রবিবার, অক্টোবর ১৮, ২০২৬
২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মুসলিম বিশ্বে প্রচলিত ‘মোহাম্মদ’ নাম নিয়ে ট্রাম্পের কটূক্তি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৪৮ পিএম

মুসলিম বিশ্বে প্রচলিত ‘মোহাম্মদ’ নাম নিয়ে ট্রাম্পের কটূক্তি
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও এক বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। শনিবার মুসলিম বিশ্বে সর্বাধিক ব্যবহৃত ও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ নাম ‘মোহাম্মদ’ নিয়ে প্রকাশ্যে উপহাস করেছেন তিনি।

 

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ডালটন শহরে রিপাবলিকান দলের এক নির্বাচনী সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি এই ধরনের অনভিপ্রেত মন্তব্য করেন। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

 

সেই নির্বাচনের অংশ হিসেবে নিজ দলের প্রার্থীদের পক্ষে সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে এই প্রচার সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন সাবেক ও বর্তমান এই মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধান। তবে রাজনৈতিক প্রচারণার মঞ্চে একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অত্যন্ত আবেগময় ও বহুল প্রচলিত নামকে ঘিরে তার এই হালকা মন্তব্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও সুশীল সমাজের মধ্যে তীব্র সমালোচনার সূত্রপাত করেছে।

 

সমাবেশে উপস্থিত নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখার এক পর্যায়ে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের সাধারণ মানুষের নাম নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কারও নাম মনে না থাকলে কিংবা নির্দিষ্ট পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলে কেবল ‘মোহাম্মদ’ নামটি উচ্চারণ করাই যথেষ্ট।

 

তিনি বলেন, যদি কখনো মধ্যপ্রাচ্যের কারও সঠিক নাম নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়, তবে শুধু মোহাম্মদ বলে ডাকলেই হয়। কারণ এতে প্রায় পঁয়ষট্টি শতাংশ সম্ভাবনা থাকে যে নামটি সঠিকভাবে মিলে যাবে।

 

নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি আরও দাবি করেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে দীর্ঘ সময় ধরে এই কৌশলটি প্রয়োগ করে আসছেন এবং এতে তার কখনো কোনো ভুল হয়নি। কারও সঙ্গে দেখা হলে সরাসরি ‘হ্যালো মোহাম্মদ’ সম্বোধন করার এই অদ্ভুত কৌশলের কথা তিনি নিজের মুখে তুলে ধরেন।

 

মুসলিম সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসে ‘মোহাম্মদ’ নামটির স্থান অত্যন্ত গভীর, পবিত্র এবং মর্যাদাপূর্ণ। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক ও সর্বশেষ নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র নামের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা, নিখাদ ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রকাশ করতেই বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলিম পরিবার তাদের পুত্রসন্তানদের নামের আগে, মাঝে কিংবা শেষে এই নামটি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করে থাকেন।

 

ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় বসবাসকারী মুসলমানদের কাছে এই নামটি কেবল একটি পরিচয়ের চেয়েও অনেক বেশি আধ্যাত্মিক মূল্য বহন করে। এমন একটি গভীর ধর্মীয় অনুভূতি জড়িয়ে থাকা নামকে ঘিরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য অনেক পর্যবেক্ষকের কাছেই দায়িত্বহীন ও আপত্তিকর বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে মোহাম্মদ নামটিকে নিয়ে এমন ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করছিলেন, তখন সমাবেশে উপস্থিত জনতা কোনো উল্লাস প্রকাশ করেনি।

 

তারা সম্পূর্ণ নীরব ও প্রতিক্রিয়াহীন অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। সাধারণত ট্রাম্পের রাজনৈতিক সভাগুলোতে তার প্রতিটি তীর্যক মন্তব্যে সমর্থকদের প্রবল করতালি ও সমর্থন দেখা গেলেও, এই ক্ষেত্রে উপস্থিত দর্শকেরা কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেননি।

 

এতে স্পষ্ট হয় যে, ট্রাম্পের এমন স্পর্শকাতর ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো মন্তব্যকে খোদ তার নিজস্ব রাজনৈতিক সমর্থকরাও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের আকৃষ্ট করতে গিয়ে এমন বৈষম্যমূলক ও অনভিপ্রেত দৃষ্টান্ত তুলে ধরা কোনো শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রনেতার কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত।

 

সমাবেশের পরবর্তী অংশে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ ইরানকে লক্ষ্য করেও তীব্র কটাক্ষ করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি উপস্থিত জনতার সামনে দাবি করেন যে, ইরান হলো সমগ্র বিশ্বের মধ্যে একমাত্র দেশ যেখানে কোনো ব্যক্তি দেশটির প্রেসিডেন্ট বা শীর্ষ নির্বাহী পদে বসতে চান না।

 

এই অদ্ভুত দাবিটি উত্থাপনের সময়ও তিনি আবারও মোহাম্মদ নামটির প্রতি তীর্যক ইঙ্গিত করেন। ট্রাম্প বলেন, ইরান এমন এক রাষ্ট্র যেখানে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের আসনে যাওয়ার কোনো আগ্রহ কারও থাকে না।

 

এই কথা বলার পরপরই তিনি সমাবেশে সামনের সারিতে উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তিকে প্রতীকীভাবে ‘মোহাম্মদ’ হিসেবে সম্বোধন করে কৌতুকচ্ছলে জানতে চান যে তারা ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিতে আগ্রহী কি না। তার এই ধরনের মন্তব্যকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক ধরণের অসংবেদনশীল ও অপরিপক্ব আচরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

তবে বাস্তব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক তথ্যের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই মন্তব্য পুরোপুরি অসত্য ও বিভ্রান্তিকর। বাস্তবে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্বাচনে সব সময়ই তীব্র প্রতিযোগিতা ও জাতীয় পর্যায়ের ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

 

বিশেষ করে ২০২৪ সালে এক মর্মান্তিক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি প্রাণ হারানোর পর দেশটিতে শূন্য পদে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেই সময় অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক ভোটারের সমর্থনে মাসুদ পেজেশকিয়ান ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন।

 

বর্তমানে তিনিই অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সব আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ফলে দেশটিতে কেউ প্রেসিডেন্ট হতে চান না বলে ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্যটি মূলত একটি অবাস্তব ও ভিত্তিহীন রাজনৈতিক অলঙ্কার ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, মার্কিন রাজনীতিতে রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং দলীয় বাগযুদ্ধ ততই চরম রূপ নিচ্ছে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষে রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার দল মরিয়া হয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। জর্জিয়ার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অনিশ্চিত অঙ্গরাজ্যগুলোতে জয়লাভ করা তাদের নির্বাচনী কৌশলের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

 

তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, নির্বাচকমণ্ডলীকে উজ্জীবিত করতে গিয়ে এমন স্পর্শকাতর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা শেষ পর্যন্ত হিতে বিপরীত হতে পারে। বিশেষ করে মুসলিম ভোটার এবং মধ্যপন্থী মার্কিন নাগরিকদের কাছে এই ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদী ও অসম্মানজনক বক্তব্য নেতিবাচক বার্তা পৌঁছাতে পারে।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বরাবরই বহুত্ববাদ, ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছে, যার সঙ্গে একজন পরাশক্তি প্রধানের এমন উপহাসমূলক আচরণ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বলেই মনে করা হচ্ছে।

 

- রয়টার্স