সোমবার, ২৪ আগস্ট আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি বিস্তারিত পর্যালোচনার পর এই সময়সূচি চূড়ান্ত করে, যা পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ কর্তৃক অনুমোদিত হয়।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান গণমাধ্যমের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সময়সূচির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, আগামী ১৪ মার্চ থেকে পরীক্ষা শুরু হয়ে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত তত্ত্বীয় পরীক্ষাগুলো চলবে।
চূড়ান্ত সময়সূচি ও রুটিন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রথা অনুযায়ী বাংলা (আবশ্যিক) প্রথম পত্রের পরীক্ষার মধ্য দিয়েই শুরু হবে এবারের এসএসসি পরীক্ষা। এরপর ধারাবাহিকভাবে ১৬ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা, ১৮ মার্চ ইংরেজি প্রথম পত্র এবং ২১ মার্চ ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা।
শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যিক বিষয় গণিতের পরীক্ষা নির্ধারিত হয়েছে ২৫ মার্চ। বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য শাখার অন্যান্য মূল বিষয়গুলোর পরীক্ষাও সুনির্দিষ্ট তারিখে অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ৪ এপ্রিল রসায়ন, পৌরনীতি ও নাগরিকতা এবং ব্যবসায় উদ্যোগ বিষয়ের পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে।
পরবর্তীতে ৮ এপ্রিল হিসাববিজ্ঞান এবং ১৩ এপ্রিল জীববিজ্ঞান ও অর্থনীতি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে ১৫ এপ্রিল ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের পরীক্ষার মাধ্যমে তত্ত্বীয় অংশের সমাপ্তি ঘটবে। প্রতিটি তত্ত্বীয় পরীক্ষা প্রতিদিন সকাল ১০টায় শুরু হবে বলে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড নিশ্চিত করেছে।
তত্ত্বীয় পরীক্ষা সমাপ্ত হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। নির্দেশনা অনুযায়ী, ২২ এপ্রিলের মধ্যে সব বিষয়ের ব্যবহারিক পরীক্ষা সম্পন্ন করে অনলাইনের মাধ্যমে নম্বর সংশ্লিষ্ট বোর্ডে পাঠাতে হবে।
ব্যবহারিক পরীক্ষাগুলো পরীক্ষার্থীদের নিজ নিজ কেন্দ্রেই প্রতিদিন সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হবে। তবে সংগীত বিষয়ের পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন নির্দেশনা রয়েছে; তাদের নিজ খরচে প্রয়োজনীয় বাদ্যযন্ত্র ও শনাক্তকারী শিক্ষকসহ নির্ধারিত দিন সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে কেন্দ্রে উপস্থিত হতে হবে।
এবারের পরীক্ষায় মূল উত্তরপত্রের পরিবর্তে সম্পূর্ণ পৃথক ব্যবহারিক খাতা ব্যবহারের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কড়া নির্দেশনা অনুযায়ী, পরীক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে প্রতিটি পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষা শুরুর অন্তত ৩০ মিনিট আগে নিজ নিজ কেন্দ্রে প্রবেশ করে নির্ধারিত আসনে বসতে হবে।
বহুনির্বাচনী (এমসিকিউ) এবং সৃজনশীল বা রচনামূলক অংশের মাঝে কোনো প্রকার বিরতি প্রদান করা হবে না। শিক্ষার্থীদের তত্ত্বীয়, বহুনির্বাচনী ও ব্যবহারিক-প্রতিটি অংশে পৃথকভাবে পাস করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
পরীক্ষা কেন্দ্রের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে শিক্ষা বোর্ড কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রের ভেতরে কেন্দ্রসচিব ব্যতীত অন্য কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা বা পরীক্ষার্থী কোনোভাবেই মোবাইল ফোন আনতে বা ব্যবহার করতে পারবেন না।
তবে পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে বোর্ড অনুমোদিত সাধারণ ক্যালকুলেটর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর ফলাফল প্রকাশের পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে কোনো শিক্ষার্থীর ফলাফলে অসন্তুষ্টি থাকলে তারা ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণের জন্য অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন করার সুযোগ পাবেন।
এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য ও প্রক্রিয়া পরবর্তীতে বোর্ডের নিজস্ব ওয়েবসাইট এবং জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এছাড়া, পরীক্ষা শুরুর অন্তত সাত দিন আগে শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রবেশপত্র সংগ্রহ করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৭ সালের এই পরীক্ষা নিয়ে এর আগে ভিন্ন একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল, যা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। গত ১৪ মে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী বছরের শুরুতেই অর্থাৎ ৭ জানুয়ারি থেকে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা আয়োজনের ঘোষণা প্রদান করেছিলেন।
কিন্তু সরকারের সেই আকস্মিক ঘোষণার পর শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা শুরু হয়। তাদের মূল উদ্বেগের বিষয় ছিল প্রস্তুতির ঘাটতি।
পরবর্তীতে গত ২ জুন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে শিক্ষামন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, অংশীজনদের যৌক্তিক মতামত বিবেচনায় নিয়ে জানুয়ারিতে পরীক্ষা শুরুর সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
তারই ধারাবাহিকতায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবি এবং আসন্ন পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতরের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে পরীক্ষা মার্চ মাসে পিছিয়ে নেওয়ার এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো।
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এবং সেই হিসেবে মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। ঈদের ছুটির পরপরই শিক্ষার্থীরা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে, সেই দিকটি এই রুটিনে প্রতিফলিত হয়েছে।
জানুয়ারিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থী তাদের পাঠ্যক্রম শেষ করে পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পেত না বলে একটি যৌক্তিক আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এর একটি বড় কারণ হলো শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন।
এই ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নতুন শিক্ষাক্রমে পড়াশোনা করলেও, নবম ও দশম শ্রেণিতে উঠে তারা পুনরায় ২০১০ সালে পরিমার্জিত পুরোনো শিক্ষাক্রম অনুসরণ করতে বাধ্য হয়। এর পাশাপাশি নবম শ্রেণিতে তাদের হাতে বই পৌঁছাতেও বেশ কিছুটা বিলম্ব হয়েছিল।
ফলে পাঠ্যক্রম সম্পূর্ণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির জন্য তাদের এই বাড়তি সময়ের একান্ত প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে, একসময় বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারি মাসে এসএসসি এবং এপ্রিল মাসে এইচএসসি পরীক্ষা আয়োজনের একটি দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহ্য ছিল।
কিন্তু বৈশ্বিক করোনাভাইরাস মহামারি এবং পরবর্তীতে দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে জাতীয় শিক্ষাপঞ্জিতে বিশাল পরিবর্তন ও বিপর্যয় নেমে আসে। চলতি বছরেও এসএসসি পরীক্ষা এপ্রিলে এবং এইচএসসি পরীক্ষা জুলাই মাসে শুরু হয়েছে।
আগামী বছরের পরীক্ষা মার্চ মাসে এগিয়ে আনার এই পদক্ষেপটি মূলত দেশের শিক্ষাপঞ্জিকে ধীরে ধীরে তার পুরোনো ও স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনার একটি সুপরিকল্পিত সরকারি উদ্যোগের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।