স্বাস্থ্য খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো এক কারণ দর্শানোর নোটিশের বিপরীতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া ব্যাখ্যা সন্তোষজনক বলে বিবেচিত না হওয়ায় এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবুল হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত একটি সরকারি আদেশের মাধ্যমে এই নির্দেশনার কথা নিশ্চিত করা হয়েছে।
চিকিৎসা সেবার মতো একটি স্পর্শকাতর খাতে এমন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটে গত ২৭ মে সংঘটিত একটি চরম হৃদয়বিদারক ঘটনার মধ্য দিয়ে।
ওই দিন আদ্-দ্বীন হাসপাতালের একটি নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয়জন ফুটফুটে নবজাতক পর্যায়ক্রমে প্রাণ হারায়। এই অকাল ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে।
পরবর্তীতে ওই তদন্ত কমিটির জমা দেওয়া বিস্তারিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, নবজাতকদের ওয়ার্ডটিতে জীবনরক্ষাকারী অক্সিজেনের তীব্র স্বল্পতা বিরাজ করছিল।
এর পাশাপাশি পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম ব্যবস্থাপনাগত অবহেলা ও দায়িত্বহীনতাকেই এই মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়।
এমন স্পর্শকাতর একটি বিষয়ে গাফিলতির অকাট্য প্রমাণ মেলায় নড়েচড়ে বসে দেশের স্বাস্থ্য প্রশাসন। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরপরই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নজিরবিহীন তৎপরতা দেখায়।
হাসপাতালটির বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না এবং কেন তাদের পরিচালনার লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে একটি আনুষ্ঠানিক কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে অধিদপ্তর।
প্রাথমিকভাবে নোটিশের যৌক্তিক জবাব দেওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আরও ৪৮ ঘণ্টার অতিরিক্ত সময় চেয়ে অধিদপ্তরের কাছে লিখিত আবেদন করে।
বর্ধিত সময়সীমা শেষে গত ৯ জুন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের আনুষ্ঠানিক লিখিত জবাব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জমা দেয়। তবে অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখেন যে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া ওই ব্যাখ্যা ও যুক্তি একেবারেই গ্রহণযোগ্য বা সন্তোষজনক নয়।
এর প্রত্যক্ষ পরিণতিতে, ১৯৮২ সালের ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স’-এর ১১(২) (খ) ধারাটি সরাসরি প্রয়োগ করে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের চূড়ান্ত আদেশ জারি করা হয়।
লাইসেন্স বাতিলের এই নির্দেশনার ফলে হাসপাতালটির সার্বিক চিকিৎসা কার্যক্রম মারাত্মক আইনি ও কাঠামোগত সংকটের মুখে পতিত হলো। রোগীর জীবন বাঁচানোর মতো মহান পেশায় অবহেলার কোনো সুযোগ নেই, সরকারের এই পদক্ষেপ মূলত সেই বার্তাই বহন করছে।
তবে জারি করা ওই সরকারি আদেশে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জন্য আইনি প্রতিকার চাওয়ার একটি পথও নিয়মতান্ত্রিকভাবে খোলা রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশের ১২ ধারার সুস্পষ্ট বিধান অনুযায়ী, লাইসেন্স বাতিলের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চাইলে সরকারের কাছে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করার আইনি সুযোগ পাবে।
চিকিৎসা খাতে জবাবদিহি, দায়িত্বশীলতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।