বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬
১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে আজীবন সুবিধা, ঋণ ও স্বাস্থ্যবিমা

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে আজীবন সুবিধা, ঋণ ও স্বাস্থ্যবিমা
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার আওতায় আনতে চালু করা সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জনসাধারণের কাছে এই উদ্যোগকে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য এবং বাস্তবসম্মত করে তোলার লক্ষ্যে সরকার একগুচ্ছ নতুন সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

 

আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আদলে এই ব্যবস্থাকে সাজানোর অংশ হিসেবে পেনশনারের মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন প্রদান, পেনশনারদের জন্য স্বাস্থ্যবিমার সুযোগ, বিশেষ প্রয়োজনে সহজ শর্তে ঋণ গ্রহণ এবং নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে টাকা তুলে নিয়ে এই ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসার প্রস্তাবগুলো বর্তমানে কর্তৃপক্ষের সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

আগামীকাল বৃহস্পতিবার, ১৭ই সেপ্টেম্বর, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। পদাধিকারবলে অর্থমন্ত্রী নিজেই এই কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।

 

জানা গেছে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এই উচ্চপর্যায়ের সভায় উপরোক্ত প্রস্তাবগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতে পারে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় দেশের জনসাধারণের অংশগ্রহণ ও আগ্রহ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাব পরিচালনা পর্ষদের এই সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হবে।

 

প্রস্তাবগুলো অনুমোদন লাভ করলে এবং প্রয়োজনীয় বিধিমালা সংশোধন করা সম্ভব হলে আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই নতুন সুবিধাগুলো উন্মুক্ত করা হতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

 

দেশের ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়া বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে একটি টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় নিয়ে আসা এবং ভবিষ্যতের দিনগুলোতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে গিয়ে নির্ভরশীলতার হার বৃদ্ধি পাওয়ার বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।

 

তবে প্রায় তিন বছর পার করলেও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত প্রত্যাশা অনুযায়ী সাড়া মেলেনি। অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রচলিত ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদের হারের তুলনায় এই পেনশন ব্যবস্থায় আর্থিক রিটার্ন অপেক্ষাকৃত কম হওয়া এবং গ্রাহকদের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো আর্থিক সুবিধার ব্যবস্থা না থাকার কারণেই মূলত সাধারণ মানুষ আশানুরূপ আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

 

প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বিদ্যমান চারটি স্কিমে সর্বমোট তিন লক্ষ ঊনআশি হাজার নয়শো বিশ জন নাগরিক নিবন্ধিত হয়েছেন। তাদের জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮৮ কোটি ৫২ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য চালু করা ‘সমতা’ স্কিমে সবচেয়ে বেশি সাড়া মিলেছে।

 

এই স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন দুই লক্ষ সাতাশি হাজার দুইশো চব্বিশ জন এবং জমা হয়েছে ৫৬ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকা। অন্যদিকে, প্রবাসীদের জন্য চালু করা ‘প্রবাস’ স্কিমে অংশগ্রহণ সবচেয়ে হতাশাজনক।

 

এখন পর্যন্ত মাত্র এক হাজার একশো একাত্তর জন প্রবাসী এই স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে নারী রয়েছেন মাত্র সাতানব্বই জন। এই স্কিমে জমা হয়েছে মাত্র ১১ কোটি ৮৭ লক্ষ টাকা। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, একজন পেনশনারের বয়স ষাট বছর পূর্ণ হওয়ার পর তিনি মাসিক ভিত্তিতে পেনশন পেতে শুরু করেন।

 

পেনশন চলাকালীন সময়ে যদি তাঁর মৃত্যু হয়, তবে তাঁর মনোনীত নমিনি পেনশনারের পঁচাত্তর বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার সময়সীমা পর্যন্ত একই হারে মাসিক পেনশন পেয়ে থাকেন। কিন্তু নতুন সংস্কার প্রস্তাবে এই নিয়মে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে।

 

এতে নমিনির পরিবর্তে পেনশনারের স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মূলত সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রচলিত পেনশন ব্যবস্থার সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

 

এর পাশাপাশি, সাধারণ মানুষের প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে পেনশন পাওয়ার নির্ধারিত বয়স ষাট বছর থেকে কমিয়ে পঞ্চান্ন বছর করার একটি প্রস্তাবও আসন্ন পর্ষদ সভায় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় উঠতে পারে।

 

পেনশন ব্যবস্থাকে আরও বেশি জনবান্ধব করার লক্ষ্যে একটি বিশেষ ঋণ সুবিধা চালুর পরিকল্পনাও কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় রয়েছে। সর্বজনীন পেনশন আইনে গ্রাহকের জমা করা অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ বিশেষ প্রয়োজনে ঋণ হিসেবে নেওয়ার সুযোগ রাখা হলেও, সেটি এতদিন বাস্তবে কার্যকর করা হয়নি।

 

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, গ্রাহকরা তাঁদের একান্ত প্রয়োজনে জমা করা অর্থের একটি অংশ ঋণ হিসেবে গ্রহণ করতে পারবেন এবং এই ঋণের বিপরীতে যে সুদ আদায় করা হবে, সেটিও সরাসরি সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের নিজস্ব পেনশন হিসাবেই জমা হবে।

 

তাছাড়া, দীর্ঘমেয়াদি এই ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার পর উদ্ভূত যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন একটি প্রস্থান সুবিধা বা বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ যুক্ত করার প্রস্তাবও করা হয়েছে।

 

এতে বলা হয়েছে, কোনো গ্রাহক অন্তত পাঁচ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে চাঁদা প্রদানের পর যদি কোনো কারণে শারীরিকভাবে অসুস্থ বা আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়েন, তবে বিশেষ বিবেচনায় তাঁকে এই ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে নিজের জমানো পুরো অর্থ তুলে নেওয়ার সুযোগ প্রদান করা হবে।

 

এর পাশাপাশি, উন্নত বিশ্বের মতো দেশের পেনশনারদের স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার আওতায় আনতে একটি যুগান্তকারী স্বাস্থ্যবিমা চালুর পরিকল্পনাও করছে সরকার। এই লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই একটি খসড়া পরিকল্পনা প্রণয়ন করে সেটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে।

 

প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনায় গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রতি মাসে মাত্র দশ থেকে বিশ টাকার মতো অত্যন্ত নামমাত্র প্রিমিয়াম নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বজনীন এই পেনশন ব্যবস্থাকে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সম্পূর্ণ শরিয়াহভিত্তিক একটি স্বতন্ত্র পেনশন স্কিম চালুর বিষয়টিও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিবেচনায় রয়েছে।

 

ধারণা করা হচ্ছে, পর্ষদের সভায় এই সমস্ত জনকল্যাণমুখী প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করলে তা দেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি করবে এবং সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।