শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মায়ের জন্মদিনে সাজেক ভ্রমণ হলো না, ডেঙ্গুতে প্রাণ গেল ফুটফুটে শিশু হিয়ার

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:৩৪ পিএম

মায়ের জন্মদিনে সাজেক ভ্রমণ হলো না, ডেঙ্গুতে প্রাণ গেল ফুটফুটে শিশু হিয়ার
ছবি: সংগৃহীত

আসন্ন আঠারোই সেপ্টেম্বর মায়ের জন্মদিনের বিশেষ দিনটিকে ঘিরে আট বছর বয়সী ছোট্ট খায়রাতুন হিয়ার আনন্দের কোনো সীমা ছিল না। পরিবারের সবাইকে নিয়ে মেঘের রাজ্য সাজেকে বেড়াতে যাওয়ার এক গোপন পরিকল্পনা সাজিয়েছিল সে তার বাবার সঙ্গে।

 

মাকে চমকে দিতে পছন্দ করা হয়েছিল বিশেষ কেক, নিজের হাতে তৈরি করেছিল ভালোবাসার রঙিন শুভেচ্ছা কার্ড এবং মায়ের সঙ্গে মিলিয়ে কেনা হয়েছিল নতুন পোশাক। তবে উৎসবের সেই আনন্দঘন মুহূর্ত আসার আগেই প্রাণঘাতী ডেঙ্গু কেড়ে নিল বাবা-মায়ের একমাত্র আদুরে কন্যা হিয়ার প্রাণ।

 

মায়ের সঙ্গে মিলিয়ে পরা সেই নতুন পোশাকের বদলে ছোট্ট শিশুটির শেষ পরিণতি হলো সাদা কাফনের কাপড়ে। রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না-ফেরার দেশে পাড়ি জমায় প্রাণোচ্ছল এই শিশু।

 

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লার দাউদকান্দির বাসিন্দা এবং একটি সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা বাবা খোকন তাঁর একমাত্র মেয়েকে ঘিরেই জীবনের সমস্ত স্বপ্ন বুনেছিলেন। মেয়ের পড়াশোনার সুবিধার কথা বিবেচনা করে সম্প্রতি মিরপুরে স্কুলের পাশেই একটি নতুন ফ্ল্যাট কিনেছিলেন তিনি।

 

সেই ফ্ল্যাটটি গোছানোর কাজ সবেমাত্র শেষ হয়েছিল। মায়ের জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখতে বাবা-মেয়ে মিলে সাজেক ভ্রমণের আগাম প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, কর্মস্থল থেকে ছুটির আবেদনও করে রেখেছিলেন বাবা। টিকিট কাটার ঠিক আগমুহূর্তে পুরো পরিবারের স্বপ্ন তছনছ করে দেয় আকস্মিক অসুস্থতা।

 

গত সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে প্রথমে হিয়ার মা শাহিনা মনা তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হন এবং পরীক্ষায় তাঁর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এর পরদিনই হিয়ার শরীরেও জ্বর আসে এবং রক্ত পরীক্ষায় ডেঙ্গুর জীবাণু ধরা পড়ে।

 

পরিস্থিতি বিবেচনায় মা ও মেয়েকে তাৎক্ষণিকভাবে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের লায়ন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মায়ের রক্তের প্লাটিলেটের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে নেমে গেলেও হিয়ার প্লাটিলেট শুরুতে স্বাভাবিক ছিল।

 

কিন্তু খাবার খেতে না পারা এবং ক্রমাগত বমির কারণে শিশুটির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে স্বজনরা তাকে সেখান থেকে স্থানান্তর করে ধানমন্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করান।

 

নিজের শারীরিক অসুস্থতা ভুলে অসুস্থ মা-ও দ্রুত ছাড়পত্র নিয়ে ছুটে আসেন মেয়ের শয্যাপাশে। তবে গত রাতে হিয়ার খিঁচুনি ও বমি তীব্র আকার ধারণ করলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত লাইফ সাপোর্টে নেন।

 

শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা এবং বাবা-মায়ের বুকফাটা প্রার্থনা ব্যর্থ করে দিয়ে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ছোট্ট হিয়া। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডিতেই হিয়া তার সহপাঠীদের মাঝে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রিয়মুখ হয়ে উঠেছিল।

 

মিরপুর মনিপুর স্কুলের শিক্ষার্থী হিয়ার সঙ্গে আসাদগেট ওয়াইডব্লিউসিএ স্কুলের শিক্ষার্থী সুহায়লা জাইমার ছিল গভীর বন্ধুত্ব। স্কুল আলাদা হলেও তাদের মধ্যকার হৃদ্যতা ও নিয়মিত যোগাযোগে কোনো কমতি ছিল না। বন্ধুর সংকটাপন্ন অবস্থার খবর শুনে সকালে ঘুম থেকে উঠেই সুস্থতার জন্য বিশেষ প্রার্থনা করেছিল জাইমা।

 

কিন্তু বিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার মাঝেই আসে হিয়ার মৃত্যুর দুঃসংবাদ। হাসপাতালে ছুটে এসে নিথর বন্ধু আর শোকাতুর বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে অবুঝ শিশুটি। শৈশবের এমন অকাল প্রস্থান আর কখনো একসঙ্গে বড় না হতে পারার বেদনা উপস্থিত সকলকেই অশ্রুসজল করে তোলে।

 

হাসপাতালের আইসিইউর সামনে তখন এক হৃদয়বিদারক নীরবতা বিরাজ করছিল। মেয়েকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ ও স্তব্ধ হয়ে পড়া বাবা খোকন একপর্যায়ে তীব্র আহাজারি করে ওঠেন। যে মেয়েকে নিয়ে সাজেক পাহাড়ের চূড়ায় ঘুরে বেড়ানোর কথা ছিল, তার নিথর দেহ অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনসহ উপস্থিত অন্য রোগীর স্বজনেরাও।

 

চোখের জলে পরম মমতায় নাতনিকে শেষ বিদায় জানান শোকস্তব্ধ নানা। রাজধানীতে মশার বিস্তার ও ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপে প্রায় প্রতিদিনই হিয়াদের মতো অসংখ্য নিষ্পাপ ও সম্ভাবনাময় প্রাণ অকালে ঝরে পড়ছে। স্বজন হারানোর এই অন্তহীন মিছিলে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।

 

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং মশক নিধন কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে আবারও বড় ধরনের প্রশ্ন তুলছেন ভুক্তভোগী নাগরিকরা। লোকদেখানো উদ্যোগের পরিবর্তে স্থায়ী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে ডেঙ্গুর এই ভয়াল থাবা রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।