অত্যন্ত বেদনদায়ক এই পরিসংখ্যানের মধ্যে শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাতেই ৭ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। একই সময়ের মধ্যে সারা দেশে নতুন করে আরও ৯৪৫ জন শিশু এই মারাত্মক ভাইরাসে বা এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ নিয়মিত প্রতিবেদন থেকে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি শিশুদের জন্য এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া পরিসংখ্যান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে ২৫ জুন সকাল আটটা পর্যন্ত সারা দেশে ব্যাপক আকারে এই রোগের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। এই সময়ের মধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে এবং এর উপসর্গ নিয়ে সর্বমোট ৬৯৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এর মধ্যে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৯৩ জন শিশু। অন্যদিকে, হামের সুস্পষ্ট উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও নানা কারণে পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি বা ফল আসার আগেই মারা গেছে এমন হতভাগ্য শিশুর সংখ্যা ৬০৫ জন।
মৃত্যুর পাশাপাশি সংক্রমণের হারও অত্যন্ত আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। উল্লিখিত সময়ের মধ্যে দেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রমাণ মিলেছে ১১ হাজার ৪৪২ জনের শরীরে। তবে এর চেয়েও ভয়াবহ তথ্য হলো, হামের উপসর্গ নিয়ে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য এসেছে ৯৬ হাজার ৬৫৩ জন।
এই বিপুলসংখ্যক রোগীর হাসপাতালে আগমন দেশের সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর এক অভূতপূর্ব চাপের সৃষ্টি করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংক্রমণ ও মৃত্যুর এই ভয়াবহ মিছিলে সবচেয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে ঢাকা বিভাগ। সারা দেশের মধ্যে এই বিভাগেই আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, শুধুমাত্র ঢাকা বিভাগেই হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে এখন পর্যন্ত ৩১৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা সারা দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেক। অন্যদিকে, এই বিভাগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ১৫৫ জনে।
ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং বিপুল জনগোষ্ঠীর এই রাজধানী শহরে রোগের এত দ্রুত বিস্তার স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। তারা মনে করছেন, দ্রুত এই সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে চলে যেতে পারে।
দীর্ঘ তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলমান এই স্বাস্থ্য সংকটে দেশের অসংখ্য পরিবার তাদের আদরের সন্তানকে হারিয়ে একেবারে শোকস্তব্ধ। বিশেষ করে অল্পবয়সী শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম থাকায় তারা খুব দ্রুত এই মারাত্মক ভাইরাসের শিকার হচ্ছে।
হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ হওয়ায় জনবহুল এলাকাগুলোতে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বারবার জোর দিয়ে বলছেন যে, আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন করা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি।
উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর অবহেলা করা বা বাড়িতে রেখে সাধারণ চিকিৎসা দেওয়া অনেক ক্ষেত্রেই মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা জোরালোভাবে সতর্ক করেছেন। সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়মিতভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে দেশবাসীকে সতর্ক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে আজ ২৫ জুন পর্যন্ত সংগৃহীত এই তথ্য মূলত সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সতর্কতার সাথে তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিদিন সকাল আটটায় এই হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করা হয়, যাতে দেশের মানুষ এবং নীতিনির্ধারকরা মহামারির বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা পেতে পারেন। তবে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর মানদণ্ড অনুযায়ী, শুধু পরিসংখ্যান প্রকাশই যথেষ্ট নয়।
এই মহামারি তুল্য পরিস্থিতি থেকে দ্রুত উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি আরও জোরদার করা এবং প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। শিশুদের সুন্দর ও সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবকে যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করতে হবে।