শনিবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশে হামের উপসর্গে আরও ৭ জনের প্রাণহানি

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম

দেশে হামের উপসর্গে আরও ৭ জনের প্রাণহানি
ছবি : Collected

বাংলাদেশে হাম এবং এই রোগের সন্দেহজনক উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে প্রাণহানির সংখ্যা ক্রমশ উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত চব্বিশ ঘণ্টায় সারা দেশে হামের উপসর্গে আরও সাতজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

 

এর ফলে চলতি বছরে এই অত্যন্ত সংক্রামক ব্যাধিতে নিশ্চিত আক্রান্ত এবং সন্দেহজনক উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করা মানুষের সর্বমোট সংখ্যা এক হাজার উনিশ জনে উপনীত হয়েছে। শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রকাশিত নিয়মিত স্বাস্থ্য বিজ্ঞপ্তিতে এই উদ্বেগজনক ও মর্মান্তিক পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে।

 

দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি যে বর্তমানে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কঠিন সময় পার করছে, এই উপাত্ত তারই সুস্পষ্ট ও জোরালো ইঙ্গিত প্রদান করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওই বিস্তারিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, শুক্রবার সকাল আটটা থেকে শনিবার সকাল আটটা পর্যন্ত-এই চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কেবল রাজধানী ঢাকাতেই পাঁচজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে, যারা প্রত্যেকেই হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

 

একই সময়ে দেশব্যাপী বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে নতুন করে আরও আটশো পঞ্চান্ন জন রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। রাজধানী ঢাকা এবং এর আশপাশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এই রোগের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

 

পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা ব্যবস্থা ও চিকিৎসক-নার্সদের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকরা রোগীদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদানে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে রোগীর এই আকস্মিক ও ক্রমবর্ধমান সংখ্যা পরিস্থিতিকে বেশ জটিল করে তুলেছে।

 

গত চব্বিশ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া নতুন রোগীদের বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা ঢাকা বিভাগে অবস্থান করছে। এই নির্দিষ্ট সময়ে ঢাকা বিভাগে সর্বাধিক তিনশো সাতাত্তর জন রোগীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

 

এরপরই অবস্থান করছে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখানে নতুন করে দুইশো জন রোগী চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসেছেন। এছাড়া সিলেট বিভাগে একশো একুশ জন, বরিশাল বিভাগে ষাট জন, রাজশাহী বিভাগে পঞ্চান্ন জন, ময়মনসিংহ বিভাগে সাঁইত্রিশ জন, খুলনা বিভাগে একত্রিশ জন এবং রংপুর বিভাগে চারজন রোগী নতুন করে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

 

দেশের প্রতিটি বিভাগ থেকে রোগীর এই আগমনের পরিসংখ্যান থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, দেশের কোনো প্রান্তই বর্তমানে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয় এবং সর্বত্রই একটি সতর্কতামূলক ও উদ্বেগজনক অবস্থা বিরাজ করছে।

 

চলতি বছরের পনেরোই মার্চ থেকে দেশে এই রোগের প্রাদুর্ভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, পনেরোই মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে সর্বমোট এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার দুইশো দুইজন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

 

অত্যন্ত আশার কথা হলো, বিপুল সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হলেও চিকিৎসা গ্রহণ শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার হারও বেশ সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। এ পর্যন্ত মোট এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার চারশো পঁয়ষট্টি জন রোগী হাসপাতাল থেকে সফলভাবে চিকিৎসা গ্রহণ করে ছাড়পত্র পেয়েছেন।

 

স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলস পরিশ্রম, চিকিৎসকদের সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং সঠিক চিকিৎসা প্রোটোকল অনুসরণের কারণেই এই বিপুল সংখ্যক রোগীকে সুস্থ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

 

তবে সামগ্রিক সংক্রমণের চিত্রটি আরও কিছুটা বিস্তৃত ও শঙ্কার। সরকারি হিসাব মতে, গত পনেরোই মার্চ থেকে সারা দেশে সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লক্ষ সত্তর হাজার ছয়শো আটত্রিশ জনে। এই বিপুল সংখ্যক সন্দেহভাজন রোগীর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত বিশ হাজার ছয়জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছেন।

 

অন্যদিকে, মৃত্যুর পরিসংখ্যানটি সবচেয়ে বেশি বেদনার। চলতি বছর নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত একশো জনের মৃত্যু হয়েছে এবং উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরও নয়শো উনিশ জন। এই দুই পরিসংখ্যান মিলিয়ে মোট প্রাণহানির সংখ্যা এক হাজার উনিশ জনে দাঁড়িয়েছে, যা সাধারণ নাগরিক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য একটি গভীর চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

হাম মূলত একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত শিশুদের বেশি আক্রান্ত করলেও যেকোনো বয়সের মানুষই এতে সংক্রমিত হতে পারেন এবং মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই আধুনিক যুগে উপযুক্ত টিকাদানের মাধ্যমে এই রোগটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য।

 

তা সত্ত্বেও, বর্তমান প্রাদুর্ভাব ও প্রাণহানির এই মাত্রা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা বহন করছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের এই পরিস্থিতির দিকে নিবিড় নজর রাখছে।

 

রোগটির বিস্তার কার্যকরভাবে রোধ করতে হলে স্বাস্থ্য বিভাগকে আরও বেশি গতিশীল ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং আক্রান্তদের অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে পর্যাপ্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি।

 

পাশাপাশি, দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচির আওতা ও কার্যকারিতা আরও নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করার তাগিদ দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাণঘাতী সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব থেকে দেশের আপামর জনসাধারণকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হয়।