শনিবার, নভেম্বর ৭, ২০২৬
২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভরাডুবির পর ট্রাম্প প্রশাসনের তিন শীর্ষ কর্মকর্তার পদত্যাগ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

ভরাডুবির পর ট্রাম্প প্রশাসনের তিন শীর্ষ কর্মকর্তার পদত্যাগ
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির চরম ভরাডুবি ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিপর্যয়ের পর মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অভাবনীয় পালাবদলের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের অভ্যন্তরে গভীর অস্থিরতা ও টানাপোড়েন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

 

নির্বাচনী এই বিশাল ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে, বিশেষ করে বিচার বিভাগের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে শুরু হয়েছে পদত্যাগের এক অনাকাঙ্ক্ষিত হিড়িক।

 

এরই ধারাবাহিকতায় ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন তিন জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নিজ নিজ পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই আকস্মিক পদত্যাগের ঘটনা কেবল একটি সাধারণ রদবদল নয়; বরং এটি মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সংকট, নীতিনির্ধারকদের মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং রাষ্ট্রের বিচার বিভাগের যথেচ্ছ রাজনৈতিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই এক নীরব বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একসময়ের ব্যক্তিগত আইনজীবী এবং বর্তমান প্রশাসনের অত্যন্ত প্রভাবশালী অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ গত বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তার পদত্যাগের বিষয়টি গণমাধ্যমের সামনে নিশ্চিত করেছেন।

 

একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তিনি জানিয়েছেন যে, বিচার বিভাগের নাগরিক অধিকার বিষয়ক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হারমিত ধীলন তার পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন এবং তার জমা দেওয়া ইস্তফাপত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে।

 

হারমিত ধীলনের এই পদত্যাগের নেপথ্যে বেশ কিছু বিতর্কিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের চূড়ান্ত ব্যর্থতা সরাসরি জড়িত বলে মনে করছেন মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। উল্লেখ্য যে, নিজের দায়িত্ব পালনের সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ত্রিশটি অঙ্গরাজ্য থেকে ভোটার নিবন্ধনের তালিকা সংগ্রহের একটি অত্যন্ত বিতর্কিত, যুগান্তকারী ও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ প্রচেষ্টার সঙ্গে সরাসরি ও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন।

 

তার এই পদক্ষেপটি ঠিক এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে গ্রহণ করা হয়েছিল, যখন নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও ভোটার অধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নাগরিক অধিকার গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্ক চলছিল।

 

মূলত এই সপ্তাহেই অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি যখন এক ভয়াবহ রাজনৈতিক পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে, ঠিক তখনই তার এই পদত্যাগের খবরটি প্রকাশ্যে আসে। একাধিক শীর্ষস্থানীয় মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ধীলনের পদত্যাগপত্রের অনুলিপি থেকে একটি চমকপ্রদ তথ্য জানা যায়।

 

অব্যাহতিপত্রে হারমিত ধীলন নিজে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি মূলত গত অক্টোবর মাসেই তার পদত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন এবং সেই অনুযায়ী পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশাসনিক কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার স্বার্থে এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের অনুরোধে নির্বাচন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে তিনি নিজ পদে সাময়িকভাবে বহাল থাকতে সম্মত হয়েছিলেন।

 

হারমিত ধীলনের পদত্যাগের রেশ কাটতে না কাটতেই মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও বড় ধাক্কা আসে শুক্রবার। ওই দিন অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ আরও দুই জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, প্রভাবশালী ও নীতিনির্ধারক কর্মকর্তার পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।

 

এই দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হলেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল জন আইজেনবার্গ এবং ফ্লোরিডার সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন অ্যাটর্নি জেসন রেডিং কুইনোনেস।

 

এই দুই জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তার আকস্মিক পদত্যাগ ট্রাম্প প্রশাসনের আইনি ও জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোতে একটি বিশাল বড় শূন্যতার সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা ও আইন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেসন রেডিং কুইনোনেসের পদত্যাগের বিষয়টি মার্কিন রাজনৈতিক ও আইনি মহলে ব্যাপক ও তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

কুইনোনেস তার দায়িত্ব পালনকালে এমন একটি স্পর্শকাতর ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্ত কার্যক্রমের তদারকি করছিলেন, যা সরাসরি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

তিনি এমন কয়েকজন সাবেক শীর্ষ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনি তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন, যাদের বিরুদ্ধে খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প গুরুতর অভিযোগ তুলেছিলেন যে, এই কর্মকর্তারা মূলত গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে অপসারণের অপচেষ্টা চালিয়েছিলেন।

 

এ ধরনের রাজনৈতিকভাবে চরম স্পর্শকাতর ও বিরোধপূর্ণ মামলার প্রধান তদারকিকারীর হঠাৎ পদত্যাগ রাষ্ট্রের বিচার ও তদন্ত বিভাগের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের অনৈতিক রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়টিকে আরও একবার জনসমক্ষে অত্যন্ত নগ্নভাবে তুলে ধরেছে।

 

বিগত কয়েক বছরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে মার্কিন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে বারবার দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কঠোর সমালোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে। স্বাধীন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন অত্যন্ত সুকৌশলে রাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে নিজেদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রতিশোধ গ্রহণের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।

 

তার শাসনামলে বিচার বিভাগের মাধ্যমে এমন অসংখ্য ব্যক্তি, গণমাধ্যমকর্মী বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ও রাষ্ট্রীয় মদতে মামলা পরিচালনা করা হয়েছে, যাদেরকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে নিজের শত্রু বা রাজনৈতিক পথের কাঁটা বলে মনে করতেন।

 

বিচার বিভাগের এই চরম ও নজিরবিহীন রাজনৈতিকীকরণের কারণে অনেক সৎ, পেশাদার ও নিরপেক্ষ প্রসিকিউটর চরম মানসিক ও প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়েন। যে সকল সরকারি কৌঁসুলি বা প্রসিকিউটর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ আদালতে উপস্থাপন করতে নৈতিকভাবে অনিচ্ছুক ছিলেন বা বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে তা প্রমাণ করতে নিজেদের অক্ষমতা প্রকাশ করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের রোষানলে পড়ে তাদের অনেককেই নির্দয়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

 

আবার অনেকেই বিবেকের তাড়নায় বা পেশাগত সম্মান রক্ষার্থে বাধ্য হয়ে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। বিচার বিভাগের এই যথেচ্ছ রাজনৈতিক ব্যবহারের একটি অত্যন্ত চরম, হাস্যকর অথচ উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত হলো যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো বা এফবিআই-এর সাবেক পরিচালক জেমস কোমির বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি অত্যন্ত আলোচিত ও বিতর্কিত মামলা।

 

বিচার বিভাগের দায়ের করা ওই মামলার ভিত্তিতে গত এপ্রিল মাসে জেমস কোমিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়, যা মার্কিন আইনি ও রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে।

 

কোমির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মূল ভিত্তি ও ধরনটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনি সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত অদ্ভুত এবং অবিশ্বাস্য। ওই আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রে স্পষ্টভাবে দাবি করা হয় যে, সাবেক এই এফবিআই পরিচালক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে সামুদ্রিক ঝিনুকের ছবি সংবলিত একটি পোস্ট করেছিলেন, যা নাকি পরোক্ষভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জীবননাশের একটি অত্যন্ত সুপ্ত ও প্রচ্ছন্ন হুমকি হিসেবে কাজ করেছে।

 

এ ধরনের একটি নিতান্তই সাধারণ, নিরীহ ও সাংকেতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রের একজন সাবেক শীর্ষ ও অত্যন্ত সম্মানিত গোয়েন্দা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা বা জীবননাশের হুমকির মতো গুরুতর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে চরম বিস্ময় ও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

 

সমালোচকদের মতে, এটি মূলত এই চরম সত্যটিই প্রমাণ করে যে, প্রশাসন তাদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে ও আইনিভাবে ঘায়েল করতে কতটা বেপরোয়া, অযৌক্তিক এবং বিধ্বংসী পদক্ষেপ নিতে পিছপা হয়নি।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি এবং ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ওয়ার্ল্ডের নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এটি স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, সদ্য সমাপ্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির এই বিশাল ও ঐতিহাসিক পরাজয় এবং তার পরপরই প্রশাসনের শীর্ষ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের এই ধারাবাহিকভাবে পদত্যাগের ঘটনা মার্কিন রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথের জন্য একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর সতর্কবার্তা।

 

সাধারণ মার্কিন ভোটাররা তাদের ব্যালটের মাধ্যমে মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের বিভেদমূলক রাজনীতি, অসহিষ্ণুতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমাগত রাজনৈতিক ব্যবহারের বিরুদ্ধেই তাদের চূড়ান্ত রায় প্রদান করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

 

বিচার বিভাগের মতো একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানকে যেভাবে ক্ষমতাসীন দলের বা নির্দিষ্ট এক ব্যক্তির ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানোর স্বার্থে ব্যবহার করার অপচেষ্টা করা হয়েছে, তা দেশের গণতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী সাধারণ জনগণ কোনোভাবেই ভালোভাবে গ্রহণ করেনি।

 

ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক করিডোরে এখন এই জল্পনাই প্রবল যে, সামনের দিনগুলোতে এই পদত্যাগের তালিকা হয়তো আরও দীর্ঘ হতে পারে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই অপ্রত্যাশিত ভরাডুবি এবং অভ্যন্তরীণ এই তীব্র প্রশাসনিক ভাঙন ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং তার রাজনৈতিক ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে বলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা গভীরভাবে বিশ্বাস করছেন।

 

- এএফপি, এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড