বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশে এক লাখের বেশি শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা শিক্ষামন্ত্রীর

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ জুলাই, ২০২৬, ০৪:০৪ পিএম

দেশে এক লাখের বেশি শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা শিক্ষামন্ত্রীর
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের আভাস দিয়ে দেশজুড়ে এক লাখের বেশি নতুন শিক্ষক নিয়োগের একটি সুবিশাল পরিকল্পনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ডক্টর আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

 

বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ইউনেস্কো আয়োজিত ‘গ্লোবাল পার্টনারশিপ এডুকেশন সিস্টেম ট্রান্সফরমেশন গ্র্যান্ট অ্যান্ড মাল্টিপ্লায়ার গ্র্যান্ট ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এই সুসংবাদটি জাতির সামনে তুলে ধরেন।

 

দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত উন্নয়ন এবং গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগকে সংশ্লিষ্ট মহলে অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী তার বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে জানান যে, এই বিশাল নিয়োগ প্রক্রিয়ার অধীনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অন্তত ৩২ হাজার ৫০০ জন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে।

 

দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা নিরসন করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সম্প্রতি এই নিয়োগের বিষয়ে একটি চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেছে। আপিল বিভাগ সরকারের আবেদন গ্রহণ করায় এখন এই বিপুলসংখ্যক প্রধান শিক্ষক নিয়োগের পথে আর কোনো আইনি বাধা অবশিষ্ট নেই।

 

এর পাশাপাশি, দেশের বিভিন্ন বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আরও প্রায় ৭০ হাজার শিক্ষক ও প্রভাষক নিয়োগের একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। সব মিলিয়ে এক লাখের অধিক শিক্ষক নিয়োগের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ দেশের বেকারত্ব দূরীকরণের পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনে এক নতুন প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করবে বলে শিক্ষামন্ত্রী দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

এদিন সারা দেশে শুরু হওয়া উচ্চমাধ্যমিক বা এইচএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র পরিদর্শন সংক্রান্ত একটি দীর্ঘদিনের প্রথাগত রীতির পরিবর্তনের কথাও শিক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, পরীক্ষা চলাকালীন কেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে পরীক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ওপর এক ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মানসিক চাপ ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।

 

এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এবার মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দলবল নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শনের চিরাচরিত প্রথা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একে একটি বড় ধরনের গুণগত ও মানসিক পরিবর্তন হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব নিয়মে সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা পরিচালনা করবে এবং সরকার কেবল সেখানে প্রয়োজনীয় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে।

 

তবে সুসংবাদের পাশাপাশি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও হতাশাজনক চিত্রও শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক হারে ঝরে পড়ার পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

 

তিনি জানান, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৫ লাখ ৪৪ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও তারা চূড়ান্ত এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাধারণ শিক্ষা ধারায় প্রায় ৩৩ শতাংশ, কারিগরি শিক্ষায় ৫৪ শতাংশ এবং মাদ্রাসা শিক্ষায় ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী মাঝপথেই ঝরে পড়ছে।

 

একটি উন্নয়নশীল দেশের সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এই পরিসংখ্যান কোনোভাবেই সুখকর হতে পারে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থেকে এভাবে ছিটকে পড়ার পেছনের অন্তর্নিহিত কারণগুলো খুঁজে বের করে তা দ্রুত সমাধানের ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন।

 

পাশাপাশি শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত সরকারি ও আন্তর্জাতিক তহবিলের সঠিক ব্যবহারের বিষয়েও মন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। ২০০১ সালে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের নিজস্ব অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, অতীতের সরকারগুলোর আমলে শিক্ষা খাতের উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান গ্রহণ করা হলেও, দুর্নীতির কারণে সেগুলোর যথাযথ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

 

বর্তমান সরকার শিক্ষা খাতের কোনো ধরনের আর্থিক অপচয় বা দুর্নীতি বিন্দুমাত্র বরদাশত করবে না বলে তিনি সুস্পষ্ট বার্তা দেন। পরিশেষে দেশে মানসম্মত শিক্ষার প্রসারে সরকারের মূল ভূমিকার কথা পুনর্ব্যক্ত করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও বেশ কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে।

 

সরকার সরাসরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে একটি সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে চায়। শিক্ষাব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা। অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ দেশি-বিদেশি শিক্ষা ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা।