শনিবার, জুলাই ১৮, ২০২৬
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টিকা মজুত থাকা সত্ত্বেও হামে ৪১৫ শিশুর মৃত্যু, কারণ অনুসন্ধানে সরকার

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ মে, ২০২৬, ০৬:০৭ পিএম

টিকা মজুত থাকা সত্ত্বেও হামে ৪১৫ শিশুর মৃত্যু, কারণ অনুসন্ধানে সরকার
ছবি: সংগৃহীত

দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৪১৫ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এবং এর সংক্রমণ ইতিমধ্যে দেশের ৫৬টি জেলায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

 

অনাকাঙ্ক্ষিত এই প্রাণহানির পেছনে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় কারও কোনো অবহেলা রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে সরকার একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশে টিকার পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও যথাসময়ে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করতে না পারাই এই মারাত্মক বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।

 

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, দেশে কখনোই হামের (এমআর) টিকার কোনো ঘাটতি ছিল না। এমনকি বর্তমান টিকাদান কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় টিকা গত বছরের সেপ্টেম্বরেই কেন্দ্রীয় গুদামে এসে পৌঁছায়।

 

কিন্তু পূর্বনির্ধারিত টাইফয়েডের টিকা ক্যাম্পেইন, জাতীয় নির্বাচন এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য সহকারীদের টানা কর্মবিরতির কারণে হামের বিশেষ ক্যাম্পেইনটি বারবার পিছিয়ে যায়।

 

ইউনিসেফ এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা মহামারির প্রভাব, বিগত প্রায় পাঁচ বছর ধরে জাতীয় টিকাদান ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত না হওয়া এবং গত এক বছর ধরে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো বন্ধ থাকার কারণে শিশুদের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় ব্যাপক ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা এই প্রাদুর্ভাবকে ত্বরান্বিত করেছে।

 

পরিসংখ্যান বলছে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে শিশুদের অংশগ্রহণের হার উদ্বেগজনকভাবে কমেছে। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে হামের প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়।

 

এর ওপর গত বছরের ডিসেম্বর মাসে পদোন্নতি ও নিয়োগবিধি সংশোধনসহ বিভিন্ন দাবিতে স্বাস্থ্য সহকারীরা দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ রেখে লাগাতার আন্দোলন করেন।

 

বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান সমন্বয়কারী মো. ওয়াসি উদ্দিন রানা জানান, দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তারা ডিসেম্বর মাসজুড়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন, যার ফলে অস্থায়ী কেন্দ্রগুলোতে টিকাদান কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে।

 

ইপিআইয়ের তৎকালীন উপ-পরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদও বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন থাকলেও মাঠপর্যায়ে আন্দোলনের কারণেই মূলত টিকাদানে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়।

 

জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ড. তাজুল ইসলাম বারী মনে করেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরে টিকা আসার পরপরই যদি দ্রুত ক্যাম্পেইন শুরু করা যেত, তবে হয়তো এই ভয়াবহ মৃত্যুঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হতো।

 

পাশাপাশি, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো বন্ধ থাকায় শিশুদের অপুষ্টি ও নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বেড়ে গিয়ে মৃত্যুর হারকে আরও ভয়াবহ রূপ দিয়েছে। সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, দীর্ঘদিন ধরে অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থাকা এবং যথাসময়ে জাতীয় ক্যাম্পেইন না হওয়ার কারণেই আজকের এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

 

উদ্ভূত পরিস্থিতি দ্রুততম সময়ে মোকাবিলা করতে এবং হামে আক্রান্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধানে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (আইইডিসিআর) ইতোমধ্যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।