মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক, কঠোর পদক্ষেপ ও মানোন্নয়নের পথে বিএসটিআই

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০৫:২৭ পিএম

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক, কঠোর পদক্ষেপ ও মানোন্নয়নের পথে বিএসটিআই
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি দেশের বাজারে প্রচলিত বেশ কয়েকটি সুপরিচিত ব্র্যান্ডের টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির খবর সাধারণ ভোক্তাদের মাঝে ব্যাপক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত সাম্প্রতিক সমীক্ষায় টুথপেস্টের চৌত্রিশটি নমুনার মধ্যে ছাব্বিশটিতেই অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার সন্ধান পাওয়া যায়।

 

প্রাত্যহিক ব্যবহারের পণ্যে এমন উপাদানের উপস্থিতি সরাসরি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকির ইঙ্গিত দেয়। বিষয়টি জাতীয় পরিসরে আলোচিত হওয়ার পর বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) নড়েচড়ে বসেছে।

 

মঙ্গলবার এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংস্থাটি জানিয়েছে যে, জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় তারা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করছে এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে।

 

ভোক্তাদের যৌক্তিক ভীতি দূর করতে এবং পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করতে বিএসটিআই নিজস্ব উদ্যোগে খোলা বাজার ও কারখানা থেকে নতুন করে টুথপেস্টের নমুনা সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংগৃহীত এসব নমুনা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগারে পুনরায় রাসায়নিক পরীক্ষা করা হবে।

 

সংস্থাটি সুস্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছে যে, এই পরীক্ষায় যদি কোনো পণ্যে নির্ধারিত জাতীয় মানদণ্ডের ব্যত্যয় ঘটে অথবা অননুমোদিত ও ক্ষতিকর উপাদানের সংমিশ্রণ প্রমাণিত হয়, তবে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

জনস্বাস্থ্য নিয়ে আপস করার কোনো সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না বলে সংস্থাটি দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছে। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় সাধারণত পাঁচ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ক্ষুদ্র আকারের অদৃশ্য প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়, যা খালি চোখে শনাক্ত করা কার্যত অসম্ভব।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই অতিক্ষুদ্র কণাকে বর্তমান বিশ্বের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি উদীয়মান সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যদিও মানবদেহে এর সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান। উন্নত দেশগুলো এ বিষয়ে বেশ আগে থেকেই সতর্ক।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালেই টুথপেস্টসহ প্রসাধন সামগ্রীতে ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ ধরনের পণ্যে প্লাস্টিকের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে তাদের অঞ্চলের উৎপাদনকারীদের ২০২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।

 

তবে ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার মতো দেশের মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা কিংবা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও এখন পর্যন্ত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের নির্দিষ্ট গ্রহণযোগ্য মাত্রা বা নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো উল্লেখ নেই।

 

এমনকি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অনিচ্ছাকৃতভাবে থেকে যাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা নির্ধারণের জন্য বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত কোনো একক পরীক্ষাপদ্ধতিও এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বাংলাদেশের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে টুথপেস্টের সার্বিক মান নিশ্চিত করার জন্য ‘বিডিএস ১২১৬:২০১২’ শীর্ষক একটি সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড বলবৎ রয়েছে।

 

সরকারি বিধি অনুযায়ী, বাজারে টুথপেস্ট বিক্রির আগে বিএসটিআই থেকে রাসায়নিক, অণুজীবতাত্ত্বিক এবং সুরক্ষাজনিত পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করে লাইসেন্স গ্রহণ করা আইনত বাধ্যতামূলক। সংস্থাটির এই মানদণ্ডে টুথপেস্ট উৎপাদনে ব্যবহারযোগ্য ৮১টি অনুমোদিত উপাদানের একটি তালিকা দেওয়া রয়েছে, যেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোনো উল্লেখ নেই।

 

যেহেতু বিএসটিআই লাইসেন্স প্রদানের সময় সংশ্লিষ্ট কারখানার সার্বিক মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিবিড়ভাবে যাচাই করে থাকে, তাই দেশে প্রচলিত আইনি কাঠামোর অধীনে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারের কোনো সুযোগ বা বৈধতা নেই।

 

তবে এই পরিস্থিতিতে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে বিএসটিআই। সংস্থাটি মনে করে, কেবল কোনো বেসরকারি গবেষণার প্রাথমিক পরীক্ষায় প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেলেই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করেছে অথবা সেটি মানবদেহের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিকর-বিনা তদন্তে এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবে সমীচীন নয়।

 

একটি বস্তুনিষ্ঠ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য ওই কণার রাসায়নিক ধরন, উৎপত্তিস্থল, পরিমাণ এবং প্রকৃত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আরও গভীর বিশ্লেষণের যৌক্তিক প্রয়োজন রয়েছে। ঠিক এ কারণেই সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি ওই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তাদের পরীক্ষার সম্পূর্ণ তথ্য, পরীক্ষাপদ্ধতি এবং গবেষণার প্রাথমিক উপাত্ত আনুষ্ঠানিকভাবে তলব করেছে।

 

পাশাপাশি উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের কাছ থেকেও ব্যবহৃত কাঁচামাল এবং কৃত্রিম পলিমার ব্যবহারের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও বস্তুনিষ্ঠ আইনি যাচাই-বাছাই ছাড়া তাড়াহুড়ো করে কোনো ব্র্যান্ডকে ঢালাওভাবে অনিরাপদ ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকার পক্ষে মত দিয়েছে সংস্থাটি।

 

ভবিষ্যতের সুরক্ষায় এবং দেশের প্রচলিত মানদণ্ডকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে বিএসটিআই ইতোমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই বহুমাত্রিক কমিটিতে পরিবেশ অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, স্বনামধন্য দন্তচিকিৎসক, শিল্পোদ্যোক্তা, বিশেষজ্ঞ গবেষক এবং ভোক্তা অধিকার প্রতিনিধিদের সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

 

এই সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে টুথপেস্টের বর্তমান বাংলাদেশ মান আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে। বিএসটিআই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, চলমান পর্যালোচনায় পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেলে আগামীতে টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিকর প্লাস্টিক কণার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, মোড়কে প্রতিটি উপাদানের নাম প্রকাশের আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিতকরণ এবং সর্বাধুনিক পরীক্ষাপদ্ধতি সংযোজনের মাধ্যমে দেশের মানদণ্ডকে হালনাগাদ করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

 

- আরএনএস