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হয় যে ভেতরে কোনো বাহ্যিক বস্তু রয়ে গেছে কি না। কিন্তু একজন সাধারণ কর্মীর ওপর চিকিৎসকের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া এবং বিনা পর্যবেক্ষণে সেলাই করে দেওয়ার এই প্রবণতা সরাসরি রোগীর মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
স্থানীয় নাগরিক সমাজ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা প্রশ্ন তুলেছেন যে, দেশের সাধারণ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ যদি সরকারি হাসপাতালে গিয়ে এমন জীবনঘাতী অবহেলার শিকার হন, তবে তারা নিরাপদ চিকিৎসার আশায় কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন?
সাইদার আলীর মতো একজন দরিদ্র শ্রমিককে যে দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ দিন কর্মহীন থেকে অবর্ণনীয় শারীরিক কষ্ট সহ্য করতে হলো এবং বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে অস্ত্রোপচার করাতে হলো, সেই অপূরণীয় ক্ষতির দায়ভার কে নেবে?
সাধারণ মানুষের প্রাণের মূল্য কি কেবল একটি দায়সারা ‘দুঃখিত’ শব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? সচেতন মহল এই ঘটনার একটি উচ্চপর্যায়ের ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন এবং ভবিষ্যতে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে যেন এমন ভয়ংকর দায়িত্বহীনতার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।