শিক্ষার্থীদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, বুধবার পরীক্ষা শেষে তাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে একটি লংমার্চ বা দীর্ঘ পদযাত্রা করার কথা ছিল। এই সম্ভাব্য বৃহৎ জমায়েত ও যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে এদিন সকাল থেকেই রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সায়েন্সল্যাবে বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
পরিস্থিতি যেন কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায় এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য পুরো এলাকাটি একটি কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। সায়েন্সল্যাব মোড় এবং এর আশপাশের প্রতিটি প্রবেশপথে পুলিশের সতর্ক প্রহরা লক্ষ্য করা গেছে।
বুধবার দুপুরে সরেজমিনে সায়েন্সল্যাব ও এর সংলগ্ন এলাকাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, সার্বিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বেলা একটার দিকে ঢাকা সিটি কলেজ কেন্দ্র থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে পরীক্ষার্থীরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে ধীরে ধীরে বের হতে শুরু করেন।
পূর্বঘোষিত লংমার্চ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা থাকলেও দুপুর সোয়া একটা পর্যন্ত ওই এলাকায় শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের বড় জমায়েত, প্রতিবাদী মিছিল বা সমাবেশের দৃশ্য একেবারেই চোখে পড়েনি। বরং পরীক্ষার পর শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের কার্যক্রমে অংশ না নিয়ে তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে গেছেন।
এদিন অন্যান্য সাধারণ দিনের তুলনায় পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষমাণ অভিভাবকদের উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি ও চোখে পড়ার মতো। সম্ভাব্য ছাত্র আন্দোলন ও উদ্ভূত পরিস্থিতির আশঙ্কায় অভিভাবকেরা সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরীক্ষা শেষ হওয়া মাত্রই তারা সন্তানদের নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে নিজ নিজ বাসস্থানের উদ্দেশে রওনা হন। ফলশ্রুতিতে, গুরুত্বপূর্ণ ওই এলাকাটিতে বড় ধরনের কোনো যানজট বা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়নি।
উল্লেখ্য, এদিন সকাল দশটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত সারা দেশের আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থীদের পদার্থবিজ্ঞান (তত্ত্বীয়) দ্বিতীয় পত্র, ব্যবসায় শিক্ষা শাখার হিসাববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র এবং মানবিক শাখার যুক্তিবিদ্যা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা অত্যন্ত সুষ্ঠু পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়।
একই সময়ে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আরবি দ্বিতীয় পত্র এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা-২ বিষয়ের পরীক্ষাও পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী কোনো ধরনের ব্যাঘাত ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের এই লংমার্চ ও বিক্ষোভ কর্মসূচির প্রেক্ষাপট মূলত তৈরি হয়েছে দেশব্যাপী চলমান বৈরী আবহাওয়া ও সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে। এর আগে, গতকাল মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে আকস্মিকভাবে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন আন্দোলনরত পরীক্ষার্থীরা।
তারা গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি স্থানে সড়ক অবরোধ করে তাদের দাবিগুলো তুলে ধরেন, যার ফলে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি কর্তৃপক্ষের কাছে উত্থাপন করা হয়েছে।
তাদের প্রথম ও প্রধান দাবি হলো-দেশের বর্তমান দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চলমান এইচএসসি ও সমমানের সব পরীক্ষা অবিলম্বে স্থগিত ঘোষণা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গত ১৩ জুলাই প্রতিকূল আবহাওয়া, অতিবৃষ্টি ও দুর্যোগের কারণে যেসব শিক্ষার্থী পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হতে পারেননি এবং পরীক্ষায় অংশ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের শিক্ষাজীবন যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য বিশেষ ব্যবস্থায় পুনরায় ওই বিষয়ের পরীক্ষার আয়োজন করতে হবে।
সর্বশেষ ও তৃতীয়ত, বর্তমান দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার দায়ভার গ্রহণ করে শিক্ষামন্ত্রী এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন তারা। তবে শিক্ষার্থীদের এই দাবির মুখেও সরকারি সিদ্ধান্তে নীতিগতভাবে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসেনি।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে যে, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে উদ্ভূত বিরূপ পরিস্থিতিতে কেবল চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চলমান পরীক্ষাগুলো আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া দেশের অন্যান্য সব শিক্ষা বোর্ডে পূর্বঘোষিত সময়সূচি ও রুটিন অনুযায়ী যথানিয়মে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বিশেষ বৈঠকেও সার্বিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করার পর একই সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, সরাসরি দুর্যোগপূর্ণ এলাকার বাইরে অন্যান্য অঞ্চলে পরীক্ষা চলমান রাখার সিদ্ধান্তে সরকার সম্পূর্ণ অনড় রয়েছে।
এই অবস্থায় যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রুখতে সায়েন্সল্যাবসহ রাজধানীর মোড়ে মোড়ে পুলিশের এই সতর্ক ও দৃশ্যমান উপস্থিতি জনমনে একদিকে যেমন কৌতূহল সৃষ্টি করেছে, তেমনি নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে প্রশাসনের সর্বোচ্চ তৎপরতাকেও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে। পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে পুলিশ পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।