শুক্রবার (৩১ অক্টোবর, ২০২৫) জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) ৫৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় মির্জা ফখরুল এই কঠোর মন্তব্য করেন। তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন সদ্য গঠিত ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশমালা দেশের প্রধান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে নতুন করে বিতর্ক ও বিভেদ সৃষ্টি করেছে।
বিএনপি মহাসচিব তাঁর বক্তব্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং এর বাস্তবায়নের জন্য প্রণীত ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশমালা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমরা এই কমিশনকে বিশ্বাস করেছিলাম এবং আস্থাশীল ছিলাম যে তারা সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করবে। কিন্তু যখন প্রধান উপদেষ্টার কাছে কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলো, তখন দেখা গেল চুক্তির অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিবর্তিত হয়েছে।”
মির্জা ফখরুল সুস্পষ্টভাবে অভিযোগ করেন, “আমরা যে সব বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিলাম, সেগুলো প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আমাদের সেই আস্থার প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে এবং জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। এমন কাজ আমরা তাঁদের কাছ থেকে কখনোই আশা করিনি।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি আলোচনার মূল বিষয়গুলোই উপেক্ষা করা হয়, তাহলে এই ঐকমত্য কমিশন গঠনের উদ্দেশ্য কী ছিল? এটি ঐক্য নয় বরং বিভেদ বাড়াবে।
দেশের সামনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিভ্রান্তি দূর করার আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশের বিদ্যমান সকল সংকটের সাংবিধানিক সমাধান সম্ভব। তিনি সেই মহলকে সতর্ক করেন, যারা নির্বাচনের পূর্বে গণভোটের দাবি তুলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার চেষ্টা করছে।
বিএনপি মহাসচিব দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “যারা এই বিষয় নিয়ে সমাজে অস্থিরতা তৈরি করছে এবং রাস্তায় গোলমাল করছে- আমি তাদের প্রতি আহ্বান জানাই, দয়া করে জনগণকে আর বিভ্রান্ত করবেন না। জাতি এখন একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছে; এর বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন না।” তিনি পরিষ্কার করে দেন, নির্বাচনের আগে গণভোটের কোনো সুযোগ এই মুহূর্তে নেই; গণভোট নির্বাচনের দিনই দুটি আলাদা ব্যালটের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি সরাসরি কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে, প্রচ্ছন্নভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “একসময় আপনারা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন। এখন দয়া করে জনগণের ভোটের অধিকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন না।” তিনি সতর্ক করে দেন, যারা দেশের মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করবে, তাদের জনগণ অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করবে।
ফখরুল আরও বলেন, “এ দেশের মানুষ কখনো বিশ্বাসঘাতকতা ক্ষমা করে না। এই পথ থেকে সরে আসুন। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুন এবং ভোটের মাধ্যমে জনগণের অধিকার ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করুন। এটাই এই মুহূর্তে সকলের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত।”
সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তাঁর দল সবসময়ই সংস্কারের পক্ষে। তিনি বলেন, “আমরা সংস্কার চাই এবং আমরা ইতোমধ্যেই সেই প্রক্রিয়া শুরু করেছি। আমরা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছি। আমরা কোনো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করিনি- আমরা সম্মত হওয়া সংস্কারগুলো অবশ্যই বাস্তবায়ন করব।” তিনি উল্লেখ করেন, বিএনপিকে সংস্কারবিরোধী দল হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা পুরোপুরি অসত্য ও ভিত্তিহীন।
তিনি অভিযোগ করেন, একটি বিশেষ মহল নির্বাচনকে বিলম্বিত বা বানচাল করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। “একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নির্বাচন বন্ধ করার জন্য মরিয়া। কিন্তু আমরা সামনে এগিয়ে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ,” বলেন তিনি।
ভবিষ্যৎ সরকার গঠন প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব জানান, গত ১৫ বছর ধরে যারা তাঁদের সঙ্গে রাজপথে ছিল, সেই মিত্রদের নিয়েই তাঁরা একটি জাতীয় সরকার গঠন করতে চান। তিনি সমস্ত রাজনৈতিক দলের প্রতি একটি শান্তিপূর্ণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আসুন আমরা এই নির্বাচনকে অর্থবহ করে তুলি। আসুন, জনগণের দ্বারা সত্যিকারভাবে নির্বাচিত একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করি।”
তাঁর বক্তৃতার মধ্য দিয়ে বিএনপি মহাসচিব অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ঐকমত্য কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তাঁর দলের গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং একই সঙ্গে আসন্ন নির্বাচনের গুরুত্ব ও সংস্কারের প্রতি বিএনপির অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। এই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।